ধর্মনিরপেক্ষ ভারত; প্রসঙ্গ মুসলিম নির্যাতন

0
211
ভারতে মুসলিম নির্যাতন

এম এ হাসিব গোলদার : ১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্তির পর পাকিস্তান ও ভারত নামে দু’টি নতুন দেশের উদ্ভব হয়। স্বাধীনতার পর সংবিধানে ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র (Secular State) হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে । কোনো বিশেষ ধর্মকে ভারতের রাষ্ট্রীয়ধর্ম (State Religion) হিসেবে স্বীকার করা হয়নি । ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী জাতি, ধর্ম ও ভাষার পার্থক্যের জন্য রাষ্ট্র কোনো বৈষম্যমূলক আচরণ করবে না । প্রত্যেক নাগরিকই স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম আচরণ করতে পারবে।সংবিধানের ১৪ নং থেকে ৩৫ নং ধারাতে নাগরিকদের উদ্দেশ্যে উল্লিখিত সাতটি মৌলিক অধিকারগুলি হল— (i) সাম্যের অধিকার, (ii) স্বাধীনতার অধিকার, (iii) শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার, (iv) ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার, (v) শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ে অধিকার, (vi) সম্পত্তির অধিকার (vii) সাংবিধানিক প্রতিকারের অধিকার । ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে ৪৪তম সংবিধান সংশোধন করে ‘ সম্পত্তির অধিকার ‘কে মৌলিক অধিকারের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে । বর্তমানে ভারতের নাগরিকরা ছয়টি মৌলিক অধিকার ভোগ করে থাকেন।

কিন্তু বাস্তবিকতায় ভারতের সকল শ্রেণীর মানুষরা কি তাদের মৌলিক ছয়টি অধিকার ভোগ করতে পারছে? সেদেশের সরকার পেরেছে কি সকল ধর্মের মানুষের গণতান্ত্রিক অবস্থান নিশ্চিত করতে?

পর্যালোচনা

দৃশ্য ১ : হাট থেকে ৭৫ হাজার রুপি দিয়ে দুটি দুধেল গাই কিনে বাড়ি ফিরছেন পেহলু খান। ছ’জনে মিলে ফিরছেন রাজস্থানের জয়পুর থেকে অলওয়ার। রাস্তায় হামলা হলো। বৈধভাবেই গরু কেনা হয়েছে, নথিপত্র দেখানো সত্ত্বেও থামল না দুষ্কৃতীরা। কারণ গরু যারা কিনেছেন, তারা মুসলিম। গাড়ির চালকের নাম অর্জুন। তাকে পালাতে বলল হামলাকারীরা। বাকি পাঁচ জন বেধড়ক মারে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। প্রৌঢ় পেহলু খানের মৃত্যু হলো হাসপাতালে।

দৃশ্য ২ : এ বারও ঘটনাস্থল রাজস্থান। তবে আক্রান্ত আফরাজুল বাঙালি। মালদহ থেকে রাজসমন্দে গিয়েছিলেন মজুরি খাটতে। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, শম্ভুলাল রেগর নামে এক ব্যক্তি প্রথমে কিছুটা চুপিসারে আফরাজুলের পিছু নিচ্ছে। তারপরে ধারালো অস্ত্রে একের পর এক কোপে ধরাশায়ী করছে তাকে। নিথর দেহে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। শেষে মোবাইল ক্যামেরার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিদ্বেষমূলক এবং কট্টরবাদী ভাষণ দিচ্ছে।

দৃশ্য ৩ : ঘটনাস্থল পশ্চিমবঙ্গ। হাওড়া থেকে ট্রেন ধরেছিলেন মালদহের জামাল মোমিন। কয়েক জন যুবক ট্রেনে উঠে জানালার ধারের আসনটা থেকে উঠে যেতে বললেন জামালকে। বিস্মিত হয়েছিলেন জামাল। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হলো মার। সঙ্গে অকথ্য, অশ্রাব্য গালিগালাজ এবং জামালের ধর্মবিশ্বাসকে কটাক্ষ। এতেই শেষ হয়নি। মারধর-গালিগালাজের ভিডিও রেকর্ডিং হয়েছিল। নির্ভীক ভঙ্গিতে সে ভিডিও ভাইরালও করে দেয়া হয়েছিল।

ঘটনা আরও অনেক। গুণে শেষ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। উপরিউক্ত দৃশ্যগুলো সবই ভিডিও ধারণের চিত্র। ভিডিও ধারণ ব্যতীত অনেক মর্মান্তিক চিত্রই আছে যা আমাদের অগোচর। রাজস্থান থেকে পশ্চিমবঙ্গ, হরিয়ানা থেকে কর্নাটক— সর্বত্র একই ছবি। গোরক্ষার নামে একের পর হামলা। সংখ্যালঘুর ওপরে, বিশেষত মুসলিমদের ওপরে হামলা করাকে বীরত্বের কাজ বলে মনে করা। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অজুহাতে কট্টর সাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠা। বছর চারেক আগেও কিন্তু পরিস্থিতিটা এত নাজুক ছিল না।

২০১৪ সালে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপি (ভারতীয় জনতা পার্টি) দেশের মসনদে বসার পর থেকেই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এবং অসহিষ্ণুতার ঘটনার সংখ্যা যেন লাফিয়ে বেড়েছে। তার সঙ্গে সম্প্রতি যোগ হয়েছে আর এক বিপদ— গুজবের ভিত্তিতে গণপ্রহার। গত দেড় বছরে শুধু ছেলেধরা গুজবে ৬৯টি হামলা হয়েছে। তাতে মৃত্যু হয়েছে ৪৩ জনের। পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে আঁচ করাই যায়।

২০১৪ সালে সরকার বদলেছে দেশে। ক্ষমতায় বসেছে কট্টরপন্থী হিন্দুবাদী সংগঠন বিজেপি। তারপর থেকেই দেশ জুড়ে কট্টরবাদী শক্তিগুলির বাড়বাড়ন্ত শুরু হয়ে গিয়েছে, প্রকাশ একাধিক সমীক্ষায়। নরেন্দ্র মোদির সরকার চার বছর কাটিয়ে ফেলেছে মসনদে। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসেছে আবার সেই কট্টরপন্থী বিজেপি। গত চার বছরে অসহিষ্ণুতা এবং বিদ্বেষজনিত হিংসার ঘটনা কতগুলি? তার হিসাব তুলে ধরা হয়েছে ইন্ডিয়াস্পেন্ড-এর সমীক্ষায়। নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার আগের চার বছরে পরিস্থিতিটা কেমন ছিল, তুলে ধরা হয়েছে সে হিসেবও।

এই হিসাব বলছে, ২০১০ থেকে ২০১৪-র আগে পর্যন্ত দেশে গোরক্ষার নামে হামলার ঘটনা মাত্র ২টি। আক্রান্ত ৪ জন। তবে সে সব হামলায় কারও মৃত্যু হয়নি। আর ২০১৪ থেকে ২০১৮-র জুলাই পর্যন্ত হামলার সংখ্যা ৮৫। আক্রান্ত হয়েছেন ২৮৫ জন। মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৩৪ জনের।

গোরক্ষার নামে বা ‘হিন্দুত্ব’ রক্ষার নামে কোন রাজ্যে অশান্তি হয়নি, খুঁজে পাওয়া কঠিন। রাজস্থানে একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলেছে। সেই অলওয়ারেই আবার স্বঘোষিত গোরক্ষকদের গণপ্রহারে গত বছরের ২০ জুলাই মৃত্যু হয়েছে রাকবর নামে এক ব্যক্তির। গুজরাটে হামলা হয়েছে, মহারাষ্ট্রে হয়েছে, কর্নাটক, হরিয়ানা, ঝাড়খণ্ড, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ— প্রায় সব রাজ্য থেকে একের পর এক হামলার খবর এসেছে। মাদ্রাসার হুজুর থেকে শুরু করে একেবারে সাধারণ শ্রেণী পর্যন্ত কেউই রেহাই পায়নি মর্মান্তিক হামলা থেকে। তাদের দোষ কি? তারা ‘গোমাংশ খেয়েছে’ বা ‘গোমাংশ তাদের কাছে ছিল’ অথবা ‘জয় শ্রীরাম’ বলে নি।

গোরক্ষার নামে উৎপাত পশ্চিমবঙ্গ আগে কখনও সেভাবে দেখেনি। কিন্তু ২০১৪-র পর থেকে যে নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে দেশে, পশ্চিমবঙ্গও তার বাইরে থাকতে পারেনি। ট্রেনে জামাল মোমিনের আক্রান্ত হওয়া একমাত্র নিদর্শন নয়। বসিরহাট, আসানসোলসহ নানা এলাকায় সাম্প্রদায়িক হিংসা বুঝিয়ে দিয়েছে, বাংলাতেও কট্টরবাদীদের রমরমা বেড়েছে। ২০১৭ সালের আগস্টে জলপাইগুড়ির ধূপগুড়ি থেকে কোচবিহারের তুফানগঞ্জে গরু নিয়ে যাওয়ার পথে আক্রান্ত হন নুরুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন এবং হাফিজুল শেখ। গাড়ির চালক নুরুল পালাতে পেরেছিলেন। বাকি দু’জনের মৃত্যু হয় গণপ্রহারে।

ইন্ডিয়াস্পেন্ড এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৯ এ দ্বিতীয় মেয়াদে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরই অমানবিক নির্যাতনে গণপিটুনিতে মৃত্যু হয়েছে কমপক্ষে ২৬ জনের যার প্রায় সব বিষয়ই ধর্ম রিলেটেড। যার সর্বশেষ নৃশংসতার শিকার হয়েছে ঝাড়খণ্ডের তাবরিজ।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও হাস্যকর বিষয় হলো এ হত্যাকাণ্ডের কোন বিচার নেই‌। আর কখনো বিচার হবে বলে বিশ্বের কোন বড় বিশ্লেষক মনে করে না। কারন এটি বিজেপির সংগঠনের আচরণরিতীর বহিঃপ্রকাশ।

প্রশ্ন হল এভাবে কি একটি দেশ চলতে পারে? জরাজীর্ণ ভাঙ্গা এক রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে হিন্দুত্ববাদীকে উসকে দিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে। বিজেপির কট্টরপন্থী ধর্ম তান্ত্রিক হিন্দুত্ববাদের কারনেই আজ মানবতা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। সংবিধান লঙ্ঘনের দায়ে বিজেপির পালিত এ সন্ত্রাসীদের কি মানবতা বলতে কিছু আছে!! সংখ্যালঘুরা কি মুক্তি পাবে??প্রশ্ন রয়ে যায়।

বিশ্লেষকরা বলছে, এ অবস্থা থেকে ভারতকে পরিত্রান পেতে হলে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী কট্টরপন্থীদের সন্ত্রাসবাদীতা বর্জন করা লাগবে। বিজেপির নেতা বা নেত্রীকে ধর্মের নামে কুরুচিপূর্ণ আচরণের উস্কানি বা উগ্রবাদের প্রস্ফুটন দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। তবেই হয়ত ভারত তার সাংবিধানিক স্বকীয়তায় ফিরে পাবে।

লেখক : শিক্ষার্থী ও সংগঠক