রমজান শুধু আত্মশুদ্ধির মাস নয়; বরং সমাজ ও রাষ্ট্রশুদ্ধিরও মাস -মুফতী আব্দুল জলিল

বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল হিজরি দ্বিতীয় সালে রমজান মাসের ১৭ তারিখে, ঠিক ঐ বছরেই মুসলমানদের উপর রোজা ফরজ হয়েছিল।

মহানবী (সা.) মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার পর মদীনায় নতুন একটি নগররাষ্ট্র, নতুন সভ্যতা, সংস্কৃতি, স্বকীয়তা ও দ্বীন ইসলামের মূল কেন্দ্ররূপে গড়ে তোলার জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছিলেন। এটা দেখে মক্কার কুরাইশগণ ঈর্ষান্বিত হলো। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে তারা নানা ষড়যন্ত্রের করতে লাগলো। এবং তারা চিন্তা করলো মুহাম্মাদ ও তাঁর আনিত দ্বীন অঙ্কুরেই বিনাশ করা প্রয়োজন। তা না হলে তাদের নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব আরববাসী প্রত্যাখান করবে।

অপরদিকে আল্লাহ্ তা’আলার পক্ষ থেকে নির্দেশ এলো যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করার। অবশেষে রাসূল (সা.)-এর নেতৃত্বে মদীনা থেকে মুসলমানদের একটি দল বের হলো।

বদর নামক স্থানে কাফেরেরা এক দিকে অবস্থান নিল, অন্য দিকে মুসলমানগণ অবস্থান নিলেন। মুসলমান বাহিনী যে স্থানটিতে অবস্থান নিল সেখানে একটি পানির কূপ ছিল। যেহেতু পানির কূপটি মুসলমানদের দখলে সেহেতু কাফেররা পানির সঙ্কট অনুভব করল। কূপের পাশেই একটি পাহাড়, সেখানে মুসলমানদের সদর দফতর স্থাপন করা হলো। এলাকাটি ছিল সমতল, কিন্তু তিন দিকে ছিল পাহাড়-বেষ্টিত।

মুসলমানগণ সৈন্য সংখ্যা ছিলো ৩১৩ জন, অপরপক্ষে কাফেরদের সংখ্যা ছিল এক হাজার। মুসলিম বাহীনিতে ৩১৩ জনের দলে উট ছিল ৭০টি আর ঘোড়া ছিল মাত্র দু’টি। অপরপক্ষে কাফেরদের এক হাজারের দলের ৬০০ জনের কাছে ছিল দেহ রক্ষাকারী বর্ম এবং তাদের কাছে ঘোড়া ছিল ২০০টি।

মুসলমানেরা যেখানে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করবেন সেখানের মাটি একটু নরম, যা যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য উপযুক্ত নয়। অপর দিকে কাফেররা যেখানে অবস্থান নিয়েছিলেন সেখানের মাটি শক্ত এবং যুদ্ধের জন্য স্থানটি উপযুক্ত।

রমজান মাসের ১৬ তারিখ দিনটি শেষ মাগরিবের পর উৎকণ্ঠিত মুসলমানগণ এবং কাফেররা নিজ নিজ ক্যাম্পে অবস্থান করছে। সেই রাতে মহান আল্লাহ্ তা’য়ালার নিকট সেজদায় পড়ে সাহায্য প্রার্থনা করছেন মানবতার মুক্তির দূত হযরত মুহাম্মদ (সা.). কেঁদে কেঁদে বলেছিলেন অনেকটা এ রকম : ‘হে দয়াময় আল্লাহ্, আগামীকালের নীতিনির্ধারণী যুদ্ধে তোমার সাহায্য আমাদের অতি প্রয়োজন। এই যুদ্ধে আমরা তোমার সাহায্য ছাড়া বিজয় লাভ করতে পারব না। আর আমরা যদি পরাজিত হই হয়তো তোমাকে সেজদা করার কিংবা তোমার নাম ধরে ডাকার লোক এই পৃথিবীতে আর নাও থাকতে পারে। অতঃপর তুমি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করো কী করবে; কারণ তুমি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার মালিক। আমরা আমাদের জীবন দিয়ে প্রাণপণ যুদ্ধ চালিয়ে যাবো। আমরা আমাদের জীবন তোমার পথে উৎসর্গ করলাম। বিনিময়ে তোমার দ্বীনকে আমরা তোমার জামিনে প্রতিষ্ঠা করতে চাই। তুমি আমাদেরকে বিজয় দান করো। আমরা তোমার কাছে সাহায্য চাই।’ রাসূল (সা.)-এর আন্তরিক আকুতি-মিনতি মহান আল্লাহর নিকট কবুল হয়ে গেল। হযরত জিব্রাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে জবাব এলো- সাহায্য আসবে, তোমার যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও, তোমাদের শিরকে উঁচু করো এবং দৃঢ় পদক্ষেপে দাঁড়াও। পবিত্র কুরআনের সূরা আনফালের ৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তা’য়ালার এই ঘোষণাটি দিয়েছেন।

ওই রাতে মরুভূমিতে প্রবল বৃষ্টি হলো। যেটি একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। বৃষ্টির কারণে কাফেরদের যুদ্ধের মাঠের শক্ত মাটি কাদায় ভরে পিচ্ছিল হয়ে গেল। অপর দিকে মুসলমানদের যুদ্ধের মাঠ শক্ত হয়ে গেল। বৃষ্টির কারণে আবহাওয়া শীতল হলো, উৎকণ্ঠিত উদ্বিগ্ন মুসলমানগণের চোখে তন্দ্রাচ্ছন্নভাবে প্রশান্তি এসে গেল।

অপর একটি ঘটনা, যেটি মহান আল্লাহ তায়ালা ঘটিয়েছেন কাফেরেরা যখন মুসলমানদের ক্যাম্পের দিকে তাকাচ্ছিল ঠিক তখন কাফেরদের চোখে মুসলমানদের ক্যাম্প অনেক বড় মনে হচ্ছিল। তারা চিন্তায় পড়ে গেল এত মুসলমান কোত্থেকে এলো! অপরপক্ষে মুসলমানগণ যখন কাফেরদের ক্যাম্পের দিকে তাকাচ্ছিল তখন কাফেরদের ক্যাম্প মুসলমানদের চোখে অনেক ছোট মনে হচ্ছিল এবং তারা ভাবতে লাগল কাফেররা তো তেমন বেশি না; আগামীকালের যুদ্ধে এদেরকে আমরা পরাজিত করতে পারব। অতঃপর এমন মনে হচ্ছিল যে মুসলমানগণের চোখে দেখা দিয়েছিল অন্য এক স্বপ্ন যে, আমরা তাদের সমান সমান। আর এ ধরনের চিন্তা-চেতনা মহান আল্লাহ্ তায়ালার পক্ষ থেকে মুসলমানদের মনে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল, যাতে করে মুসলমানেরা তাদের মনোবল হারিয়ে না ফেলেন।

অতঃপর দিনের বেলায় উন্মুক্তভাবে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। সেই আমলের যুদ্ধের অস্ত্র হতো তরবারি, তীর, ধনুক, বর্ম, বল্লম ইত্যাদি। মুসলমানগণ প্রাণপণ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। মহান আল্লাহ্ তা’য়ালা তার প্রতিশ্রুতি মোতাবেক মুসলমানদের সাহায্যের জন্য ফেরেশতা পাঠিয়ে দিলেন।

যুদ্ধ চলাকালে জিব্রাঈল (আ.) এসে মহানবী (সা.)-কে এসে জানালেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আপনার হাতে এক মুষ্টি ধুলো নিন আর শাহাদাত আঙুল ইশারা করে কাফেরদের দিকে ছুড়ে দিন। রাসূল (সা.) এক মুষ্টি ধুলো তার হাতে নিলেন এবং শত্রুপক্ষের দিকে নিক্ষেপ করলেন।

আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, সেই বদরের মাঠে রাসূলের ছুড়ে দেয়া ধুলো সেদিন অনেক দূরে কাফেরের চোখে-মুখে নাকে পৌঁছে গেলো। এ ছাড়া পবিত্র কুরআনের সূরার মাধ্যমে মহান আল্লাহ্ তা’য়ালা সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন, ‘হে রাসূল, সেদিন সেই ধুলো আমি সবার চোখে পৌঁছে দিয়েছি। আপনি কেবল নিক্ষেপ করেছেন। এর কারণ ছিল কাফেররা যেন ভালোভাবে তাদের যুদ্ধের অবস্থান না দেখতে পারে এবং অতি দ্রুত ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়; এমনকি বলা হয়েছে তারা তাদের হাতের অস্ত্র ছেড়ে চোখ কচলাতে শুরু করেছিল। একটু চিন্তা করলে দেখা যায় যদিও আমরা জাগতিক দৃষ্টিতে দেখলাম ধুলোগুলো রাসূল (সা.) তার হাত দিয়ে ছুড়েছেন, কিন্তু এই এক মুষ্টি ধুলো কিভাবে শত্রু বাহিনীর চোখে গেল? তাই বলতে হচ্ছে এটা স্বাভাবিক দৃষ্টিতে সম্ভব নয়, এটা হয়েছে অস্বাভাবিক দৃষ্টিতে; যা স্বয়ং আল্লাহ্ ঘটিয়েছেন। আর এটাই হলো ঐশী বা গায়েবি সাহায্য।

অন্যদিকে হাদিসে এসেছে, যুদ্ধের শেষে সাহাবিগণ সাক্ষী দিয়েছেন কেউ কেউ যে, আমরা সাদা পোশাক পরিহিত কিছুসংখ্যক ব্যক্তিকে আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করতে দেখেছি। তাদেরকে আমরা যুদ্ধের আগে কখনো দেখিনি এমনকি যুদ্ধের পরেও দেখিনি। আবার কিছুসংখ্যক সাহাবি বলেছেন, আমরা তরবারি ব্যবহারকারীকে দেখছি না, কিন্তু তরবারিটি দেখছি। তাদের তরবারিগুলো আমাদের তরবারিগুলোর চেয়ে দৈর্ঘ্যে অনেক লম্বা এবং সেগুলো শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করছিল। সেদিন সাদা পোশাক পরিহিত ফেরেশতাদের আকৃতি কারো চোখে দেখা গিয়েছিল আবার কারো চোখে দেখা যায়নি। মূলত তারা ছিল আল্লাহ্ প্রেরিত ফেরেশতা।

বদরের যুদ্ধ ছিল ইতিহাস নির্ধারণকারী একটি যুদ্ধ। যদি বদরের যুদ্ধে মুসলমানগণ পরাজিত হতেন তাহলে দ্বীন ইসলামের ভাগ্যে কী ছিল কিংবা মহান আল্লাহ্ তা’য়ালার নাম ডাকার মতো কোনো লোক এই পৃথিবীতে থাকত কি না তা কেবল সেই মহান সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কারো জানা ছিল না। শত্রুগণের দৃষ্টিতে বদরের যুদ্ধ ছিল উদীয়মান বা নব অঙ্কুর, সবেমাত্র চারা গজাচ্ছে এই ইসলাম নামক ধর্মটিকে আল্লাহর জমিন থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার যুদ্ধ। বদরের যুদ্ধের অপর একটি তাৎপর্য হলো দ্বীন ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে একজন সেনাপতির দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। বদরের যুদ্ধের তৃতীয় তাৎপর্য হলো যে মহান আল্লাহ্ তায়ালা অনেকটাই অদৃশ্যমানভাবে তার প্রিয় বান্দাদের বিপদে কীভাবে সাহায্য করেন তার জ্বলন্ত প্রমাণ এই যুদ্ধে বিদ্যমান।

বদর যুদ্ধ থেকে আমাদের শিক্ষাঃ
১. কাফের মুশরিক ও মুনাফিকরা
সবসময় চায় যেন আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত না হয়।
২. রমজান মাস শুধুমাত্র আত্মশুদ্ধির মাস নয়; বরং এটা সমাজ ও রাষ্ট্র শুদ্ধির মাসও।
৩. যারা দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজ করবে নিজ গৃহের লোকেরা শত্রুতে পরিনতি হওয়া খুবই স্বভাবিক।
৪. প্রয়োজনে বাড়ি-ঘর, এমনকি দেশ ত্যাগ করতে হতে পারে।
৫. মুসলমানরা কখনো সংখ্যায় বেশির কারণে জয়লাভ করেননি; বরং জয় এসেছে ঈমান আর আল্লাহর মদদে।
৬. মুসলিম বাহিনী নিজ শক্তিতে ভরসা করেননি। কিন্তু নিজেদের সর্বোচ্চ শক্তি ব্যয় করেছেন এবং সর্বদা আল্লাহর সাহায্য কমনা করেছেন।
৭. রাসুল (সা.) শুধুমাত্র মসজিদে বসে দু’য়া করেননি, ময়দানে সেনাপ্রধান হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনাও করেছেন।
৮. মুসলমানদের সর্বোচ্চ চেষ্টা-প্রচেষ্টা যখন শেষ হয়, আল্লাহর সাহায্য সেখানে শুরু হয় এবং বিজয় সেখানে অনিবার্য হয়।

এভাবেই আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে জমিনে উড্ডয়ন করেছেন। আর মুসলিম বাহিনীকে সাহায্য করেছেন তাঁর গায়েবি মদদ দিয়ে।

লেখক
সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি
ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন

আরো পড়ুন পোস্ট করেছেন

Comments

লোড হচ্ছে...
শেয়ার হয়েছে