জাতীয় কবির ধর্মমত নিয়ে কট্টরপন্থী হিন্দুদের চরম মিথ্যাচার

0
765
যে কবিতার উদ্বৃতি টেনে কবির ধর্মমতে সংশয় সৃষ্টি করা হয়

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের মতে, জন্মসূত্রে মুসলিম হলেও কবি নাকি মনে প্রাণে ছিলেন সত্যিকারের হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রতিভূ৷

কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ ভারতের জাতীয় জীবনে বিদ্রোহী কবি, তথা বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অবদানের গুণকীর্তন করতে উঠে পড়ে লেগেছে৷ হঠাৎ এই ‘সুমতি’ কেন? বিজ্ঞজনদের কানে একটু খটকা তো লাগছেই৷ তাঁরা এরমধ্যে পাচ্ছেন অন্য গন্ধ৷ হ্যাঁ, বলা ভালো রাজনীতি৷

গৈরিক সংঘ পরিবার এবং পদ্ম পার্টি বিজেপি কি সংখ্যালঘু গন্ধ ঝেড়ে ফেলতে এখন কবি নজরুল ইসলামের স্তুতি গাইতে শুরু করেছে? নজরুলের উত্তরাধিকারের ভাগিদার হতে চাইছে? তাদের পক্ষ থেকে প্রচার চালানো হচ্ছে, কবি নজরুল জন্মসূত্রে মুসলিম হলেও মনেপ্রাণে তিনি ছিলেন প্রকৃত হিন্দু৷ বলা হচ্ছে, নজরুলের রচনার ছত্রে ছত্রে আছে হিন্দু জাতীয়তাবাদেকে হাতিয়ার করে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করার ডাক৷ বিদ্রোহের ডাক৷ তাই তিনি বিদ্রোহী কবি৷ হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়কে তিনি এক সূত্রে বাঁধতে চেয়েছিলেন তাঁর রচনার মধ্য দিয়ে, জীবন-দর্শনের মধ্য দিয়ে, যা তিনি খুঁজে গেছেন আজীবন৷ তাই তিনি ভারতের জাতীয় জীবনে হিন্দু ভাবধারার এক উজ্জ্বল প্রতিমূর্তি৷ কবির হিন্দুত্ববাদ ধর্মের নিরিখে নয়৷ তাঁর যাপিত জীবনশৈলীতে৷ ভারতীয় জাতি সত্তার প্রতি নিবেদিত প্রাণ এই কবি৷ হিন্দু-মুসলিমের মিলিত দর্শনই তাঁর জীবন দর্শন৷

আরএসএস বলছে, প্রচলিত ধর্মমতে নজরুল মুসলিম ছিলেন তো কী হয়েছে? প্রকৃত অর্থে তিনি নাকি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ হিন্দু৷ তাই নাকি তিনি লিখে গেছেন এবং সুর দিয়ে গেছেন শ্যামাসংগীত, আগমনি, ভজন, কীর্তন নিয়ে প্রায় ৫০০ হিন্দু ভক্তিগীতি৷ স্ত্রী হিন্দু৷ প্রমীলা দেবি৷ নিজের ছেলেদের নাম রেখেছিলেন কৃষ্ণ মোহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ, কাজী সব্যসাচী, কাজী অনিরুদ্ধ৷ সংঘ পরিবার আজ ২৫শে মে কবির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে গোটা পশ্চিমবঙ্গে কবি নজরুলের স্মরণে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে৷ কবির রচনা সমগ্র বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় অনুবাদের কাজ শুরু হয়েছে৷ তাঁর রচিত ৩৯টি কবিতার হিন্দি অনুবাদ সংকলন প্রকাশিত হবে এ বছরের শেষ নাগাদ৷

এই প্রসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ আরএসএসের জেনারেল সেক্রেটারি যিষ্ণু বসুর কাছে প্রশ্ন ছিল, ‘‘বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে হঠাৎ এত মাতামাতি কেন? আপনারা তো মুসলিমদের বিশেষ পছন্দ করেন না৷’’ উত্তরে আরএসএস নেতা বললেন, ‘‘ধারণাটা একেবারে ভুল৷ যাঁদের মনে নেই, তাঁদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, কবি নজরুল যখন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন হিন্দু মহাসভার সর্বোচ্চ নেতা শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায় কবির চিকিৎসা এবং যত্ন-পরিচর্যায় সব থেকে বেশি সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলেন৷ বারংবার ছুটে ছুটে গেছেন কবিকে দেখতে৷ তাঁর স্বাস্থ্যের খবরাখবর নিতে৷ কবির চিকিৎসার জন্য বিশেষ তহবিল খুলেছিলেন কে? হ্যাঁ, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়৷ কাজেই যাঁরা বলছেন হঠাৎ করে, তাঁদেরকে ইতিহাসটা আরেকবার পড়ে দেখতে বলি৷ সম্ভবত ভুলে গেছেন তাঁরা৷ আর সংখ্যালঘুদের সব থেকে বেশি দুরবস্থা এই রাজ্যে৷ এটা সাচার কমিটির রিপোর্টেই আছে৷ আমার আপনার কথা নয়. সংঘ পরিবার কল্যাণের প্রশ্নে হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে কখনও ভেদ রাখেনি৷’’

উল্লেখ্য, এই জাতীয়তাবাদের জন্য ১৯২২ সালের নভেম্বরে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার কবি নজরুলের বিরুদ্ধে জারি করেছিল গ্রেপ্তারি পরোয়ানা৷ নজরুল তখন বাংলা সাহিত্যের এক উদীয়মান জোতিষ্ক৷ ব্রিটিশ সরকারের অভিযোগ, নজরুলের আনন্দময়ীর আগমন কবিতায় নাকি সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সুর ছিল৷ কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল এর মাস দুয়েক আগে ধূমকেতু পত্রিকায়, যার সম্পাদক ছিলেন কবি স্বয়ং৷ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকে তিনি তুলনা করেছিলেন কষাইখানার সঙ্গে, যেখানে ঈশ্বরের সন্তানদের চাবুক মারা হয়৷ ফাঁসিতে ঝোলানো হয়৷ এই কথিত অপরাধে ১৯২৩ সালে কবিকে এক বছরের সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়৷ বিদ্রোহী রণক্লান্ত হয়েও তিনি ক্ষান্ত থাকেননি৷

পরীক্ষামূলক সম্প্রচার
তথ্যসূত্র আংশিক : DW