হুমায়ূন আহমেদ এর নবীপ্রেম

0
223
হুমায়ূন আহমেদ

সাইফ সিরাজ : বাংলা কথাসাহিত্যের জনপ্রিয়তম লেখক তিনি। দেশের তরুণ পাঠকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছেন কয়েক যুগ ধরে। শেষ সময়ে এসে শুরু করেছিলেন ইতিহাস নিয়ে লেখাও। ‘বাদশাহ নামদার’ আর ‘দেয়াল’ তার প্রমাণ। প্রয়াত এই লেখকের প্রতি আগ্রহ নেই এমন কাউকে পাওয়া মুশকিল। তার লেখার পাঠক শ্রেণির আগ্রহ তার স্বতন্ত্র শৈলীর জন্য। যাদের প্রিয় লেখক তিনি, তাদের আগ্রহ প্রিয় লেখকের সব কিছু নিয়েই। আবার তার বিপক্ষে আছে দুটি ধারা। একটি তার লেখার সাহিত্যমান নিয়ে নাক সিঁটকানো শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণি। আরেকটি তার ধর্মবিশ্বাস নিয়ে সন্দেহ পোষণকারী শ্রেণি যারা আবার তাঁকে নাস্তিক প্রমাণ করতে পারলে সুখ পায়। এই দুটো শ্রেণির বাড়াবাড়ির কারণেই আমি এই লেখককে নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠি।

আমার মনে হয় প্রথমোক্ত শ্রেণিটি তার সহজাত পাঠক মন জয় করার ক্ষমতায় ঈর্ষান্বিত। অন্যদিকে বলা যায়, ব্যাকরণগত সূত্রের ফ্রেমে ফেলে তিনি সাহিত্য নির্মাণ করেননি সেটাও তার বিরোধিতার একটা কারণ! আর দ্বিতীয় দলটি তার বিরোধিতা করেছে তার অসতর্ক কিছু সংলাপের কারণে। যেমন: ‘আল্লাহ অংকে কাঁচা’ এমন নাকি তিনি তার কোন বইয়ে বলেছেন। কিন্তু এই অভিযোগকারী যাদের সাথে আমার কথা হয়েছে তাদের কেউই তার সেই বইটির নাম বলতে পারেনি। তাই আমারও কথাটির সত্যাসত্য যাচাই করার সুযোগ হয়নি। আরেকটা অভিযোগ আছে তিনি তার নাটকে মদ পানের দৃশ্যে মদ্যপকে দিয়ে বিসমিল্লাহ বলিয়েছেন। সেটাও কোন নাটকে তা কেউ বলতে পারেননি ।
এরপরও ধরে নিলাম তিনি এমনটা করেছেনই। তবে আমারা জানি মানুষের বিশ্বাসের বা বৈশিষ্ট্যের বদল হয়। অতীতের পাপ ক্ষমার্হ হয় ভবিষ্যতের ভাল কাজের জন্য বা প্রত্যাবর্তনের জন্য। আমারা এখানে লেখককে ধর্মভীরু প্রমাণ করতে চাই না। সেটা ঠিকও হবে না। আবার তিনি উঁচু মাপের সাহিত্যিক সেটা প্রমাণ করাও এই নিবন্ধের লক্ষ্য নয়। তিনি নাস্তিক ছিলেন না! এবং একজন আবেগী মুসলিমই ছিলেন সেটাই আলোয় আনার চেষ্টা করব এখানে। জীবনের শুরু থেকেই রাসূলুল্লাহ মুহাম্মাদ স.-এর প্রতি ছিলেন গভীর অনুরাগী সেটাও দেখাতে চেষ্টা করবো এই আলোচনায়। হয়তোবা আল্লাহ তাআলা তার এই সব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভালবাসা ও আবেগের কারণে ক্ষমা করে দিতে পারেন। সবই সম্ভব রব্বে আলার জন্য। তার অপার দয়ায় এটা নিতান্তই সহজ একটা বিষয়।
হুমায়ূন আহমেদ তখনো আমার কাছে একজন আধানাস্তিক একজন লেখক। যিনি ইসলামকে নিয়ে নানা স্যাটায়ার করেছেন। তবে এসবই ছিল আমার শোনা কথা! তার এলকার ছেলে হওয়ায় তার প্রতি আরেকটা বিদ্বেষ ছিল নিজের কণ্যার বান্ধবীকে বিয়ে করায়। এবং গ্রামের মানুষদের কাছে বেশ প্রিয় গুলতেকিনকে তালাক দেওয়ায়। 

একটা ঈদ সংখ্যা আমার সব ধারণাকে বদলে দেয়। আগ্রহী করে তোলে লেখকের লেখা এবং তার ব্যক্তি জীবনের প্রতি। জানতে চাই তার পরিবারের বিষয়ে গ্রামের মুরুব্বীদের কাছে।

অন্যপ্রকাশের একটি নতুন স্টল উদ্ধোধন করা হবে। সেখানে আমন্ত্রিত লেখক হুমায়ূন আহমেদ। আমন্ত্রিত হয়েছেন আরো একজন। তিনি আলেমে দ্বীন। একজন মুখলিস মানুষ। নির্লোভ। আধুনিক। নবী প্রেমিক। শুরু হলো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। কিন্তু সেই আলেমে দ্বীন এই অনুষ্ঠানে এমন কিছু করলেন যা লেখকের কাছে ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য তুলে ধরল। তার পছন্দ হলো হুজুরের দুয়া করার আকুল আবেদনটিও। একজন আলেমের এমন সুন্দর দুয়ায় মুগ্ধ হুমায়ূন আহমেদ। 

আজীবন একজন খেয়ালী মানুষ লেখক। সেই আলেম সাহেবকে তিনি কিছু হাদিয়া দিতে চান। তবে সেটাও সবার মত নয়। নিজের খেয়ালি বৈশিষ্ট্যের ধারাবাহিকতা রাখলেন এখানেও। হুজুরকে বললেন- আপনার প্রার্থনা করার পদ্ধতিটি আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আমি আপনাকে একটা উপহার দিতে চাই। আমার সাধ্য মতো। কিন্তু আপনাকে সেই উপহারটি চেয়ে নিতে হবে। বলুন আপনি কী চান? আমার ব্যক্তিগত ধারণা লেখক সেই আলেমে দ্বীনের মানসিক দৃঢ়তা এবং জ্ঞান-মনের সামঞ্জস্যতা পরখ করতে চাইছিলেন! কিন্তু সেই আলেম তার কাছে কিছুই চাইলেন না। বরং অত্যন্ত বিনয়ের সাথে লেখকের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। তিনি বললেন আমি আমার সব চাওয়া আল্লাহর কাছেই চাই। আপনার কাছে আমি কেন চাইবো? লেখক খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে বলেন, না আমি আপনাকে একটা উপহার দিতে চাই। তবে আমার মন বলল আপনি যা চাইবেন আমি তাই দিব। আপনি একটা কিছু চাইলে আমি খুব খুশি হবো।

এবার আলেম সাহেব তার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসলেন। তিনি বললেন, আমি অনেক দিন যাবৎ মনে একটা বাসনা লুকিয়ে রেখেছি। সেটা হলো যদি আপনার সাথে কখনও দেখা হয় তবে আনপাকে একটা অনুরোধ করবো। লেখক এই কথা শুনে খানিকটা আস্বস্ত হলেন। বললেন, বলেন আপনার সেই সুপ্ত বাসনাটা কী? আলেমে দ্বীন বললেন আপনি একজন জনপ্রিয় লেখক। সবাই আপনার বই পড়ে খুব আগ্রহ নিয়ে। আপনি যদি আমাদের প্রিয় নবী সা. কে নিয়ে একটি বই লিখতেন তাহলে জাতির সবাই তা পড়তো। আপনি ও পাঠক সবাই উপকৃত হতো। আমার মনে হয় এটাই লেখককে এক পর্যায়ে ইসলামের দিকে মানে ইসলামের আসল সৌন্দর্যের দিকে ফিরিয়ে এনেছিল। যা আমারা তার আত্মজৈবনিক বইগুলোতে দেখতে পাই। সেই বইগুলোর প্রতিটি অধ্যায়ে কোন না কোনভাবে তিনি কুরআনের উদ্ধৃতি দিয়েছেন অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে। 

এই প্রত্যাশার কথা শুনে লেখক সাথে সাথে সিদ্ধান্ত নেন! রাসূল সা. কে নিয়ে তিনি একটি জীবনী লিখবেন। সেই রাতেই শিল্পী মাসুম আহমদকে দিয়ে একটি চমৎকার প্রচ্ছদ করান লেখক। উদ্দেশ্য প্রচ্ছদটি সামনে থাকলে লেখার প্রতি একটা তাগাদা এবং আগ্রহ থাকবে। কিছুটা শুরুও করেন। কিন্তু একসময় তাকে তার সিই বিখ্যাত ছেলেমানুষি পেয়ে বসে। তিনি আশা করেন যে পৃথিবীর অনেক মানুষই রাসূল সা. কে স্বপ্ন দেখেন। তিনিও সাধনা করতে থাকেন নবীজীকে স্বপ্ন দেখার। যেদিন তিনি স্বপ্ন দেখবেন তার পরদিন থেকেই বইটি লেখা শুরু করবেন। এমন প্রত্যাশার কারণে বই লেখার কাজটি । স্থগিত রাখেন।

একসময় তার উপলব্ধি আসে। এটা আমার প্রিয় রাসূলের সা. জীবনী, এটার তথ্য ও বর্ণনা যথাযথ হতে হবে। তিনি সংগ্রহ করতে থাকেন সিরাত বিষয়ক নানা বই। প্রয়াত লেখকের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন তার মৃত্যুর পর এক সাক্ষাৎকারে বলেন- “আজ পর্যন্ত প্রকাশিত রাসূল সা. কে নিয়ে দেশ বিদেশের প্রায় সব বইই তিনি সংগ্রহ করেছিলেন।”
তিনি আরো বলেন, লেখক অনেক টেনশন করছিলেন বইটি কি তিনি যথাযথভাবে লিখে শেষ করে যেতে পারবেন কিনা তা নিয়ে। কিন্তু আজ আমাদের কাছে স্পস্ট যে লেখক বইটি লিখে শেষ করতে পারেননি। এই বইটি শুরু করার কিছুদিন পরই তিনি ক্যান্সার আক্রান্তহন। চিকিৎসার জন্য চলে যান আমেরিকায়। একসময় সেখানেই তিনি মৃত্যুর শীতল আহবানে সাড়া দেন। 

এই বই লেখার আগেও নবী সা. কে নিয়ে তার আবেগের প্রকাশ পেয়েছে। এমন বেশ কিছু ঘটনা থেকে একটি ঘটনা এখানে উল্লোখ করছি। লেখক তখন আমেরিকায়। পিএইচডির শেষ পর্যায়ের ছাত্র তিনি। তখনকার একটি ঘটনা-
“আমি তখন পিএইচডির শেষ পর্যায়ে, তখন আমার কাছে খ্রিস্টান পাদ্রিরা আসতে শু রু করল। তারা মনে করল, একজন বিধর্মীকে ওদের ধর্মে নিয়ে গেলে ওদের জন্য সুবিধা। আমি দেখলাম, ওরা প্রচুর পড়াশুনা করে, জানে। ওদের ধর্ম বিষয়ে যেমন ওরা প্রচুর জানে, আমাদের ধর্ম নিয়েও তেমনি। আমি আমাদের প্রফেটকে হাইলাইটি করার জন্য এক পাদ্রিকে বললাম যে শোনো, আমাদের প্রফেট ছিলেন এমনই একজন মানুষ, তিনি যখন কারো সঙ্গে কথা বলতেন, তখন সরাসরি তার মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতেন। তিনি যার সঙ্গে কথা বলতেন, তার দিকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে বলতেন না। তিনি পুরো বডিকে তার দিকে টার্ন করতেন, যাতে সে মনে করে তাকে ফুল অ্যাটেনশন দেওয়া হয়েছে। 

শুনে পাদ্রি বললেন, দেখুন, স্পন্ডিলাইটিস বলে একটা ডিজিজ আছে, যে ডিজিজে ঘাড়ের চামড়া শক্ত হয়ে যায়, আপনাদের প্রফেটের ছিল সেই স্পন্ডিলাইটিস ডিজিজ। উনি ঘার ফিরাইতে পাতেন না বলে পুরো শরীর অন্যের দিকে ফেরাতেন। তাহলে তোমরা একটা ডিজিজকে হাইলাইট কর করছ কোন দুঃখে?

হটাৎ করে আমার মনটা এনই খারাপ হলো যে ভাবলাম আসলেই তো, একটা ডিজিজের জন্য তিনি এটা করতেন বলে আমারা এটাকে মানছি! তখন গড আমাকে হেল্প করল। তিনি সঙ্গে সঙ্গে আমাকে একটা লজিক দিয়ে দিলেন এবং লজিকটা আমার তাৎক্ষণিকভাবে আসা। পাদ্রি তখনো বসা ওখানে, চা খাওয়া শেষ করেননি, আমি বললাম-আপনার কথাটা ভুল। আমাদের নামাজ পড়ার একটা সিস্টেম আছে, সিস্টেমে মাথা ফিরাইতে হয়। আমাদের প্রফেটের যদি স্পন্ডিলাইটিস ডিজিজ থাকত, তাহলে তিনি পুরো শরীর ফেরাতেন, উনি তো তা করেন নি। তাঁর এই ডিজিজ ছিল না, তিনি যেটা করতেন তা শ্রদ্ধার জায়গা থেকে করতেন। তারপর আমি তাকে বললাম, আমি কিন্তু ঈসা আ. সম্পকে এ জাতীয় কতা বলি নি। তিনি আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থণা করলেন এবং বললেন, তোমার লজিক খুব পরিষ্কার, আসলেই তো তেমারা নাজের সময় দুই দিকে মাথা ফেরাও। [কালের কণ্ঠের, শিলালিপি, ২৭ জুলাই ২০১২]

এই ঘটনায় আমারা দেখি লেখক জীবনের শু রু থেকেই রাসূল সা. এর প্রতি অনুরাগী ছিলেন। আর সেই অনুরাগে জল ঢেলেছেন সেই ত রুণ মাওলানা। যার ফলে আমার দেখি হুমায়ূন “নবিজী” নামে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.-এর জীবনী লিখতে শু রু করেন। 

জাহেলিয়াতের চরম বর্বর একটা ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শুরু করেন লেখক তার লেখাটি। কুখ্যাত সেই ঘটনা হলো কন্যা 
সন্তানের জীবন্ত সমাধিস্থ করার ঘটনা। 
“মেয়েটা ‘বাবা’ ‘বাবা’ বলে চিৎকার করছে। তার চিৎকারের শব্দ মাথার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। আউজকে দ্রুত কাজ সারতে হবে। গর্তে বালি ফেলতে হবে। দেরি করা যাবে না। এক মুহূর্ত দেরি করা যাবে না।
শামা ছোট্ট হাত বাড়িয়ে ভীত গলায় বলছে, বাবা, ভয় পাচ্ছি। আমি ভয় পাচ্ছি।
আউজ পা দিয়ে একটা বালির স্তুপ ফেলল। শামা আতঙ্কিত গলায় ডাকল’ মা! মা গো!
তখন আউজ মেয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, উঠে আসো।”

এর পর লেখক আরবদের কন্যা সন্তানকে কবর দেওয়ার মনস্তাত্বিক একটা কারণ বর্ণনা করেন। সেই সাথে আউজের মানসিক টানাপড়েনটাও তুলে ধরেন এভাবে-
“আউজ আবার গর্তের দিকে ফিরে যাচ্ছে। ছোট্ট শামা ব্যাপারটা বুঝতে পারছে না। রুভূমিতে দিকচিহ্ণ বলে কিছু নেই। সবই এক।”

কন্যা সন্তানের কবর দেওয়া নিয়ে পবিত্র কুরআনের সূরা তাকভীরের একটি আয়াত উদ্ধৃত করেন তার ভূমিকায়…
“সূর্য যখন তার প্রভা হারাবে, যখন নক্ষত্র খসে পড়বে, পর্বতমালা অপসারিত হবে। যখন পূর্ণগর্ভা উষ্ট্রী উৎক্ষেপিত হবে, যখন বন্যপশুরা একত্রিত হবে, যখন সমুদ্র স্ফীত হবে, দেহে যখন আত্মা পুন:সংযোজিত হবে, তখন জীবন্ত সমাধিস্থ কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে- কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?”

লেখক সেই লেখার প্রারম্ভিকার সমাপ্তি টানেন আল্লাহ এবং রাসুলুল্লাহ সা. এর কাছে ক্ষমা চেয়ে-
“যে মহামানব ক রুণাময়ের এই বাণী আমাদের কাছে নিয়ে এসেছেন, আমি এক অকৃতী তাঁর জীবনী আপনাদের জন্য লেখার বাসনা করেছি। সব মানুষের পিতৃঋণ-মাতৃঋণ থাকে। নবীজির কাছেও আমাদের ঋণ আছে। সেই বিপুল ঋণ শোধের অতি অক্ষম চেষ্টা। 
ভুলভ্রান্তিযদি কিছু করে ফেলি তার জন্য ক্ষমা চাচ্ছি পরম ক রুণাময়ের কাছে। তিনি তো ক্ষমা করার জন্যেই আছেন। ক্ষমা প্রার্থনা করছি নবীজির কাছেও। তাঁর কাছেও আছে ক্ষমার অথৈ সাগর।”
‘নবিজী’র ভুমিকার এই অংশটি শু রু করতেই একজন পাঠক লেখাটির গভীরে হারিয়ে যেতে বাধ্য। বর্ণনার আশ্চর্য যাদুকরি ক্ষমতায় আরবের একটা ছবি লেখক তুলে আনের আমাদের মানসপটে। কল্পনায় শু রু হয়ে যায় পাঠকের ম রু-ভ্রমণ..
“আরব পেনিসুয়েলা। বিশাল ম রুভূমি। যেন আফ্রিকার সাহারা। পশ্চিমে লোহিত সাগর, উত্তরে ভারত মহাসাগর, পূর্বে পার্শিয়ান গালফ। দক্ষিণে প্যালেস্টাইন এবং সিরিয়ার নগ্ন পর্বতমালা। সম। স্ত পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন একটি অঞ্চল। এখানে শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা বলে কিছু নেই। সারা বৎসরই ম রুর আবহাওয়া। দিনে সূর্যের প্রখর উত্তাপ সব জ্বালিয়ে ছারখার করে দিচ্ছে। সারা দিন ধরে বইছে ম রুর শুষ্ক হাওয়া। হাওয়ার সঙ্গে উড়ে আসছে তীক্ষè বালুকণা। কোথাও সবুজের চিহ্ন নেই। পানি নেই। তারপরেও দক্ষিণের পর্বতমালায় বৃষ্টির কিছু পানি কীভাবে কীভাবে চলে আসে ম রুভূমিতে। হঠাৎ খানিকটা অঞ্চল সবুজ হয়ে ওঠে। বালি খুঁড়লে কাদা মেশানো পানি পাওয়া যায়। তৃষ্ণার্ত বেদুঈনের দল ছুটে যায় সেখানে। তাদের উটগুলির চোখ চকচক করে ওঠে। তারা হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কাঁটাভর্তি গুল্ম চিবায়। তাদের ঠোঁট কেটে রক্ত পড়তে থাকে। তারা নির্বিকার। ম রুর জীবন তাদের কাছেও কঠিন। অতি দ্রুত পানি শেষ হয়। কাঁটাভর্তি গুল্ম শেষ হয়। বেদুঈনের দলকে আবারো পানির সন্ধানে বের হতে হয়। তাদের থেমে থাকার উপায় নেই। সব সময় চলতে হবে।”

মূল অধ্যায়টি শু রু হয় কবি নজ রুলের বিখ্যাত নাত ‘ তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে।’ লাইনটি দিয়ে। এর পর লেখক তারঁ সহজাত গল্প বলার ভঙ্গিতে পাঠকের মনে একটা একটা প্রশ্ন রেখে শু রু করেন। লেখক বলেন-
“বিখ্যাত গানের কলি শুনলেই অতি আনন্দময় একটি ছবি ভেসে ওঠে। মা মুগ্ধ চোখে নবজাত শিশুর মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁর কোলে পূণিমার স্নিগ্ধ চন্দ্র। তাঁর চোখ-মুখ আনন্দে ঝলমল করছে।
ঘটনা কি সে রকম?”

এর পর লেখক নিজেই এই প্রশ্নটির একটা যুতসই উত্তর দাঁড় করান-
“সেরকম হওয়ার কথা না। শিশুটির বাবা নেই। বাবা আব্দুল্লাহ তাঁর সন্তানের মুখ দেখে যেতে পারেন নি। মা আমিনার হৃদয় সেই দুঃখে কাতার হয়ে থাকার কথা। আরবের শুষ্ক কঠিন ভূমিতে পিতৃহীন একটি ছেলের বড় হয়ে ওঠার কঠিন সময়ের কথা মনে করে তাঁর শঙ্কিত থাকার কথা।”

লেখক তার বইয়ের মূল অধ্যায়ে নবীজির জন্ম তারিখ বিষয়ক জটিলতার কথা আনেন। আনেন রাসূল সা. এর দুধ মা হালিমার ঘরে তাঁর বেড়ে ওঠার কথা। লেখকের লেখাটি চির জনমের মত থেমে যায় নিচের এই তিনটি অনুচ্ছেদটি লেখার পরই-
“শিশু মোহাম্মদের দুধভাইয়ের নাম আব্দুল্লাহ। আব্দুল্লাহর তিন বোন-শায়মা, আতিয়া ও হুযাফা। বোন শায়মা সবার বড়। শিশু মোহাম্মদকে তার বড়ই পছন্দ। সারা দিনই সে চন্দশিশু কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এখানে-ওখানে চলে যায়। একদিন বিবি হালিমা মেয়ের উপর খুব বিরক্ত হলেন। মেয়েকে ধমক দিয়ে বললেন, দুধের শিশু কোলে নিয়ে তুমি প্রচ- রোদে রোদে ঘুরে বেড়াও। একটা কেমন কথা! বাচ্চাটার কষ্ট হয়না!
শায়মা তখন একটা অদ্ভুত কথা বলল। সে বলল, মা. আমার এই ভাইটার রোদে মোটেও কষ্ট হয় না। যখনই আমি তাকে নিয়ে ঘুরতে বের হই, তখনই দেখি আমাদের মাথার উপর মেঘ। মেঘ সূর্যকে ঢেকে রাখে।
নবীজিকে মেঘের ছায়া দান বিষয়টি জীবনীকার অনেকবার এনেছেন। তাঁর চাচা আবু তালেবের সঙ্গে প্রথম সিরিয়ায় বাণিজ্য যাত্রাতেও মেঘ তাঁর মাথায় ছায়া দিয়ে রেখেছিল।”

তাহলে প্রশ্ন আসে লেখক কি নবী সা. কে স্বপ্নে দেখেছিলেন? নাকি তার সেই ছেলে মানুষি চিন্তা থেকে একসময় ফিরে এসে কাজটি শুরু করেন? আজ আর সেই প্রশ্নে উত্তর পাওয়ার কোন পথ নেই। কারণ লেখক তো আশা করেছিলেন রাসূলকে সা. স্বপ্ন দেখার পর লেখাটা শু রু করবেন। এখানে রয়েছে একটা রহস্য। কিন্তু সেই রহস্যের জট কি খুলবে কোন দিন! 

২০১৩ সালের ‘অন্যদিনের’ ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় লেখকের অসামপ্ত ‘নবিজী’। মানে রাসূল সা.-এর জীবনী। অন্য প্রকাশ একটা চমৎকার প্রচ্ছদ আর মনকাড়া অলঙ্করণে প্রকাশ করে লেখকের এই মহৎ লেখাটি। 

আমারা দেখতে পাই অনেক পাঠক কেবল এই একটি লেখাটির জন্যই অন্যদিনের ঈদ সংখ্যাটি সংগ্রহ করেন। কিন্তু পাঠক লেখকের সরস গদ্যের মজা এবং নবী জীবনের আবেগী বর্ণনার রস আস্বাদন শুরু করার আগেই থেমে যায় লেখকের লেখাটি। চির জনমের মত। একটা আফসোস ধ্বনিত হয় পাঠকের চারপাশে। 

লেখক মাত্র দুটি অধ্যায় লিখতে পেরেছিলেন। একটা ভূমিকা মানে প্রারম্ভিকা আর মূল অধ্যায় একটা। এইটুকুতেই লেখক পাঠকের মনের গভীরে সৃষ্টি করে গেছেন এক হাহাকার। যা আর কোনকালেই সমাপ্য নয়।

আমারা আমাদের বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয়তম লেখকদের কাছে চাই তারাও একটা করে নবীজীবনী লিখুন। যা তাদের অবিনশ্বর মুক্তির উছিলা হতে পারে। 

প্রয়াত লেখকের আত্মার মাগফিরাত ও নবীপ্রেম আল্লাহর কাছে গ্রহণীয় হওয়ার কামনায় শেষ করছি।