হাদীস শুদ্ধতার মাপকাঠি ও সংকলনের ইতিহাস; -মুহাম্মাদ রাসেল উদ্দীন

0
412
কুরআনুল কারীমের পর ইসলামের দ্বিতীয় মুল ভিত্তি হল হাদীস। ইসলামী শরিয়তের যাবতীয় বিধি-বিধানের মূল উৎস হল কুরআন ও হাদীস। এ দুয়ের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করা তথা শুধুমাত্র কুরআনকে ইসলামের মূল ভিত্তি মনে করা, ইসলামের সাথে শত্রুতা করা বৈ কিছুই না। কেননা হাদীস ব্যতিত কুরআন পরিপূর্ণ বিকশিত হতে পারে না। হাদীসের সাহায্য নেয়া ব্যতিত কুরআনের মর্ম অনুধাবন করা অসম্ভব। সাহাবীগণ রা. ছিলেন রাসুল সা. এর নিত্য সহচর ও আরবী ভাষার উপর পারদর্শী এবং তাদের উপস্থিতিতেই পবিত্র কুরআন নাযিল হয়েছে। কিন্তু স্বয়ং তাদের পক্ষেও রাসুল কর্তৃক ব্যখ্যা দান ব্যতিত কুরআনের মর্ম অনুধাবন করা সম্ভব হয়নি। আল্লাহর দাসত্ব করা যেমন রাসুল সা. এর অনুসরণ করা ব্যতিত সম্ভব নয়, তেমনিভাবে হাদীস বা সুন্নাহকে বাদ দিয়ে কুরআনের বিধান মেনে চলাও অসম্ভব। রাসূল সা. এর মুখনিসৃত পবিত্র বানী ইসলামের পরিপূর্ণতারই অংশ। আর এই মূল্যবান হাদীসসমূহ রাসুল সা. এর যুগ থেকে বর্তমানে আমাদের নিকট পর্যন্ত পৌছেছে। যুগে যুগে হাদীস সংরক্ষণ ও সংকলনের পেছনে রয়েছে বিশাল ইতিহাস। এ বিষয়ে আলোচনার পূর্বে আমরা হাদীস শুদ্ধতার মাপকাঠি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করব।

হাদীস শুদ্ধতার মাপকাঠি
হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষায় হাদীসের শুদ্ধতাকে ‘সহীহ’ বলা হয়। প্রথম যুগে রাসুল সা. এর উক্তি এবং সাহাবা ও তাবেয়ীগণের উক্তির মধ্যে পার্থক্য করা হয়। প্রত্যেকটিকে পৃথক পৃথকভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়। তৃতীয় যুগে সংগৃহীত হাদীসের বিপুল ভা-ার থেকে সহীহ ও নির্ভুল হাদীস যাচাই-বাছাইয়ের কাজও শুরু হয়ে যায়। এ যাচাই বাছাইয়ের প্রয়োজনীয়তা এ জন্য দেখা দেয় যে, ইতিমধ্যে একদল লোক মিথ্যা ও মনগড়া হাদীস বর্ণনা করতে শুরু করেছিল। মাওযু বা মিথ্যা হাদীসের এ মহামারি চিরতরে বন্ধ করে দেওয়ার জন্য এবং সহীহ, হাসান, যঈফ ও মাওযু হাদীসের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণের জন্য তৎকালীন মুহাদ্দিসীনে কেরাম একটি সুক্ষ্ম নীতিমালা প্রণয়ন করেন। লক্ষ লক্ষ হাদীসের মধ্যে থেকে মাওযু বা মিথ্যা হাদীস এবং বিভিন্ন কারণবশতঃ অগ্রহণযোগ্য হাদীস চিহ্নিত করে সহীহ হাদীস বাছাই করার প্রয়োজন দেখা দেয়। সহীহ হাদীস বাছাই করার ক্ষেত্রেও উলামায়ে কেরাম গবেষণার ভিত্তিতে শর্ত বা মানদন্ড দাঁড় করেছেন।
অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের নিকট হাদিস সহিহ হওয়ার জন্য পাঁচটি শর্ত রয়েছে :
১. সনদ মুত্তাসিল হওয়া।
২. রাবির আদিল বা ন্যায়পরায়ন হওয়া হওয়া।
৩. রাবির যবত বা পূর্ণ সংরক্ষণ ক্ষমতা প্রমাণিত হওয়া।
৪. শায বা সনদ ও মতন বিচ্ছিন্ন না হওয়া।
৫. মু‘আল্লাল না হওয়া।

১. সনদ মুত্তাসিল হওয়া : সনদ মুত্তাসিল হওয়ার অর্থ, হাদিসের সনদে বিদ্যমান প্রত্যেক রাবি (বর্ণনাকারী) তার শায়খ (শিক্ষক) থেকে সরাসরি হাদিস শ্রবণ করেছেন প্রমাণিত হওয়া। যেমন গ্রন্থাকার মুহাদ্দিস বললেন : আমার নিকট বর্ণনা করেছে অমুক (প্রথম উস্তাদ), তিনি বললেন : আমার নিকট বর্ণনা করেছে অমুক (দ্বিতীয় উস্তাদ), তিনি বললেন : আমার নিকট বর্ণনা করেছে অমুক (তৃতীয় উস্তাদ) তিনি বললেন : আমার নিকট বর্ণনা করেছে অমুক (চতুর্থ উস্তাদ)। এভাবে প্রত্যেক রাবি স্বীয় শায়খ থেকে শ্রবণ করেছে নিশ্চিত করলে সনদ মুত্তাসিল। শায়খের অনুমতি গ্রহণ করা, শায়খকে হাদিস শুনিয়ে সম্মতি নেওয়াকে সরাসরি শ্রবণ করা বলা হয়।

২. রাবির ‘আদল বা ন্যায়পরায়নতা : সহিহ হাদিসের দ্বিতীয় শর্ত রাবির ‘আদল’ হওয়া। ‘আদ্ল’ শব্দের অর্থ সোজা ও বক্রতাহীন রাস্তা। পাপ পরিহারকারী ও সুস্থরুচি সম্পন্ন ব্যক্তি ন্যায় ও সোজা রাস্তার অনুসরণ করে, তাই তাকে ‘আদ্ল’ বা ‘আদিল’ বলা হয়। আদিল কর্তাবাচক বিশেষ্য, অর্থ ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি। হাদিসের পরিভাষায় দীনদারী ও সুস্থ রুচিকে আদালত বলা হয়। ‘আদিল’ এর পারিভাষিক সংজ্ঞা : মুসলিম, বিবেকবান, সাবালক, দ্বীন বিরোধী কর্মকা- থেকে মুক্ত ও সুস্থ রুচির অধিকারী ব্যক্তিকে উসুলে হাদিসের পরিভাষায় ‘আদিল’ বলা হয়। নি¤েœ প্রত্যেকটি শর্ত প্রসঙ্গে আলোকপাত করা হলো :
মুসলিম : রাবির ‘আদিল হওয়ার জন্য মুসলিম হওয়া জরুরি। অতএব কাফের ‘আদিল’ নয়, তার হাদিস সহিহ নয়। কাফের কুফরি অবস্থায় হাদিস শ্রবণ করে যদি মুসলিম হয়ে বর্ণনা করে, তাহলে তার হাদিস গ্রহণযোগ্য। কারণ সে সংবাদ দেওয়ার সময় আদিল, যদিও গ্রহণ করার সময় আদিল ছিল না। যেমন জুবাইর ইব্ন মুতয়িম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন : “আমি রাসুল সা. কে মাগরিবের নামাজে সূরা তূর পড়তে শুনেছি”। তিনি শুনেছেন কাফের অবস্থায়, আর বর্ণনা করেছেন মুসলিম অবস্থায়। (বুখারি ও মুসলিম)
সাবালিগ : রাবির আদিল হওয়ার জন্য সাবালিগ হওয়া জরুরি। কেউ শৈশবে হাদিস শ্রবণ করে যদি সাবালিগ হয়ে বর্ণনা করে, তাহলে তার হাদিস গ্রহণযোগ্য, সাবালিগ হওয়ার পূর্বে তার হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়। কতক সাহাবির ক্ষেত্রে এ শর্ত প্রযোজ্য নয়, যেমন ইব্ন আব্বাস, ইব্ন যুবায়ের ও নুমান ইব্ন বাশির প্রমুখ। তাদের হাদিস শৈশাবস্থায় গ্রহণ করা হয়েছে।
বিবেকবান : রাবির আদিল হওয়ার জন্য বিবেক সম্পন্ন হওয়া জরুরি। বিবেকহীন ও পাগল ব্যক্তির বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়। পাগল দু’প্রকার : স্থায়ী পাগল ও অস্থায়ী পাগল। স্থায়ী পাগলের হাদিস কোনো অবস্থায় গ্রহণযোগ্য নয়। অস্থায়ী পাগলের মধ্যে যদি সুস্থাবস্থায় সহিহের অন্যান্য শর্ত বিদ্যমান থাকে, তাহলে তার হাদিস গ্রহণযোগ্য, তবে শ্রবণ করা ও বর্ণনা করা উভয় অবস্থায় সুস্থ থাকা জরুরি।
দীনদারী : রাবির ‘আদিল হওয়ার জন্য দ্বীনদার হওয়া জরুরি, তাই পাপের উপর অটল ব্যক্তি আদিল নয়। পাপ হলেই ‘আদল বিনষ্ট হবে না, কারণ মুসলিম নিষ্পাপ নয়, তবে বারবার পাপ করা কিংবা কবিরা গুনায় লিপ্ত থাকা ‘আদল পরিপন্থী। দ্বীনের অপব্যাখ্যাকারী, তাতে সন্দেহ পোষণকারী ও বিদ‘আতির হাদিস গ্রহণ করা সম্পর্কে আহলে ইলমগণ বিভিন্ন শর্তারোপ করেছেন।
সুস্থ রুচিবোধ : রাবির ‘আদল হওয়ার জন্য সুস্থ রুচিবোধ সম্পন্ন হওয়া জরুরি। সুস্থ রুচিবোধের নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই। প্রত্যেক সমাজের নির্দিষ্ট প্রথা, সে সমাজের জন্য মাপকাঠি, যা স্থান-কাল-পাত্র ভেদে নানা প্রকার হয়। সাধারণত সৌন্দর্য বিকাশ ও আভিজাত্য প্রকাশকারী কর্মসমূহ সম্পাদন করা এবং তুচ্ছ ও হেয় প্রতিপন্নকারী কর্মসমূহ পরিত্যাগ করাকে সুস্থ রুচিবোধের পরিচায়ক বলা হয়। হাফেয ইব্ন হাজার (র.) ‘আদল’ এর সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেন, ‘আদল’ ব্যক্তির মধ্যে এমন যোগ্যতা, যা তাকে তাকওয়া ও রুচিবোধ আঁকড়ে থাকতে বাধ্য করে”। অতএব ফাসেক ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী ‘আদিল’ নয়, যদিও সে সত্যবাদী। জামাত ত্যাগকারী ‘আদিল’ নয়, যদিও সে সত্যবাদী, সুতরাং তাদের বর্ণনাকৃত হাদিস সহিহ নয়। আল্লাাহ তাআলা বলেন,“হে ঈমানদারগণ, যদি কোনো ফাসেক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা যাচাই করে নাও। এ আশঙ্কায় যে, তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো কওমকে আক্রমণ করে বসবে, ফলে তোমরা তোমাদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে” (সূরা হুজুরাত-৬)। ফাসেক ব্যক্তির সংবাদ যাচাই ব্যতীত গ্রহণ করা যাবে না, পক্ষান্তরে আদিল ব্যক্তির সংবাদ গ্রহণযোগ্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন,“আর তোমাদের মধ্য থেকে ন্যায়পরায়ণ দু’জন সাক্ষী বানাবে। আর আল্লাহর জন্য সঠিক সাক্ষ্য দেবে।” (সূরা আত-ত্বলাক-২)। এ আয়াতে আল্লাহ ‘আদিল’ ব্যক্তিদের সাক্ষীরূপে গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। সারাংশ : ‘আদিল’ ব্যক্তির মধ্যে দু’টি গুণ থাকা জরুরি : দীনদারী ও সঠিক রুচিবোধ। এ দু’টি গুণকে ‘আদালত’ বলা হয়। কখনো ‘আদিল’ ব্যক্তির জন্য ক্রিয়াবিশেষ্য ‘আদ্ল’ শব্দ ব্যবহার করা হয়।

৩. রাবীর যবত বা সংরক্ষণ : সহিহ হাদিসের দ্বিতীয় শর্ত রাবির ‘যবত’। যবত এর আভিধানিক অর্থ নিয়ন্ত্রণ। এ থেকে যিনি শায়খ থেকে হাদিস শ্রবণ করে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হন, তাকে যাবিত বলা হয়। ‘যাবিত’ কর্তাবাচক বিশেষ্য, অর্থ সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণকারী। যবত এর পারিভাষিক অর্থ : শায়খ থেকে শ্রবণ করা হাদিস হ্রাস, বৃদ্ধি ও বিকৃতি ব্যতীত অপরের নিকট পৌঁছে দেওয়াই যবত। এটা দু’প্রকার : স্মৃতি শক্তির জাবত ও খাতায় লিখে জাবত। সাহাবি ও প্রথম যুগের তাবেয়িগণ স্মৃতি শক্তির উপর নির্ভর করতেন, পরবর্তীতে লেখার ব্যাপক প্রচলন হয়। তখন থেকে স্মৃতি শক্তি অপেক্ষা লেখার উপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়, তবে লিখিত পা-ুলিপি নিজ দায়িত্বে সংরক্ষণ করা জরুরি।
রাবীর যবত চেনার উপায় :
কোন রাবীর যবত বা স্মৃতিশক্তি পরিচয়ের পদ্ধতি হচ্ছে, তিনি হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় সেকাহ বা নির্ভরযোগ্য রাবীর অনুরুপ বর্ণনা করে থাকেন। এরূপ রাবীকে যাবিত বলা হয়। তবে দুয়েকটি রেওয়ায়েত সীকহ রাবীর পরিপন্থি হলে তা দূষণীয় নয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে সীকহ রাবীর বিপরীত হলে তার যবত বা স্মৃতিশক্তির ত্রুটি প্রমাণিত হবে এবং উক্ত হাদীস আর দলীল হিসাবে গ্রহণ করা যাবে না।

৪. ‘শায’- না হওয়া : ‘মাকবুল বা গ্রহণযোগ্য রাবি যদি তাদের চেয়ে উত্তম বা অধিক নির্ভরযোগ্য রাবিদের বিপরীত বর্ণনা করে, তাহলে তাদের বর্ণনাকে শায বলা হয়’। সুতরাং কোন হাদিস সহী হতে হলে এমন না হওয়া। মকবুল অর্থ গ্রহণযোগ্য রাবি, যার একা বর্ণিত হাদিস ন্যূনতম পক্ষে ‘হাসানে’-র মর্যাদা রাখে। মকবুলের চেয়ে উত্তম রাবিকে সেকাহ বলা হয়, যার একা বর্ণিত হাদিস ‘সহিহ’-র মর্যাদা রাখে।

৫. কোন ধরণের ইল্লত না থাকা : ইল্লত দ্বারা উদ্দেশ্য সুপ্ত ও গোপন ত্রুটি, বিজ্ঞ মুহাদ্দিস ব্যতীত যা কেউ বলতে পারে না। সনদ ও মতন উভয় স্থানে দোষণীয় ইল্লত থাকতে পারে। সহীহ বা বিশুদ্ধ হাদীসের ক্ষেত্রে এমনটি হতে পারবে না।

হাদীস সংকলনের ইতিহাস
কুরআনুল কারীম যেভাবে নাযিলের সূচনাকাল থেকে নিয়মিতভাবে লিপিবদ্ধ হয়, হাদীস এমনিভাবে রাসুল সা. এর যুগে নিয়মিত লিপিবদ্ধ না হলেও তিনটি শক্তিশালী সুত্রে তা আমাদের কাছে এসে পৌছেছে।
(১) উম্মতের নিয়মিত আমল
(২) রাসুল সা. এর লিখিত ফরমান, বিভিন্ন সাহাবীর কাছে লিখিত আকারে সংরক্ষিত হাদীস ও পুস্তিকা
(৩) হাদীস মুখস্ত করে স্মৃতি ভান্ডারে সংরক্ষণ এবং পরে বর্ণনা ও অধ্যাপনার মাধ্যমে ব্যক্তি পরস্পরায় তার প্রচার।
প্রথম যুগে নিয়মিতভাবে হাদীস লিপিবদ্ধ করা না হলেও রাসুল সা. এর অনুমতিক্রমে বহু সংখ্যক হাদীস লিখিতভাবে সংরক্ষিত হয়েছিল। দ্বিতীয় হিজরী শতকের শুরু থেকে এ কাজ একটি নতুর মোড় নেয়। তবে নিয়মিতভাবে হাদীস লিপিবদ্ধ করার কাজটি চলে হিজরী তৃতীয় যুগে। এ যুগটিকে আমরা চিহ্নিত করতে পারি হিজরী দ্বিতীয় শতকের শেষার্ধ থেকে চতুর্থ শতকের শেষ পর্যন্ত।
হাজারো মুহাদ্দিস তাদের সমগ্র জীবন হাদীস সংকলন করার মত দ্বীনের মহান এ কাজে ব্যায় করেন। এ কাজকে তারা জীবনের একক মিশন ও চ্যলেঞ্জ হিসাবে গ্রহণ করে নেন। হাদীস সংকলনের দ্বিতীয় যুগ থেকে এ যাচাই বাছাইয়ের কাজ শুরু হয় এবং তৃতীয় যুগে এ কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছে যায়।
হাদীস সংগ্রহ, বিন্যাস ও পুস্তকাকারে সংকলনের সময়টাকে চার যুগে বিভক্ত করা যায়।

প্রথম যুগ
রাসুল সা. এর যুগ থেকে প্রথম হিজরী শতকের শেষ পর্যন্তঃ এ যুগের হাদীস সংগ্রহক, সংকলক ও মুখস্থকারীগণের পরিচয় নি¤েœ তুলে ধরা হল :
এই যুগের সংকলনসমূহ
(১) সহীফায়ে সাদেকা এটা হযরত আবদল্লাহ ইবনে আমর রা. ইবনুল আস কর্তৃক সংকলিত হাদীস গ্রন্থ। পুস্তক রচনার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। তিনি রাসুল (সা) এর নিকট যা কিছু শুনতেন তা লিখে রাখতেন। এজন্য স্বয়ং রাসূল (সা) তাঁকে অনুমতি প্রদান করেছিলেন। ৭৭ বছর বয়সে ৬৩ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন।
(২) সহীফায়ে সহীহা হাম্মাম ইবনে মুনাব্বেহ (মৃত্যু ১০১ হিজরী) এটা সংকলন করেন। তিনি হযরত আবু হুরায়রার রা. ছাত্র ছিলেন। তিনি তাঁর উস্তাদ মুহতারামের বর্ণিত হাদীসগুলো এই গ্রন্থে একত্রে লিপিবদ্ধ করেছিলেন। গ্রন্থটির হস্তলিখিত কপি বার্লিন ও দামেশকের গ্রন্থাগারসমূহে সংরক্ষিত আছে। ইমাম আহমাদ রহ. তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে আবু হুরায়রার রা. শিরোনামে পূর্ণ গ্রন্থটি সন্নিবেশ করেছেন। এই সংকলনটি কিছুকাল পূর্বে ড. হামীদল্লাহ সাহেবের প্রচেষ্টায় হায়দারাবাদ (দাক্ষিণাত্য) থেকে মুদ্রিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। এতে ১৩৮ টি হাদীস রয়েছে।

এই সংকলনটি হযরত আবু হুরায়রা রা. কর্তৃক বর্ণিত সমস্ত হাদীসের একটি অংশমাত্র। এর অধিকাংশ হাদীস সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও পাওয়া যায়। মূল পাঠ প্রায় একই, বিশেষ কোন তারতম্য নাই। হযরত আবু হুরায়রার রা. অপর ছাত্র বশীর ইবনে নাহীকও একটি সংকলন প্রস্তুত করেছিলেন। আবু হুরায়রার রা. ইন্তিকালের পূর্বে তিনি তাঁকে এই সংকলন পড়ে শুনান এবং তিনি তা সত্যায়িত করেন। এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন ড. হামীদল্লাহ কর্তৃক সম্পাদিত সহীফায়ে ইবনে হাম্মাম এর ভূমিকা।

(৩) মুসনাদে আবু হুরায়রা রা.
সাহাবাদের যুগেই এই সংকলন প্রস্তুত করা হয়েছিল। এর একটি হস্তলিখিত কপি উমর ইবনে আবদুল আযীয রহ. এর পিতা এবং মিশরের গভর্নর আবদুল আযীয ইবনে মারওয়ান (মৃত্যু ৮৬ হিজরী) এর নিকট ছিল। তিনি কাসীর ইবনে মুররাকে লিখে পাঠিয়েছিলেন, তোমাদের কাছে সাহাবায়ে কিরামের যেসব হাদীস বর্তমান আছে তা লিপিবদ্ধ করে পাঠাও। কিন্তু হযরত আবু হুরায়রা রা. বর্ণিত হাদীস লিখে পাঠানোর প্রয়োজন নেই। কেননা তা আমাদের কাছে লিখিত আকারে বর্তমান আছে। আল্লামা ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এর স্বহস্তে লিখিত মুসনাদে আবি হুরায়রা রা. এর একটি কপি জার্মানির গ্রন্থাগারসমূহে বর্তমান আছে। (তিরমিযি শরাহ তুহফাতুল আহওয়াযী গ্রন্থের ভূমিকা, পৃষ্ঠা ১৬৫)
(৪) সহীফায়ে হযরত আলী রা.
ইমাম বুখারী রহ. এর ভাষ্য থেকে জানা যায়, এই সংকলনটি বেশ বড় ছিল। এর মধ্যে যাকাত, মদীনার হেরেম, বিদায় হজ্জের ভাষণ ও ইসলামী সংবিধানের ধারাসমূহ বিবৃত ছিল। (সহীহ বুখারী কিতাবুল ইতসাম বিল কিতাব ওয়াস সুন্নাহ, ১ম খন্ড পৃষ্ঠা ৪৫১)
(৫) রাসুল সা. এর লিখিত ভাষণ
মক্কা বিজয়কালে রাসুলুল্লাহ সা. আবু শাহ ইয়ামানী রা. এর আবেদনক্রমে তাঁর দীর্ঘ ভাষণ লিপিবদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই ভাষণ মানবাধিকারের বিস্তারিত আলোচনা সম্বলিত। (সহীহ বুখারী ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ২০)
(৬) সহীফা হযরত জাবির রা.
হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. কর্তৃক বর্ণিত হাদীসসমূহ তাঁর ছাত্র ওয়াহব ইবনে মুনাব্বিহ (মৃত্যু১১০ হিজরী) ও সুলাইমান ইবনে কায়েস লশকোরী লিখিত আকারে সংকলন করেছিলেন। এই সংকলনে হজ্জের নিয়মাবলী ও বিদায় হজ্জের ভাষণ স্থান লাভ করে।
(৭) রেওয়ায়াতে আয়েশা সিদ্দীকা রা.
হযরত আয়েশা রা. কর্তৃক বর্ণিত হাদীসসমূহ তাঁর ছাত্র বোন-পুত্র উরওয়া ইবনুয যুবায়ের রহ. লিখে নিয়েছিলেন। (তাহযীবুত তাহযীব, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা ১৮৩)
(৮) আহাদীসে ইবনে আব্বাস রা.
হযরত আবদুল্লাাহ ইবনে আব্বাস রা. এর রিওয়ায়াতসমূহের সংকলন। তাবিঈ হযরত সাঈদ ইবন জুবায়েরও তাঁর হাদীসসমূহ লিখিত আকারে সংকলন করতেন। (দারমী, পৃষ্ঠা ৬৮)
(৯) সহীফা আনাস মালেক রা.
সাঈদ ইবনে হেলাল বলেন, আনাস রা. তাঁর স্বহস্ত লিখিত সংকলন বের করে আমাদের দেখাতেন এবং বলতেন, এই হাদীসগুলো আমি সরাসরি রাসুল সা. এর নিকট শুনেছি এবং লিপিবদ্ধ করার পর তা পাঠ করে তাঁকে শুনিয়ে সত্যায়িত করে নিয়েছি। (সহীফায়ে হাম্মামের ভূমিকা পৃষ্ঠা ৩৪)

দ্বিতীয় যুগ
এই যুগটি প্রায় দ্বিতীয় হিজরী শতকের প্রথমার্ধে গিয়ে শেষ হয়। এই যুগে তাবিঈদের একটি বিরাট দল তৈরি হয়ে যায়। তাঁরা প্রথম যুগের লিখিত ভান্ডারকে ব্যাপক সংকলনসমূহে একত্র করেন।
এই যুগের হাদীস সংকলকগণ হলেন :
(১) মুহাম্মাদ ইবনে শিহাব
ইমাম যুহরী নামে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ (মত্যু ১২৪ হিজরী)। তিনি নিজ যুগের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ছিলেন। তিনি সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে উমার রা. আনাস ইবন মালেক রা. সাহল ইবনে সাদ রা. এবং তাবিঈ সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব রহ. ও মাহমুদ ইবনে রাবী রহ. প্রমুখের নিকট হাদীসের শিক্ষা লাভ করেন। ইমাম আওযাঈ রহ. ও ইমাম মালেক রহ. এবং সুফিয়ান ইবন উয়াইনা রহ. এর মত হাদীসের প্রখ্যাত ইমামগণ তাঁর ছাত্রদের মধ্যে গণ্য। ১০১ হিজরীতে উমার ইবনে আব্দুল আযীয রহ. তাঁকে হাদীস সংগ্রহ করে তা একত্র করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাছাড়া তিনি মদীনার গভর্নর আবু বাকর মুহাম্মাদ ইবনে আমর ইবনে হাযমকে নির্দেশ দেন যেন তিনি আবদুর রহমান কন্যা আমরাহ ও কাসিম ইবনে মুহাম্মাদের নিকট হাদীসের যে ভান্ডার রয়েছে তা লিখে নেন। এই আমরাহ রহ. হযরত আয়েশা সিদ্দীকার রা. বিশিষ্ট ছাত্রী ছিলেন এবং কাসিম ইবনে মুহাম্মাদ তাঁর ভ্রাতুস্পুত্র। হযরত আয়েশা রা. নিজের তত্ত্বাবধানে তাঁর শিক্ষা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। (তাহযীবুত তাহযীব, খ- ৭, পৃষ্ঠা.১৭২)

কেবল এখানেই শেষ নয়, বরং হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয রহ. ইসলামী রাষ্ট্রের সকল দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে হাদীসের এই বিরাট ভান্ডার সংগ্রহ ও সংকলনের জোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। ফলে হাদীসের বিরাট সম্পদ রাজধানীতে পৌঁছে গেল। খলীফা হাদীসের সংকলন প্রস্তুত করিয়ে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দিলেন। (হাযকিরাতুল হুফফাজ, খ- ১ পৃষ্ঠা ১০৬, জামিউল ইলম, পৃষ্ঠা.৩৮)

ইমাম যুহরীর সংগৃহীত হাদীস সংকলন করার পর এই যুগের অপরাপর আলেমগণও হাদীসের গ্রন্থ সংকলনের কাজ শুরু করেন। আবদুল মালেক ইবনে জুরাইজ (মৃত্যু ১৫০হিজরী) মক্কায়, ইমাম আওযাঈ (মৃত্যু ১৫৭ হিজরী) সিরিয়ায় মামার ইবনে রাশেদ (মৃত্যু ১৫৩ হিজরী) ইয়ামানে, ইমাম সুফিয়ান সাওরী (মৃত্যু ১৬১ হিজরী) কুফায়, ইমাম হাম্মাদ ইবনে সালামা (মৃত্যু ১৬৭ হিজরী) বসরায় এবং ইমাম আবদল্লাহ ইবনুল মুবারক (মৃত্যু ১৮১ হিজরী) খোরাসানে হাদীস সংগ্রহ ও সংকলনের কাজে সর্বাগণ্য ছিলেন।

(২) ইমাম মালেক ইবন আনাস রহ.
(জন্ম ৯৩ হিজরী, মৃত্যু ১৭৯ হিজরী) ইমাম যুহরীর পরে মদীনায় হাদীস সংকলন ও শিক্ষা দানের ক্ষেত্রে সর্বাগ্রগণ্য ছিলেন। তিনি নাফে, যুহরী ও অপরাপর আলেমের ইলম দ্বারা উপকৃত হন। তাঁর শিক্ষক সংখ্যা নয়শ পর্যন্ত পৌঁছেছে। তাঁর জ্ঞানের প্রসবণ থেকে সরাসরি হেজায, সিরিয়া, ইরাক, ফিলিস্তিন, মিসর, আফ্রিকা ও আন্দালুসিয়ার (স্পেন) হাজারো হাদীসের শিক্ষাকেন্দ্র তৃপ্ত হয়েছে। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে লাইস ইবনে সাদ (মৃত্যু ১৭৫ হিজরী), ইবনুল মুবারক (মৃত্যু ১৮১ হিজরী), ইমাম শাফিঈ (মৃত্যু ২০৪ হিজরী) ও ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে হাসান আশ শায়বানী (মৃত্যু ১৮৯ হিজরী) এর মত মহান ইমামগণ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

এই যুগে হাদীসের অনেকগুলো সংকলন রচিত হয়, যার মধ্যে ইমাম মালেক রহ. এর মুয়াত্তা বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। এই গ্রন্থ ১৩০ হিজরী থেকে ১৪১ হিজরীর মধ্যে সংকলিত হয়। এতে মোট ১৭০০ রিওয়ায়াত আছে। তার মধ্যে ৬০০টি মারুফ, ২২৮ টি মুরসাল, ৬১৩টি মাওকুফ রিওয়ায়াত এবং তাবেঈদের ২৮৫টি বাণী রয়েছে। এ যুগের আরও কয়েকটি সংকলনের নাম নি¤েœ দেয়া হল :
১। জামে সুফিয়ান সাওরী (মৃত্যু ১৬১হিজরী) ২। জামে ইবনুল মুবারাক, ৩। জামে ইবনে আওযাঈ (মৃত্যু ১৫৭হিজরী) ৪। জামে ইবনে জুরাইজ (মৃত্যু ১৫০হিজরী), ৫। ইমাম আবু ইউসুফ (মৃত্যু ১৮৩হিজরী) এর কিতাবুল খিরাজ, ৬। ইমাম মুহাম্মাদের কিতাবুল আসার। এই যুগে রাসুল (সা) এর হাদীস, সাহাবাদের আসার (বাণী) এবং তাবিঈদের ফতোয়াসমূহ একই সংকলনে সন্নিবিষ্ট করা হত। কিন্তু সাথে একথাও বলে দেওয়া হত যে, কোনটি রাসূল (সা) এর হাদীস এবং কোনটি সাহাবা অথবা তাবিঈদের বাণী।

তৃতীয় যুগ
এই যুগে প্রায় দ্বিতীয় হিজরী শতকের শেষার্ধ থেকে চতুর্থ শতকের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। এই যুগের বৈশিষ্ট্যগুলো নি¤œরুপ :
(১) এই যুগে রাসুল সা. হাদীসসমূহকে সাহাবাগণের আসার ও তাবিঈদের বাণী থেকে পৃথক করে সংকলন করা হয়।
(২) নির্ভরযোগ্য হাদীসসমূহের পৃথক সংকলন প্রস্তুত করা। এভাবে যাচাই বাচাই এবং গবেষণা ও অনুসন্ধানের পর দ্বিতীয় যুগের সংকলনসমূহ তৃতীয় যুগের বিরাট গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।
(৩) এই যুগে হাদীসসমূহ কেবল জমা করাই হয়নি, বরং ইলমে হাদীসের হেফাযতের জন্য মুহাদ্দিসগণ এই ইলমের এক শতাধিক শাখার ভিত্তি স্থাপন করলেন, যার উপর বর্তমান কাল পর্যন্ত হাজার হাজার গ্রন্থ রচিত হয়েছে।

সংক্ষিপ্তভাবে এখানে হাদীসের জ্ঞানের কয়েকটি শাখার পরিচয় দেয়া হল :
(১) ইলম আসমাইর রিজাল (রিজাল শাস্ত্র)
এই শাস্ত্রে হাদীস বর্ণনাকারী রাবীদের পরিচয়, জন্ম মৃত্যু, শিক্ষক ও ছাত্রদের বিবরণ, জ্ঞানার্জনের জন্য ব্যাপক ভ্রমণ এবং নির্ভরযোগ্য (সিকাহ) বা অনির্ভরযোগ্য হওয়া সম্পর্কে হাদীস শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞদের সিদ্ধান্ত সন্নিবেশিত হয়েছে। জ্ঞানের এই শাখা বহু ব্যাপক, উপকারী ও আকর্ষণীয়। কোন কোন গোঁড়া প্রাচ্যবিদও স্বীকার না করে পারেননি যে, রিজাল শাস্ত্রের বদৌলতে পাঁচ লাখ রাবীর জীবন ইতিহাস সংরক্ষিত হয়েছে। মুসলিম জাতির এই নজীর অন্য জাতির মধ্যে পাওয়া অসম্ভব। রিজাল শাস্ত্রের উপর শত শত গ্রন্থ প্রণীত হয়েছে। কয়েকটি গ্রন্থের নাম এখানে উল্লেখ করা হলঃ
(ক) তাহযীবুল কামাল : গ্রন্থকার ইমাম ইউসুফ আল মিযযী (মৃত্যু ৭৪২ হিজরী) রিজাল শাস্ত্রের এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ।
(খ) তাহযীবুত তাহযীব : গ্রন্থকার সহীহ বুখারীর ভাষ্যকার হাফেয ইবন হাজার আল আসকালীন (মৃত্যু ৮৫২ হিজরী) গ্রন্থটি ১২ খন্ডে বিভক্ত এবং হায়দারাবাদ (দাক্ষিণাত্য) থেকে প্রকাশিত।
(গ) তাযকিরাতুল হুফফাজ : গ্রন্থকার শামসুদ্দীন আয যাহাবী (মৃত্যু ৭৪৮ হিজরী, ) গ্রন্থটি পাঁচ খন্ডে সমাপ্ত।
(২) ইলম মুসতালাহুল হাদীস (উসূলে হাদীস)
এ শাস্ত্রের সাহায্যে হাদীসের বিশুদ্ধতা ও দুর্বলতা যাচাইয়ের নিয়ম কানুন জানা যায়। এই শাখায় প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হচ্ছে উলুমুল হাদীস। এটা মুকাদ্দামা ইবনিস সালাহ নামে পরিচিত। এর রচয়িতা হচ্ছেন আবু উমার ওয়া উসমান ইবনুস সালাহ (মৃত্যু ৫৭৭হিজরী)। নিকট অতীতে উসূলুল হাদীসের উপর দুটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। (ক) তাওজীহুন নাজার, গ্রন্থকার আল্লামা তাহের ইবনে সালেহ জাযাইরী (মৃত্যু ১৩৩৮হিজরী) এবং (২) কাওয়াইদুল হাদীস, গ্রন্থাকার আল্লামা সাইয়িদ জামালুদ্দীন কাসিমী (মৃত্যু ১৩৩১২ হিজরী)। প্রথমোক্ত গ্রন্থে হাদীসের মূলনীতি (উসূল) শাস্ত্র সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনা করা হয়েছে এবং শেষোক্ত গ্রন্থে এই জ্ঞানকে সুন্দরভাবে বিন্যাস্ত করা হয়েছে।
(৩) ইলম আরীবুল হাদীস
এই শাস্ত্রে হাদীসের কঠিন ও দ্ব্যর্থবোধক শব্দসমূহের আভিধানিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই শাস্ত্র আল্লামা যামাখশারী (মৃত্যু ৫৩৮ হিজরী) এর আল ফাইক এবং ইবনুল আছীর (মৃত্যু ৬০৬ হিজরী) এর নিহায়া গ্রন্থদ্বয় উল্লেখযোগ্য।
(৪) ইলম তাখরীজিল আহাদীস
প্রসিদ্ধ তাফসীর, ফিকহ, তাসাওউফ ও আকাইদ এর গ্রন্থসমূহে যেসব হাদীসের উল্লেখ করা হয়েছে ইলমের এই শাখার মাধ্যমে তার উৎস সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়। যেমন বুরহানুদ্দীন আলী ইবনে আবি বাকর আল মারগীনানী (মৃত্যু ৫৯২ হিজরী) এর আল হিদায়া নামক ফিকহ গ্রন্থে এবং ইমাম গাযালী (মৃত্যু ৫০৫ হিজরী) এর ইহয়াউ উলুম গ্রন্থে অনেক হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে কিন্তু তার সনদ ও গ্রন্থ বরাত উল্লেখ করা হয়নি। এখন কোন পাঠক যদি জানতে চায় এই হাদীসগুলো কোন পর্যায়ের এবং হাদীসের কোন সব গুরুত্বপূর্র্ণ গ্রন্থে তা উল্লেখ আছে, তবে প্রথমোক্ত গ্রন্থের জন্য হাফয যাইলাঈ (মৃত্যু ৭৯২ হিজরী) এর নাসাবুর রাইয়াহ ও হাফেয ইবনে হাজার আল আসকালানীর আদ দিরাইয়াহ গ্রন্থদ্বয়ের সাহায্য নিতে হবে। আর শেষোক্ত গ্রন্থের জন্য হাফেজ যায়নুদ্দীন ইরাকী (মৃত্যু ৮০৬ হিজরী) এর আল মুগনী আন হামালিল আসফার গ্রন্থের সাহায্য নিতে হবে।
(৫) ইলমুল আহাদিসুল মাওদুআহ
এই বিষয়ের উপর বিশেষজ্ঞ আলেমগণ স্বতন্ত্র গ্রন্থ সংকলন করেছেন এবং মাওদু(মনগড়া) রিওয়ায়াতগুলো পৃথক করে দিয়েছেন। এ বিষয়ের উপর কাযী শাওকানী (মৃত্যু ১২৫৫ হিজরী) এর আল আওয়াইদুল মাজমুআহ এবং হাফেজ জালালুদ্দীন সূয়াতী (৯১১ হিজরী) এর আল লালিল মাসনুআহ গ্রন্থদ্বয় সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।

(৬) ইলমুল নাখিস ওয়াল মানসুখ
এই শাস্ত্রের উপর ইমাম মুহাম্মদ ইবনে মূসা হাযিমী (মৃত্যু ৭৮৪ হিজরী) এর কিতাবুল ইতিবার অধিক প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য।

(৭) ইলমুত তাওফীক যাইনাল আহাদীস
যেসব হাদীসের বক্তব্যের মধ্যে বাহ্যত পারস্পরিক বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়, জ্ঞানের এই শাখায় তার সঠিক ব্যাখ্যা দান করা হয়েছে। সর্বপ্রথম ইমাম শাফিঈ (মৃত্যু ২০৪ হিজরী) এই বিষয়ের উপর আলোচনা করেন। তাঁর পুস্তিকাখানী মুখতালিফুল হাদীস নামে প্রসিদ্ধ। ইমাম তাহাবী (মৃত্যু ৩২১হিজরী) এর মুশকিলুল আছার ও এ বিষয়ে একখানি সহায়ক গ্রন্থ।

(৮) ইলমুল মুখতালিফ ওয়াল মুতালিফ
এই শাখায় হাদীসের যেসব রাবীর নাম, ডাকনাম, উপাধি, পিতা দাদার অথবা শিক্ষকদের নাম পরস্পর সংমিশ্রিত হয়ে গেছে তাদের সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে, মিশ্রণ জানিত এই সংশয়ের কারণে যে কোন অনভিজ্ঞ লোক ভূলে শিকার হতে পারে। এই বিষয়ের উপর ইবনে হাজার আল আসকালানী রহ. এর তাবীরুল মুস্তাবিহ গ্রন্থখানি অধিক পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণ।

(৯) ইলম আতরাফিল হাদীস
জ্ঞানের এই শাখার সাহায্যে কোন হাদীস কোন গ্রন্থে আছে এবং কে কে তার রাবী তা জানা যায়। যেমনঃ কোন ব্যক্তির ইন্নামাল আমালু বিন নিয়াত হাদীসের একটি বাক্য মনে আছে। সে পূর্ণ হাদীসটি এবং সকল রাবী ও হাদীসের কোন গ্রন্থে তা আছে সেটা জানতে চায়। তখন তাকে এই শাস্ত্রের সাহায্য নিতে হবে। এই বিষয়ে হাফেজ মিযযী (মৃত্যু ৭৪২ হিজরী) এর তুহফাহুল আশরাফ গ্রন্থখানি অধিক ব্যাপক ও বিস্তৃত। এই গ্রন্থে সিহাহ সিত্তার সব হাদীসের সূচি এসে গেছে। এই গ্রন্থের বিন্যাসে তাঁর ২৬ বছর সময় লেগেছে। কঠোর পরিশ্রমের পর গ্রন্থখানি পূর্ণত্ব প্রাপ্ত হয়।

বর্তমান কালে প্রাচ্যবিদগণ এইসব গ্রন্থের সাহায্যে কিছুটা নতুন ঢং এ হাদীসের সূচি প্রস্তুত করেছেন। যেমনঃ মিফতাহ মুনুষিস সুন্নাহ গ্রন্থখানি ইংরেজীতে প্রকাশিত হয়েছে এবং ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দ মিসর থেকে এর আরবী সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছ। বর্তমানে আল মুজামুল মাফাহরাস লি আলফাজিল হাদীসিন নাবাবী নামে একটি সূচি এ.জে. ব্রিল কর্তৃক লাইডেন(নেদারল্যান্ড) থেকে আরবীতে প্রকাশিত হয়েছে। এটা বৃহৎ সাত খন্ডে বিভক্ত এবং এতে সিহাহ সিত্তা ছাড়াও মুয়াত্তা ইমাম মালেক, মুসনাদে আহমাদ ও দারিমীর হাদীস সূচীও যোগ করা হয়েছে।

(১০) ফিকহুল হাদীস
এই শাখায় হুকুম আহকাম সম্বলিত হাদীসসমূহের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এ বিষয়ের উপর হাফেজ ইবনুল কাইয়্যেম(মৃত্যু ৭৫১ হিজরী) এর ইলামুল মুকিঈন এবং শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী(মৃত্যু ১১৭৬ হিজরী) এর হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ প্রন্থদ্বয়ের সাহায্য নিয়া যেতে পারে। এ ছাড়াও বিশেষজ্ঞ আলেমগণ জীবন ও কর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ের উপর স্বতন্ত্র গ্রন্থও রচনা করেছেন। যেমন অর্থনৈতিক বিষয় সম্পর্কে আবু উবায়েদ কাসিম ইবনে সাল্লাম (মৃত্যু ২২৪ হিজরী) এর কিতাবুল আমওয়াল গ্রন্থ সুপ্রসিদ্ধ এবং জমীন, উশর, খাজনা প্রভৃতি বিষয়ের উপর ইমাম আবু ইউসূফ(মৃত্যু ১৮২হিজরী) এর কিতাবুল খারাজ একটি সর্বোত্তম সংকলন। অনন্তর শরীআ আইনের অন্যতম দ্বিতীয় উৎস হওয়া সম্পর্কে এবং হাদীস প্রত্যাখানকারীদের (মুনাকিরীনে হাদীস) ছড়ানো ভ্রান্ত মতবাদের মুখোশ উন্মোচন করার জন্য নি¤œলিখিত গ্রন্থগুলো অত্যন্ত উপকারী।

(১) কিতাবুল উম্ম ৭খন্ড, (২) আর রিসালা ইমাম শাফিঈ, (৩) আল মুওয়াফিকাত ৪খন্ড, এর রচয়িতা হচ্ছেন আবু ইসহাক শাতিবী, (মৃত্যু ৭৯০ হিজরী), (৪) সাওয়াইক মুরসিলা (২খন্ড), রচয়িতা ইবনুল কাইয়্যেম, (৫) ইবনে হাযম আন্দালুসী (মৃত্যু ৪৫৬ হিজরী) এর আল আহকাম, (৬) মাওলানা বদরে আলম মীরাঠির মুকাদ্দমা তারজুমানুস সুন্নাহ (উর্দু), (৭) অত্র গ্রন্থের সংকলকের পিতা মাওলানা হাফেজ আবুদস সাত্তার হাসান উমরপুরীর ইসবাতুল খাবার (৮) মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদূদীর হাদীস আওর কুরআন। অনন্তর (৯) ইনকারে হাদীস কা মানজার আওর পাস মানজার নামে জনাব ইফতেখার আহমাদ বালখীর গ্রন্থখানিও সুখপাঠ্য। এ পর্যন্ত গ্রন্থটির দুই খন্ড প্রকাশিত হয়েছে।

ইলমে হাদীসের ইতিহাস ও তৎসংশ্লিষ্ট বিষয়ের উপর নি¤েœাক্ত গ্রন্থসমূহে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
হাফেজ ইবনে হাজার আল আসকালানী রহ. এর ফাতহুল বারী গ্রন্থের ভূমিকা, হাফেজ ইবনে আবদিল বার আল আন্দাসুলী (মৃত্যু ৪৬৩ হিজরী) এর জামি বায়ানিল ইলম ওয়া আহলিহি, ইমাম হাকেম নিশাপুরী(মৃত্যু ৪০৫ হিজরী) এর মারিফাতু উলুমিল হাদীস, মাওলানা আবদুর রহমান (মুহাদ্দিস) মুবারকপুরী(মৃত্যু ১৩৫৩ হিজরী) এর তুহফাতুল আহওয়াযী গ্রন্থের ভূমিকা। নিকট অতীতে রচিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে এই শেষোক্ত গ্রন্থটি আলোচনার ব্যাপকতা ও প্রয়োজনের দিক থেকে একটি শ্রেষ্ঠ অবদান। অনুরূপভাবে মাওলানা শাব্বির আহমাদ উসমানীর ফাতহুল মুলহিম গ্রন্থের ভূমিকা এবং মাওলানা মানাজির আহসান গীলানীর তাদবীনে হাদীস (উর্দু) গ্রন্থদ্বয়েও ইলমে হাদীসের ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

তৃতীয় যুগের হাদীস সংকলকবৃন্দ
এ যুগের প্রসিদ্ধ হাদীস সংকলকবৃন্দ ও নির্ভরযোগ্য সংকলনসমূহের পরিচয় নি¤েœ দেয়া হল :

(১) ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ.
(জন্ম ১৬৪ হিজরী, মৃত্যু ২৪১ হিজরী) এর গুরুত্বপূর্ণ সংকলন মুসনাদে আহমাদ নামে পরিচিত। এতে তিরিশ হাজার হাদীস (পুনরাবৃত্তিসহ) বর্তমান রয়েছে। গ্রন্থটি ৫খন্ডে বিভক্ত। উল্লেখযোগ্য সব হাদীস এতে সংগৃহীত হয়েছে। এতে বিষয়সূচি অনুযায়ী বিন্যাসের পরিবর্তে প্রত্যেক সাহাবীর বর্ণিত সব হাদীস একত্রে সন্নিবেশ করা হয়েছে। এই গ্রন্থের হাদীসগুলো বিষয়সূচি অনুযায়ী বিন্যাস করার কাজ শায়খ হাসানুল বান্না শহীদের পিতা আহমাদ আবদুর রহমান সা আতী শুরু করেছিলেন। ত৭ার এ গ্রন্থটি ২৪খন্ডে প্রকাশিত হয়েছে।

(২) ইমাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল বুখারী রহ.
(জন্ম ১৯৪হিজরী, মৃত্যু ২৫৬হিজরী)। তাঁর জন্ম তারিখ সত্যবাদিতা এবং মৃত্যু তারিখ নূর বিচ্ছুরণ করে। তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে সহীহ বুখারী। এর পূর্ণ নাম আল জামিউস সহীহুল মুসানাদুল মুখতাসার মিন উমুরি রাসুলিল্লাহি সা.

এই গ্রন্থ সংকলনে ১৬ বছর সময় লেগেছে। তাঁর কাছে সরাসরি সহিহ বুখারী অধ্যয়নকারী ছাত্রের সংখ্যা ৯০ হাজার পর্যন্ত পৌঁছেছে। কখনও কখনও একই মজলিসে উপস্থিতিদের সংখ্যা ২ হাজারে পৌঁছে যেত। এই ধরনের মজলিসে পরপর পৌঁছে দেয়া লোকদের সংখ্যা তিন শতের অধিক হত (কারণ তখন মাইক বা লাউডস্পিকারের সুবিধা ছিল না) এই গ্রন্থে মোট ৯,৬৮৪টি হাদীস রয়েছে। পুনরুক্তি ও তালীকাত (সনদবিহীন রিওয়ায়াত), শাওয়াহিদ (সাহাবাদের বাণী) ও মুরসাল হাদীস বাদ দিলে শুধু মারফু হাদীসের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬, ২৩০ এর। ইমাম বুখারী রহ. অপরাপর মুহাদ্দিসের তুলনায় অধিক শক্ত মানদন্ডে রাবীদের যাচাই বাছাই করেছেন।

(৩) ইমাম মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ আবুল হুইসাইন আল কুশাইরী রহ.
(জন্ম ২০২ হিজরী, মৃত্যু ২৬১ হিজরী)। ইমাম বুখারী এবং ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. তাঁর শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ইমাম তিরমিযী, আবু হাতিম রাবী ও আবু বাকর ইবনে খুযাইমা তাঁর ছাত্র ছিলেন। তাঁর সংকলিত গ্রন্থ সহীহ মুসলিম বিন্যাসগত দিক থেকে সুপ্রসিদ্ধ। এই গ্রন্থে মোট ৯,১৯০ টি হাদীস (পুনরুক্তিসহ)

(৪) ইমাম আবু দাউদ আশআছ ইবনে সুলাইমান আস সিজিস্তানী রহ.
(জন্ম ২০২ হিজরী, মৃত্যু ২৭৫) সুনানে আবি দাউদ নামে প্রসিদ্ধ। এই গ্রন্থে আহকাম সম্পর্কিত হাদীস পরিপূর্ণরূপে একত্র করা হয়েছে। ফিকহী ও আইনগত বিষয়ের জন্য এই গ্রন্থ এ কটি উত্তম উৎস। এতে ৪,৮০০ হাদীস রয়েছে।

(৫) ইমাম আবু ঈসা তিরমিযী রহ.
(জন্ম ২০৯ হিজরী, মৃত্যু ২৭৯ হিজরী) তাঁর সংকলিত গ্রন্থ জামে আত তিরমিযী নামে পরিচিত। এতে ফিকহী বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে এবং একই বিষয়ে যে যে সাহাবীর হাদীস রয়েছে তাঁর নামও উল্লেখ করা হয়েছে।

(৬) ইমাম আহমদ ইবনে শুআইব নাসাঈ রহ.
(মৃত্যু ৩০৩ হিজরী)। তাঁর সংকলনের নাম আস সুনানুল মুজতবা, যা সুনানে নাসাঈ নামে প্রসিদ্ধ।

(৭) ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াজিদ ইবনে মাজা কাযবীনী রহ.
(মৃত্যু ২৭৩ হিজরী)। তাঁর সংকলিত গ্রন্থ সুনানে ইবনে মাজা নামে প্রসিদ্ধ। মুসনাদে আহমাদ গ্রন্থ ছাড়া উল্লিখিত ছ’টি গ্রন্থকে হাদীস বিশারদদের পরিভাষায় সিহাহ সিত্তা বলা হয়। কোন কোন বিশেষজ্ঞ আলেম ইবনে মাজাহ গ্রন্থের পরিবর্তে ইমাম মালেকের মুয়াত্তা গ্রন্থকে সিহা সিত্তার মধ্যে গণ্য করেন।
উল্লিখিত গ্রন্থগুলি ছাড়া এ যুগে আরও অনেক প্রয়োজনীয় এবং পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচিত হয়েছে, যার বিস্তাারিত বিবরণ এখানে দেয়া সম্ভব নয়। বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী এই তিনটি গ্রন্থকে একত্রে জামি বলা হয় অর্থাৎ আকীদা বিশ্বাস, ইবাদাত, নৈতিকতা, পারস্পরিক লেনদেন ও আচার ব্যবহার ইত্যাদি শিরোনামের অধীন হাদীসসমূহ এতে বর্তমান আছে। আবু দাউদ, নাসাঈ ও ইবনে মাজাকে একত্রে সুনান বলা হয়। অর্থাৎ এই গ্রন্থগুলোতে বাস্তব কর্মজীবনের সাথে সম্পর্কিত হাদীসই বেশী স্থান পেয়েছে।

চতুর্থ যুগ
এই যুগ হিজরী পঞ্চম শতক থেকে শুরু হয় এবং তা বর্তমান কাল পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। এই সুদীর্ঘ সময়ে তৃতীয় যুগের গ্রন্থ রচনার কাজ সমাপ্তি পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এই যুগে যে কাজ হয়েছে তার বর্ণনা নি¤েœ দেয়া হল।
(১) হাদীসের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাবলীর ভাষ্যগ্রন্থ, টীকা অন্যান্য ভাষায় তরজমা গ্রন্থ রচিত হয়েছে।
(২) হাদীসের যেসব শাখা প্রশাখার কথা ইতিপূর্বে উল্লিখিত হয়েছে, সেসব বিষয়ের উপর এই যুগেই অসংখ্য গ্রন্থ এবং এসব গ্রন্থের ব্যাখ্যা ও সারসংক্ষেপ রচিত হয়েছে।
(৩) বিশেষজ্ঞ আলেমগণ নিজেদের আগ্রহ অথবা প্রয়োজনের তাগিদে তৃতীয় যুগের রচিত গ্রন্থাবলী থেকে হাদীস চয়ন করে প্রয়োজনীয় গ্রন্থ পস্তুত করেছেন। এ ধরনের কয়েকটি গ্রন্থের নাম এখানে উল্লেখ করা হলঃ
(ক) মিশকাতুল মাসাবীহ : সংকলক ওয়ালীউদ্দীন খতীব তাবরীযী। নির্বাচিত সংকলনগুলোর মধ্যে এটাই সর্বাধিক জনপ্রিয় গ্রন্থ। এতে সিহাহ সিত্তার প্রায় সব হাদীস এবং আরও দশটি মৌলিক গ্রন্থের হাদীস সন্নিবেশিত হয়েছে। এই গ্রন্থে আকিদা, বিশ্বাস, ইবাদাত, পারস্পরিক লেনদেন ও আচার ব্যবহার, চরিত্র, নৈতিকতা, শিষ্টাচার এবং আখিরাত সম্পর্কিত রিওয়ায়াতসমূহ একত্র করা হয়েছে।
(খ) রিয়াদুস সালেহীন : সংকলক ইমাম আবু যাকারিয়া ইবনে শারাফুদ্দনি নববী (মৃত্যু ৬৭৬ হিজরী)। তিনি সহীহ মুসলিমেরও ভাষ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন। এটা বেশীর ভাগ চরিত্র, নৈতিকতা ও শিষ্টাচার সম্পর্কিত হাদীস সম্বলিত একটি চয়নিকা। প্রতিটি অনুচ্ছেদের প্রারম্ভে প্রাসঙ্গিক আয়াতও উল্লেখ করা হয়েছে। এটাই এই গ্রন্থের গুরুত্ব¡পূর্ণ বৈশিষ্ট্য। সহীহ বুখারীর সংকলন এবং বিন্যাস পদ্ধতিও এইরূপ।
(গ) মুনতাকাল আখবার : সংকলক মাজদুদ্দীন আবুল বারাকাত আবদুস সালাম ইবনে তাইমিয়া (মৃত্যু ৬৫২ হিজরী)। তিনি শায়খুল ইসলাম তাকিউদ্দীন আহমাদ ইবনে তাইমিয়া (মৃত্যু ৭২৮ হিজরী) এর দাদা। আল্লামা শাওকানী নাইনুল আওতার নামে (আট খন্ড) এই গ্রন্থের একটি শরাহ (ভাষ্য গ্রন্থ) লিখেছেন।
(ঘ) বুলুগুল মারাম : সংকলক সহীহ বুখারীর ভাষ্যকার হাফেজ ইবনে হাজার আল আসকালীন (মৃত্যু ৮৫২ হিজরী)। এই চয়নিকায় ইবাদত ও মুআমালাত সম্পর্কিত হাদীসই অধিক সন্নিবেশিত হয়েছে। মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল আস সানআনী (মৃত্যু ১১৮২ হিজরী) সুবুলুস সালাম শিরোনামে আরবী ভাষায় এবং নওয়াব সিদ্দিক হাসান খান (মৃত্যু ১৩০৭ হিজরী), মিসকুল খিতাম নামে ফারসী ভাষায় এর ভাষ্য লিখেছেন।
হিমালয়ান উপমহাদেশে সর্বপ্রথম শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিস দিললবী (মৃত্যু ১০৫২ হিজরী) সুসংগঠিতভাবে ইলমে হাদীসের চর্চা শুরু করেন। তাঁর পরে শাহ ওয়ালীউল্লাহ (মৃত্যু ১১৭৬ হিজরী), তাঁর পুত্রগণ, পৌত্রগণ এবং সুযোগ্য শাগরিদবৃন্দের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় পৃথিবীর এই অংশ সুন্নাতে নববীর আলোকে সমুজ্জ্বল হয়ে উঠে।
শাহ ওয়ালীউল্লাহ রহ. এর পর থেকে হাদীসের অনুবাদ গ্রন্থ, ব্যাখ্যা এবং চয়নিকা গ্রন্থ প্রণয়ন ও প্রকাশের পূণ্যময় কাজ আজ পর্যন্ত অব্যাহত আছে। এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে অনুমান করা যায় যে, নবী সা. যুগ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত কোন একটি যুগেও হাদীসের চর্চা বন্ধ হয়নি।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া