বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য-বিরোধিতার কারণ ও বাস্তবতা- হাসানুল হক ইনু

লেখক : সভাপতি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ।

১৯৭১-এর পরাজিত পাকিস্তান আদর্শের অপশক্তির যে উত্থান ঘটেছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ও ৭ নভেম্বর যথাক্রমে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা ও মহান সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান হাতছাড়া হওয়ার মাধ্যমে, সে অপশক্তিকে কিছুটা কোণঠাসা করা গিয়েছে ২০০৫ সালে গঠিত ১৪ দলের ২০০৯ সালে ক্ষমতাসীন হওয়ার মধ্য দিয়ে। কিন্তু ১৪ দলের রাজনৈতিক ও সরকারের আইনি-প্রশাসনিক কার্যক্রমের মাধ্যমে কোণঠাসা বিএনপি-জামায়াত-জঙ্গি অপশক্তি তাদের গণতন্ত্রবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা থেকে থেমে থাকেনি; এরা একের পর এক নতুন নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করে ১৪ দলের সরকার উৎখাতের অপপ্রয়াস চালাতে থাকে।

বিএনপি-জামায়াত-জঙ্গি অপশক্তির এ অপপ্রয়াসের প্রথমটি ছিল একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ বিচার-বিরোধিতার নাম করে ২০০৯ সালের পর থেকে সরকার উৎখাতের চেষ্টা করা। এ অপশক্তির জোট পরে দেশজ মৌলবাদী ও জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে নৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন দিয়ে তাদের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে; পরে হেফাজতে ইসলামের ঢাকা অবরোধকে কেন্দ্র করে সরকার উৎখাতের পরিকল্পনাও করে; এভাবে তৈরি হয় বিএনপি-জামায়াত-জঙ্গির বদলি খেলোয়াড়ের দল। পরবর্তীতে দেশের শ্রমজীবী সাধারণ মানুষ ও সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াত-জঙ্গি অপশক্তি ও এদের বদলি খেলোয়াড়রা একসঙ্গে সারা দেশে পরিচালনা করে ৯৩ দিনের এক ভয়াবহ নারকীয় আগুনসন্ত্রাস। শিক্ষার্থীদের ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন, কোটাবিরোধী আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের মতো বিবিধ জনপ্রিয় সামাজিক আন্দোলনের ভিতরে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মতৎপরতা পরিচালনা করে আন্দোলনের মূল লক্ষ্যগুলোকে বানচাল করে এরা বারবার সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র করে। এ ধারায় সর্বশেষ সংযোজন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণকে কেন্দ্র করে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির অপপ্রয়াস।বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য-বিরোধিতার নামে আসলে সরকার উৎখাতের চক্রান্ত শুরু করা এসব রাজনৈতিক মোল্লা বিএনপি-জামায়াত-জঙ্গির ভাড়াটে খেলোয়াড়, তা আগেই বলা হয়েছে। এরা আলেম-ওলামা-পীর বা ধর্ম প্রচারকারী বা ধর্মীয় চিন্তাবিদ নয়, বরং এরা প্রত্যেকে কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা; এরা নির্বাচন করে, ভোটে দাঁড়ায়; এদের নির্বাচনী মার্কা-প্রতীক আছে। এরা ধর্ম ও রাজনীতিকে মিশিয়ে ধর্মের মনগড়া অপব্যাখ্যা দিয়ে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থের রাজনীতি করে; এরা ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের আগুন জ্বালিয়ে দেশে অশান্তি সৃষ্টির রাজনীতি করে।

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা ও বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়ার নাম করে এরা তাকে দ্বিতীয়বার হত্যা করার হুমকি দিচ্ছে, স্বাধীন দেশ ও মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এদের ভাস্কর্য-বিরোধিতা হলো বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা, বাংলাদেশের বিরোধিতা, বাঙালিয়ানার বিরোধিতা, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা এবং সংবিধানের বিরোধিতা। ১৯৭১ সালের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে ’৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এরা যেমন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ও ৭ নভেম্বর মহান সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের বিজয় ছিনিয়ে নেয়, তেমনি ২০০৯, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে ১৪ দলের বিজয়ের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে বিএনপি-জামায়াত-জঙ্গিদের এসব বদলি খেলোয়াড় ঐক্যবদ্ধভাবে শক্তি সঞ্চয় ও আক্রমণের চেষ্টা করছে। এদের এ শক্তি সঞ্চয় ও আক্রমণের অপচেষ্টাকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। অতীতে ’৭৫ সালে দেখা গেছে যে সামান্য সুযোগে এরা হামলে পড়েছে ও হত্যা-খুনের রাজনীতি শুরু করেছে। এটা খুবই দুঃখজনক যে সরকারের কোনো কোনো মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা আলোচনার মাধ্যমে ভাস্কর্য নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির অবসান হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন। এ তাদের নিছক নির্বুদ্ধিতা; বোকার স্বর্গে বসবাসের নামান্তর। তাদের এটা স্পষ্ট করে অনুধাবন করতে হবে যে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য-বিরোধীরা জেনে-বুঝে পরিকল্পিতভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সরকার উৎখাতের চক্রান্তে নেমেছে, এখানে কোনো ভুল বোঝাবুঝি নেই। যারা এমন বিবেচনা করবেন তারা নিকট ও দূর ভবিষ্যতে তাদের সহযোগী হিসেবে বিবেচিত হবেন। সুতরাং বিএনপি-জামায়াত-জঙ্গির বদলি খেলোয়াড় এসব রাজনৈতিক মোল্লাকে সামান্য ছাড় বা আশকারা দেওয়ার বা এদের সঙ্গে কোলাকুলি করার ন্যূনতম কোনো সুযোগ নেই। যারা রাজনৈতিক মোল্লাদের পিঠ চাপড়ানোর কৌশল অবলম্বন করবেন, রাজনৈতিক মোল্লারা সুযোগ পেলে তাদের ঘাড় মটকে দেবে। এরা ক্ষমার সুযোগ নিয়ে ক্ষমাকারীকে হত্যা করে, গণতন্ত্রের সুযোগ নিয়ে গণতন্ত্রের পিঠে ছোবল হানে। অতীত বারবার এ শিক্ষা দিয়েছে।

বিএনপি-জামায়াত-জঙ্গির বদলি খেলোয়াড় এসব রাজনৈতিক মোল্লার সঙ্গে কৌশলের খেলা খেলার পরিণতি কখনই ভালো হয়নি; বলা চলে উল্টো তারাই বারবার কৌশলের খেলা খেলছে ও কখনো কখনো জিতেছেও। বিমানবন্দরের সামনে বাউল-ভাস্কর্য ও সুপ্রিম কোর্টে লেডি জাস্টিসের ভাস্কর্য অপসারণে বিজয়ী হয়ে আজ তারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা ও বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়ার মতো ক্ষমার অযোগ্য ঔদ্ধত্য প্রকাশ করছে। অনুরূপ, একসময় নারী নেতৃত্বকে হারাম ঘোষণাকারী এসব রাজনৈতিক মোল্লা কৌশলগত কারণে শেখ হাসিনার নাম ধরে তাঁর সরকারের পতন দাবি করছে না বটে; তবে তাঁর সরকার উৎখাতের কৌশল হিসেবে একেকবার একেক বিষয় নিয়ে অস্থিতিশীলতা তৈরির অপচেষ্টা করছে। শুধু তাই নয়, নারী নেতৃত্ব-বিরোধী রাজনীতিকে শক্তি দিতে বিএনপি-জামায়াত-জঙ্গির বদলি খেলোয়াড় এসব রাজনৈতিক মোল্লা ওয়াজ মাহফিল ও ধর্মসভার নামে নারীবিদ্বেষী তেঁতুলতত্ত্ব প্রচার করছে। অসভ্য নোংরা বিকৃতমানসের তেঁতুলতত্ত্ব শুধু নারীবিদ্বেষীই নয়, সংবিধান ও সভ্যতা বিরোধীও বটে।

বিএনপি-জামায়াত-জঙ্গির বদলি খেলোয়াড় রাজনৈতিক মোল্লাদের ষড়যন্ত্রের এ পর্বে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে তথাকথিত বিতর্কের শুরু হলে অনেকে ভাস্কর্য ও প্রতিমা/মূর্তির ভিন্নতার দোহাই দিয়ে ভাস্কর্যের পক্ষে অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তার মানে কি এই যে ভাস্কর্য থাকবে আর প্রতিমা ভাঙা যাবে? আমরা জাসদ বলেছি ভাস্কর্য ও প্রতিমা দুই-ই থাকবে। উল্লেখযোগ্য খবর হলো, বিতর্কের এ পর্যায়ে ৩ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে রাজনৈতিক মোল্লাদের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মানুষ বা অন্য যে কোনো প্রাণীর ভাস্কর্য অথবা মূর্তি নির্মাণ, স্থাপন ও সংরক্ষণ পূজার উদ্দেশে না হলেও সন্দেহাতীতভাবে নাজায়েজ, স্পষ্ট হারাম এবং কঠোরতম আজাবযোগ্য গুনাহ। আর যদি পূজার উদ্দেশ্যে হয় তাহলে তা স্পষ্ট শিরক। এ ধরনের শরিয়তবিরোধী কাজ মুসলমানদের জন্য অনুসরণযোগ্য নয়। যারা বলছেন মূর্তি ও ভাস্কর্য এক নয়, তারা ভুল বলছেন। সত্যকে গোপন করছেন। এটি কোরআন ও সুন্নাহকে অমান্য করা। অন্য কোনো মুসলিম দেশে ভাস্কর্য থাকলেও উদাহরণ দিয়ে ভাস্কর্যকে জায়েজ করা যাবে না।’ এ বিবৃতির নেতৃত্ব দিয়েছেন হেফাজতে ইসলামের আমির জুনায়েদ বাবুনগরী; আর স্বাক্ষরদাতার প্রায় সবাই হেফাজত ও ইসলামী আন্দোলনের রাজনৈতিক কাটমোল্লা। সুতরাং এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে, বিএনপি-জামায়াত-জঙ্গির বদলি খেলোয়াড় এসব রাজনৈতিক কাটমোল্লার অবস্থান দেশের সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধেও আক্রমণের একটি হুমকি।

বিএনপি-জামায়াত-জঙ্গির বদলি খেলোয়াড় এসব রাজনৈতিক কাটমোল্লা ‘অন্য কোনো মুসলিম দেশে ভাস্কর্য থাকলেও উদাহরণ দিয়ে ভাস্কর্যকে জায়েজ করা যাবে না’ এবং ‘প্রাণীর ভাস্কর্য আর মূর্তির মধ্যে পার্থক্য করে প্রাণীর ভাস্কর্যকে বৈধ বলা সত্য গোপন করা’ বললেও এদের এসব বক্তব্য পৃথিবীর দেশে দেশে মুসলিম-চিন্তাবিদদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কাজের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার হুঙ্কার দিয়ে বিএনপি-জামায়াত-জঙ্গির বদলি খেলোয়াড় এসব পাকিস্তানি দালাল বাংলাদেশের ইতিহাসকে ধামাচাপা দিতে চাচ্ছে ও বাঙালির সংস্কৃতিকে অস্বীকার করতে চাচ্ছে এবং দেশের সংবিধান-ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অস্বীকার করে সংবিধান-দেশ-জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।

বিএনপি-জামায়াত-জঙ্গিদের বদলি খেলোয়াড় রাজনৈতিক মোল্লারা ভাস্কর্য ভাঙার হুমকি দেওয়ার মাধ্যমে বেশ কয়েক ধরনের আইন লঙ্ঘন করেছে : [১] বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা এবং সব ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার হুমকি প্রদান, [২] ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার হুমকি দিয়ে সমাজে অশান্তি তৈরির চক্রান্ত ও উসকানি দেওয়া, [৩] ভাস্কর্যকে প্রতিমা/মূর্তির সঙ্গে তুলনা করে মিথ্যাচার করা এবং [৪] পূজার উদ্দেশে স্থাপিত প্রতিমাকে শিরকের সঙ্গে তুলনা করে সাম্প্রদায়িক উসকানি দেওয়া। এভাবে এরা আইন ও সংবিধান লঙ্ঘন এবং দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এদের ক্ষমা করা যায় না; এদের কোনো ছাড় নেই; বাংলার মাটিতে পাকিস্তানের পক্ষ হয়ে বাংলার বিরুদ্ধে চক্রান্ত সহ্য করা হবে না। অবিলম্বে এদের গ্রেফতার করতে হবে, আইনের আওতায় আনতে হবে, বিচার করতে হবে ও যথোপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে; যাতে বাংলাদেশে আর কোনো দিন কেউ ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে চক্রান্তের স্পর্ধা প্রদর্শন করতে না পারে।

চক্রান্তকারীদের বিষদাঁত ভেঙে দিতে ১৪ দলকে মাঠে নামতে হবে ও মুক্তিযুদ্ধের সব শক্তিকে সতর্ক থাকতে হবে এবং ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে। যত চক্রান্তই হোক না কেন, ২০০৯ সালের পর যেভাবে যুদ্ধাপরাধের বিচার ও ফাঁসি হয়েছে, ঠিক সেভাবে বিএনপি-জামায়াত-জঙ্গিদের বদলি খেলোয়াড় ভাস্কর্য-বিরোধী এসব রাজনৈতিক মোল্লার বিচার করে তাদের চক্রান্ত রুখে দিয়ে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধি-সুশাসন-সমাজতন্ত্রের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

লেখক : সভাপতি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ।

সংসদ সদস্য, সাবেক তথ্যমন্ত্রী। তথ্য মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি।

আরো পড়ুন পোস্ট করেছেন

Comments

লোড হচ্ছে...
শেয়ার হয়েছে