ধর্ষণের মহামারী; কোন পথে হাঁটছে বাংলাদেশ? -মুহাম্মাদ আব্দুল জলিল

বর্তমান বাংলাদেশের ভাইরাল সস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ধর্ষণ। প্রতিনিয়ত যে সমস্যা আরো তীব্র আকার ধারণ করছে। প্রতি বছর মোটামুটি ৮০০ থেকে ১২০০ ধর্ষণের ঘটনা মিডিয়া বা থানায় মামলা কিংবা গ্রাম্য শালিসের মাধ্যমে উঠে আসছে পরিসংখ্যানে। যার অর্থ দাঁড়ায় প্রতিদিন গড়ে ৩ থেকে ৪ জন নারী ও শিশু যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের স্বীকার হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে ধর্ষন বা যৌন নিপীড়নের সংখ্যা প্রকৃতভাবে আরো অনেক বেশি।

ইদানিং মুখ খুলতে শুরু করেছে বেশিরভাগ ভুক্তভোগীরা। অতি সম্প্রতি সিলেট এম.সি কলেজে ছাত্রলীগ কর্তৃক স্বামীকে বেধে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণের ঘটনা এবং নোয়াখালী, ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ধর্ষণের ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে বাংলাদেশের স্থানীয় প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও আইনশৃংখলা বাহীনির বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে উঠে রাজনৈতিক, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ব্যানারে।

প্রশ্ন উঠেছে খোদ সরকারের উপর। কেননা সিলেট, নোয়াখালী, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্তৃক ধর্ষণের অভিযোগ প্রমানিত হয়েছে। যার ফলে মিডিয়া, পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থার দিকে আঙুল তুলছে সর্বস্তরের জনগণ। এত ধর্ষণ, ক্রমাগত বৃদ্ধি, সরকার দলীয় সম্পৃক্ততা, বিচারহীনতা ; সমাধান আসলে কোন পথে?

একে অপরের উপর দায় চাপানো, নিজের দায় এড়ানো, নিজেই ঠিক, অন্যরা সব ভুল; সমাধানের চুড়ান্ত পথ-ই বা কোনটি? এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে গেলে আগে ঠিক করা প্রয়োজন ধর্ষণের সংজ্ঞা, তারপর ধর্ষণের কারণ; সবশেষে সমাধানে আসা উচিৎ।

এজন্য প্রথমেই আইডেন্টিফাই করা উচিৎ কোনটা ব্যাভিচার, কোনটা পরকীয়া আর কোনটা ধর্ষণ। ঢালাওভাবে সবগুলোকে ধর্ষণ বলা যুক্তিযুক্ত বা আইনসিদ্ধ না।
ধর্ষণ বলতে সাধারণত অর্থে আমরা যেটা বুঝি, তা হলো- (কর্তার ইচ্ছা আর কর্তীর অনিচ্ছা) অর্থ্যাৎ জোরপূর্বক পুরুষ কর্তৃক নারীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন। এবং জোরপূর্বক নারীর শ্লীলতাহানী করাকে যৌন নিপীড়ন বলে।

কিন্তু বর্তমানে প্রেমের সম্পর্কের জের ধরে প্রেগন্যান্ট হওয়ার পর বিবাহ করতে না চাওয়া, বিবাহিত নারীরা পরকিয়ার মাধ্যমে অন্য পুরুষের সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন, কিংবা হোটেলে টাকার বিনিময়ের সুযোগ করে দেওয়ার প্রবণতাকে পরবর্তীতে ধর্ষণের মামলায় রূপ দেওয়া কোন ভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না। অথবা একবার দু’বার শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের পরে নারী বা পুরুষ সম্পর্ক কন্টিনিউ করতে না চাইলে জোরপূর্বক বা ব্লাকমেইল পদ্ধতির মাধ্যমে সম্পর্ক স্থাপনকেও ধর্ষণ বলা যাবে কিনা এটা আলোচনা সাপেক্ষ্য।

এখন আসেন ধর্ষণের জন্য দায়ী কে বা কারা?
আমাদের সমাজে ধর্ষণ সংগঠিত হলেই এক শ্রেনীর নারীবাদীরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও পুরুষের বিকৃত মানষিকতাকে দায়ী করেন। রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত সরকার ও বিচার ব্যবস্থাকে দায়ী করেন এবং একশ্রেনীর আলেমরা সর্বদা নারীর বেপর্দাকে দায়ী করে থাকেন।

অপরাধ বিজ্ঞানের মত ও সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি অপরাধ ঘটার পেছনে অনেকগুলো কারণ থাকে। তাঁর মধ্যে কিছু মেজর আর কিছু নন মেজর। আর এর মধ্যে কিছু স্বল্প মেয়াদী এবং কিছু দীর্ঘ মেয়াদী কারণে অপরাধ সংঘটিত হয়।

মেজর কারণের মধ্যে বিচার না থাকা, ক্ষমতার প্রভাব, মানষিকতার সমস্যা ইত্যাদি। নন মেজরের মধ্যে পর্দা, সামাজিক মূল্যবোধ, মিডিয়ার প্রভাব প্রধানতম দায়ী।

বিবাহের বয়স সীমা এবং যৌন চাহিদা অসামঞ্জস্যতা অন্যতম একটি কারণ। যেমন ধরুন বর্তমান বাংলাদেশে মেয়েরা ৮/৯ বছরে এবং ছেলেরা ১২/১৪ বছরে যৌবনের চাহিদা অনুভব শুরু করে। পক্ষান্তরে সরকারীভাবে বিবাহের বয়সসীমা মেয়ে ১৮ ছেলে ২১ এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবাতায় মেয়ে ২২ থেকে ২৫ এবং ছেলে ২৫ থেকে ৩০ বছর লেগে যায় বিবাহ করতে। যার ফলে দীর্ঘসময় যৌবন পার করার জন্য তারা প্রেম, ভালোবাসা ও এক পর্যায়ে অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দৈন্যতা ও কর্মসংস্থানের অভাবে প্রায় ১ কোটি ২০লক্ষ মানুষ প্রবাসে অবস্থান করছে। যার ৮০-৮৫% পুরুষ এবং এর ৬০% যুবক। যার অধিকাংশ বিবাহিত। ফলে বিশাল একটা অংশ বিবাহিতা নারী পুরুষহীন থাকতে থাকতে পরকিয়ার মত জঘন্য অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। সংসার বিচ্ছেদ, সামাজিক অবক্ষয় ও ধর্ষনের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

দেশে-বিদেশী মিডিয়ায় নাটক, সিনেমা, টেলিফিল্ম ইত্যাদি আচার-অনুষ্ঠানে ভিলেন কর্তৃক নারী ধর্ষণের প্রক্রিয়া, সংসারে পরকিয়া, বিবাহীত নারীর সাথে অবৈধ সম্পর্ক, অবাধ নগ্ন বিজ্ঞাপন, ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফির ছড়াছড়ির মাধ্যমে যুব সমাজকে ক্রমাগত চারিত্রিক অধঃপতন ও যৌন নির্যাতন এমনকি ধর্ষনের মত অপরাধে উদ্ভুদ্ধ করছে।

দেশের জুমা মসজিদের খুৎবা, ওয়াজ-মাহফিল, বয়ান ও বক্তৃতায় নারীর পর্দাকে বেশি দায়ী করা হলেও পুরুষের নারীর সাথে আচরণ, নারীর প্রতি কুদৃষ্টি নিয়ে বক্তব্য সচরাচর কমই দেখা যায়। সর্বদা ধর্ষনের জন্য নারীর পোষাকেই বেশি দায়ী করে আসছে তাঁরা। কিন্তু আদতে পোশাক শুধুমাত্র একটি কারণ ছাড়া আর কিছুই না।

ক্ষমতাসীন দলের অবৈধ প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থাকার কারনে সর্বদা ক্ষমতাসীনরা এ জাতীয় অপরাধে বেশি লিপ্ত হচ্ছে। পুলিশের ঘুষখোরী আচরণ, ভিকটিমকে অপদস্ত, মামলার তদন্ত ব্যায়বহুল এবং সঠিক বিচার ব্যবস্থা না থাকা এবং বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা এবং বিচার কার্যকর বিলম্ব অনেক ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়ন না হওয়া অন্যতম দায়ী এই ধর্ষনের জন্য।

সমাধান কোন পথে?
আমরা জানি কোন ভাইরাসের চিকিৎসার জন্য সাধারণত দুই ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। রোগ মুক্তির জন্য প্রতিকার মেডিসিন ও রোগীর শরীরে ঐ ভাইরাস আর যেন না আসতে পারে এজন্য এন্টিবডি টিকা দেওয়া হয়।

অপরাধের ক্ষেত্রেও প্রতিকার ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। কিছু প্রতিকার আছে যার মধ্যে প্রতিরোধ ব্যবস্থাও আছে। যেমন ধর্ষণের বিচার কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক হওয়া। অনুর্ধ্ব ১৫ দিনের মধ্যে প্রকাশ্যে ধর্ষকের বিচার করা যেতে পারে। তবে সামাজিক শৃংখলা বজায় রাখতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া ও অপরাধীর প্রতি জুলুম না হওয়া বাঞ্ছনীয়। যেমন বর্তমান দাবি উঠেছে ধর্ষকের শাস্তি মৃত্যুদন্ড বা ফাঁসি। কিন্তু সকল প্রকার ধর্ষণের ফাঁসি এটা অযৌক্তিকও বটে। কেননা এখানে ধর্ষণের কারণ, পদ্ধতি, বয়স ও পারিপার্শ্বিকতা বিবেচ্য বিষয় বিচার প্রয়োগের ক্ষেত্রে। এর মধ্যে বেশকিছু ভালো দিকও রয়েছে। যেমন কোন অবিবাহিত নারী কোন অবিবাহিত পুরুষ কর্তৃক ধর্ষনের স্বীকার হলে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে শাস্তি লঘু করে বিবাহ দিলে সামাজিক শৃংখলা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়। এটা ইসলাম সম্মতও বটে।

পারিবারিকভাবে ধর্মীয় অনুশাসনের মাধ্যমে এ জাতীয় অপরাধ কমিয়ে আনা যায়। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে ছেলে ও মেয়েদের আলাদা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করানো। নেশা জাতীয় বিষয় থেকে বিরত রাখা। পারিবারিকভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। পর্দার প্রয়োগ করাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। প্রাপ্ত বয়স্ক হলে বিবাহ করানো অভিভাবকের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।

নাটক, সিনেমা, টেলিফিল্মের মাধ্যমে চরিত্রগঠন মূলক গল্প তৈরী করা, পাশ্চাত্য ও ভারতীয় মিডিয়ার আগ্রাসী ও অসামাজিক সম্প্রচার বন্ধ করা। বিজ্ঞাপনে নগ্ন ছবি, অশ্লীল গান, ও পর্ণোগ্রাফি সাইট বন্ধ করার মাধ্যমে নারীর প্রতি কুরুচিপূর্ণ মানুষিকতা বন্ধ করা যেতে পারে।

যৌথ পারিবারিক ব্যবস্থার মাধ্যমে পারিবারিক সামাজিক দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি করা। বিবাহের বয়সসীমা কমিয়ে আনা এবং বিবাহকে সহজ করা ও যুবক যুবতীদের বিবাহের উৎসাহ প্রদান করা। বিবাহ পরবর্তী গার্ডিয়ানদের সাপর্টিং ভূমিকা পালন করা আবশ্যক।

গান-গল্প, ওয়াজ-মাহফিল, বক্তব্য, সেমিনারের মাধ্যমে সামাজিক, ধর্মীয়, দেশীয় ও বাঙ্গালী সংস্কৃতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা। বিদেশি অপসংস্কৃতি বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

বিচার ব্যবস্থায় দলীয় প্রভাব, অর্থশালী ও এলিট শ্রেনীর প্রভাবমুক্ত করা ও দ্রুত বিচার কার্যকর করা।

বিচার চাওয়া, প্রতিবাদ করার ক্ষেত্রে সীমা বজায় রাখে দায়িত্বশীল আচরণ করা। প্রতিবাদের ভাষা, ভাব ও সংস্কৃতি যেন আরেকটা অপরাধের জন্ম না দেয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা।

আইন ও আইনের প্রয়োগ শুধুমাত্র পুরুষতান্ত্রিক না হওয়া। নারী-পুরুষ উভয়কেই আইনের আওতায় আনা ও বিচার পাওয়ার সিস্টেমেটিক ওয়ে চালু থাকা দরকার। কেননা একপাক্ষিক বিচার সাধারণত এনার্কিজম সৃষ্টি করে।

অপরাধ প্রমাণিত না হলে বাদী পক্ষকে শাস্তির আওতায় আনা। তা না হলে উদ্দেশ্য প্রণোদিত মামলার সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাবে।

সর্বোপরি ভিকটিম, বাদী, প্রশাসন ও বিচারের সঠিক প্রয়োগই ধর্ষণ নামক অভিশাপ থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে পারে।

লেখক
কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি
ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন

আরো পড়ুন পোস্ট করেছেন

Comments

লোড হচ্ছে...
শেয়ার হয়েছে