গবেষণা কী কেন কীভাবে? -মাওলানা আবদুর রাজ্জাক

0
85
মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির সেরা জীব। চিন্তা-গবেষণার মহান দায়িত্ব দেয়া হয়েছে মানুষকে। চিন্তা-গবেষণার যোগ্যতা হিসেবে দেয়া হয়েছে বিবেক ও জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব। তাদেরকে সে জ্ঞান ও বিবেক খাটিয়ে স্বীয় জীবনের কল্যাণের পথ উন্মোচন করতে চিন্তা-গবেষণার তাগিদ প্রদান করা হয়েছে। পবিত্র কালামে পাকে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন ‘তবে কি তারা লক্ষ্য করে না উটের প্রতি, কিভাবে তা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং আকাশের প্রতি, কিভাবে তাকে উঁচু করা হয়েছে এবং পাহাড়সমূহের প্রতি কিভাবে তাকে প্রথিত করা হয়েছে এবং ভূমির প্রতি, কিভাবে তা বিছানো হয়েছে” (সূরা গাশিয়া ১৭-২০)
ইসলাম চিরন্তন শাশ্বত জীবনব্যবস্থা। মানুষের প্রয়োজনীয় সকল কাজের দিকনির্দেশনা রয়েছে ইসলামে। তাই ইসলামের আলোকে জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে যে সব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, সেগুলোর সমাধান কল্পে গবেষণা একটি অপরিহার্য বিষয়।

গবেষণা কী?
গবেষণা হলো সত্য অনুসন্ধানের বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। যার সাধারণ অর্থ হলো, সত্য ও জ্ঞানের অনুসন্ধান। এর সমার্থবোধক শব্দ হলো জিজ্ঞাসা, তদন্ত, অন্বেষা, অনুসন্ধান, বিকিরণ এবং নিরুপণ।
গবেষণা হলো জিজ্ঞাসার উত্তর, অন্বেষণের লক্ষ্যে তদন্ত করা এবং তদন্তের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা। সংগৃহীত তথ্যের চিত্র অনুসন্ধান করে জিজ্ঞাসার উত্তর বের করা।
আরবীতে একে ‘বাহাস’ বলা হয়। যার অর্থ হলো মাটির ভিতর কোন কিছু তালাশ করা, খুঁজে বের করা, ইত্যাদি।
“গবেষণাকে ইংরেজিতে বলা হয় ৎবংবধৎপয। উক্ত শব্দটি দুটি শব্দ ৎব এবং ংবধৎপয দ্বারা গঠিত। প্রথম শব্দের অর্থ হলো পুনঃ পুনঃ আর দ্বিতীয়টির অর্থ হলো অনুসন্ধান করা, কিছু খুঁজে বের করা। এক কথায় জ্ঞানের কোন শাখায় নতুন তথ্য সংগ্রহের জন্য ব্যাপক ও স্ব-যত্ন তথ্যানুসন্ধান হলো গবেষণা”। এ ব্যাপারে
দার্শনিকদের নানা অভিমত পাওয়া যায়।
সাইয়্যেদ শরীফ বলেন, “দুটি বস্তুর ভিতর ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাবের দলীলের মাধ্যমে সম্পর্ক স্থাপনের নাম হলো গবেষণা”।
ফানদালীল বলেন, “উপস্থিত জ্ঞানের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে সু-শৃঙ্খল অনুসন্ধান বা পর্যালোচনা, যা উদ্বৃতি, প্রকাশ ও প্রচারের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় তা হলো গবেষণা।

ধর্মীয় গবেষণা
ধর্মীয় গবেষণায় জীবনের যে কোন দিক সংশ্লিষ্ট বিধি-বিধান স্পষ্টরূপে বর্ণনা করার প্রয়াস চালানো হয়। নিখুঁত পদ্ধতি, সঠিক উপলদ্ধি, নির্ভুল বুঝের ভিত্তিতে গভীর অধ্যয়নের মধ্য দিয়ে দীনের আলোকে কোন সমস্যার সমাধান করার প্রচেষ্টা হলো ধর্মীয় গবেষণা। -(লামহাত ফিল মাকতাবাহ)
ড. উজ্জাজ আল খতবি বলেন, ইসলামী গবেষণা এমন সকল বিষয়ভিত্তিক অধ্যয়ন; যা জীবনের যে কোন একটি বিশেষ দিক সংশ্লিষ্ট বিধান স্পষ্টভাবে বর্ণনা করবে। অথবা নির্ভুল পদ্ধতি, সঠিক উপলদ্ধি, গভীর নিরীক্ষণ, যথাযথ অনুধাবনের ইসলামী মূল্যবোধ ও এর বিধানের মধ্য দিয়ে সামাজিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের প্রয়াস চালাবে।

ইসলামে গবেষণার গুরুত্ব
ইসলাম ধর্মে গবেষণার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীতা অপরিসীম। কুরআন ও হাদীসে বিভিন্ন ধরণের গবেষণার ব্যাপারে বিশেষভাবে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। পবিত্র কালামে পাকের অমোঘ ঘোষণা ‘নিশ্চয়ই মহাকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টিতে এবং দিবা-রাত্রির আবর্তনের মধ্যে বোধ সম্পন্ন লোকদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহর যিকির করে এবং মহাকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টির বিষয়ে চিন্তা-গবেষণা করে এবং বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! এ সব কিছু তুমি অনর্থক সৃষ্টি করনি। সব পবিত্রতা একমাত্র তোমারই। আমাদের তুমি দোযখের শাস্তি হতে বাঁচাও।” (সূরা আলে-ইমরান ১৯০-৯১)
কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কালামে পাকে আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘আমি একে আরবী ভাষায় কুরআনরূপে অবতীর্ণ করেছি, যাতে তোমরা বুঝতে পারো।” (সূরা ইউসূফ-২)
যারা চিন্তা-ভাবনা করে তাদেরকে জ্ঞানী আর যারা চিন্তা-ভাবনা করে না তদেরকে মুর্খ আখ্যায়িত করে কালামে পাকে আল্লাহ বলেন ‘আপনি বলে দিন, অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি সমান হতে পারে? তোমরা কি চিন্তা করো না?” (সূরা আনআম-৫০)।
জ্ঞানী ও গবেষকদের মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মাধ্যে যারা জ্ঞান প্রাপ্ত আল্লাহ তাদের মর্যাদা উর্ধ্বে করে দেবেন”। (সূরা মুজাদালা-১১)
সূরা বাকারার ২৬৬ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘এমনিভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য নিদর্শন সমূহ বর্ণনা করেন, যাতে চিন্তা-ভাবনা কর”।
সূরা নাহলের ৪৪ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘সে রাসূলদেরকে উজ্জ্বল নিদর্শন ও আসমানী কিতাব দিয়ে পাঠানো হয়েছিলো। হে নবী! আমি আপনার প্রতিও এই কিতাব নাযিল করেছি, আপনি মানুষের সামনে সে সব বিষয় ব্যাখ্যা করে দেন, যা তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে এবং যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা রূম-২২)
যারা জ্ঞান গবেষণার কাজে ব্যস্ত থাকবেন, আল্লাহ তাদের জিহাদ বা সিয়াম পালন করার মত সাওয়াব দান করবেন। তাই রাসূল সা. এরশাদ করেন, শিক্ষা নিয়ে গবেষণা করা জিহাদতুল্য।-(আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব)

গবেষণা কেন করবে?
১. সৃষ্টিকর্তার পরিচয় লাভের জন্য
সূরা বাকারার ১৬৪ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আকাশম-ল ও পৃথিবীর সৃজনে, রাত-দিনের একটানা আবর্তনে সে সব নৌযানে যা মানুষের উপকারী সামগ্রী নিয়ে সাগরে বয়ে চলে, সেই পানিতে যা আল্লাহ আাকাশ থেকে বর্ষণ করেছেন এবং তার মাধ্যমে ভূমিকে তার মৃত্যুর পর সঞ্জিবিত করেছেন ও তাতে সর্বপ্রকার জীব-জন্তু ছড়িয়ে দিয়েছেন এবং বায়ুর দিক পরিবর্তনে এবং সেই মেঘমালাতে যা আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে আজ্ঞাবহ হয়ে সেবায় নিয়োজিত আছে বহু নিদর্শন আছে সেই সকল লোকের জন্য যারা নিজেদের জ্ঞান-বুদ্ধিকে কাজে লাগায়’।
আল্লাহ তা’আলা কুরআন মাজীদের বিভিন্ন স্থানে বিশ্ব-জগতের এমন সব অভিজ্ঞানের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, যা আমাদের চোখের সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যৌক্তিক ভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, সেগুলো আল্লাহ তা’আলার অস্তিত্ব ও একত্বের প্রতি সুস্পষ্ট নিদর্শন বহন করে। আসমান-যমীনের সৃষ্টিরাজি নিরবধি যেভাবে কাজ করে যাচ্ছে, চন্দ্র-সূর্য যেভাবে এক বাধাধরা সময়সূচি অনুযায়ী দিবা-রাত্র পরিভ্রমণরত আছে, সাগর যেভাবে অফুরন্ত পানির ভা-ার হওয়ার সাথে সাথে নৌযানের মাধ্যমে স্থলভাগের বিভিন্ন অংশকে পরস্পর জুড়ে রেখেছে এবং তাদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী স্থান হতে স্থানান্তরে পৌঁছে দেয়, মেঘ ও বায়ু যেভাবে মানুষের জীবন-সামগ্রীর ব্যবস্থা করে দেয়, তাতে এসব বস্তু সম্পর্কে কেবল অকাট্য মূর্খই এটা ভাবতে পারে যে, এগুলো কোন ¯্রষ্টা ছাড়া আপনা-আপনিই অস্তিত্ব লাভ করেছে।

কুরআনে কারীম বুদ্ধিমানের এমন কয়েকটি লক্ষণ বাতলে দিয়েছে, যা প্রকৃত পক্ষেই বুদ্ধির মাপকাঠি হিসেবে গণ্য হতে পারে। প্রথম লক্ষণটি হলো, আল্লাহ তা’আলার প্রতি ঈমান আনা। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, অনুভূত বিষয়ের জ্ঞান কান, নাক, চোখ, জিহ্বা প্রভৃত্তি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারাও লাভ করা যায়। নির্বোধ জীব-জন্তুর মধ্যেও তা রয়েছে। পক্ষান্তরে বুদ্ধির কাজ হলো, লক্ষ্যণীয় নিদর্শনাদির মধ্য থেকে গৃহীত দলীল-প্রমাণের মাধ্যমে এমন কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যা অনুভবযোগ্য নয় এবং যার দ্বারা বাস্তবতার সর্বশেষ উৎকর্ষ লাভ করতে পারে।
এই মূলনীতির প্রেক্ষিতে সৃষ্টি জগতের প্রতি লক্ষ্য করলে আসমান-যমীন এবং এর অন্তর্গত যাবতীয় সৃষ্টি ও সেগুলোর ক্ষুদ্র-বৃহৎ সামগ্রীর সুদৃঢ় ও বিস্ময়কর পরিচালন-ব্যবস্থা বুদ্ধিকে এমন এক সত্তার সন্ধান দেয়, যা জ্ঞান-অভিজ্ঞান ও শক্তি-সামর্থের দিক দিয়ে সর্বোচ্চ স্তরে উপনীত এবং যিনি যাবতীয় বস্তু সামগ্রীকে বিশেষ হিকমতের দ্বারা তৈরি করেছেন। তার ইচ্ছাতেই সমগ্র ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে। বস্তুতঃ সে সত্তা একমাত্র আল্লাহরই হতে পারে।
মানুষের ইচ্ছা ও পরিকল্পনার ব্যর্থতা সর্বদা সর্বত্রই পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। কাজেই তাকে এই ব্যবস্থার পরিচালক বলা চলে না। সে জন্যই আসমান ও যমীনের সৃষ্টি এবং তাতে উৎপন্ন বস্তুসমূহের সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করলে বুদ্ধিমানের সামনে একটি মাত্র পরিণতি সাব্যস্ত হয়ে থাকবে। আর তা হলো আল্লাহর পরিচয় লাভ, তার আনুগত্য এবং তারই যিকির করা। যে ব্যক্তি এ ব্যাপারে শৈথিল্য প্রদর্শন করবে, সে বুদ্ধিমান বলে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য নয়। কাজেই কুরআন মাজীদ বুদ্ধিমানদের লক্ষণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছে, ‘বুদ্ধিমান হলো সে সমস্ত লোক যারা আল্লাহ তা’আলাকে স্মরণ করে বসে, শুয়ে, ডানে, বায়ে অর্থাৎ সর্বাবস্থায় সর্বক্ষণ আল্লাহ তা’আলার স্মরণে নিয়োজিত থাকে।”
এতে বুঝা গেল যে, বর্তমান পৃথিবী যে বিষয়টিকে বুদ্ধি এবং বুদ্ধিমানের মাপকাঠি বলে গণ্য করে নিয়েছে, তা শুধু মাত্র একটা মরিচিকা। কেউ ধন-সম্পদ গুটিয়ে নেয়াকে বুদ্ধিমত্তা সাব্যস্ত করেছে, কেউ বিভিন্ন ধরণের মেশিনারিজ যন্ত্রপাতি তৈরি করা কিংবা বাষ্প-বিদ্যুৎকে প্রকৃত শক্তি মনে করার নামই রেখেছে বুদ্ধিমত্তা। কিন্তু সুস্থ বিবেক ও সুষ্ঠু বুদ্ধির কথা হলো তাই, যা আল্লাহ তা’আলার নবী-রাসূলগণ নিয়ে এসেছেন। যাতে করে ইলম ও হিকমতের আলোকে পার্থিব ব্যবস্থা পরম্পরা নি¤œ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত হয়ে গিয়ে মর্ধবর্তী পর্যায়গুলোকে উপেক্ষা করেছে। বিজ্ঞান তোমাদেরকে কাঁচামাল থেকে কল-কারখানা পর্যন্ত এবং কল-কারখানা থেকে বাষ্প-বিদ্যুতের শক্তি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু বুদ্ধির কাজ হলো আরও একটু এগিয়ে দেয়া যাতে তোমরা বুঝতে পারো, উপলদ্ধি করতে পারো যে, আসল কাজটি কি মাটি, পানি বা লোহা-তামার, না মেশিনের; আর নাকি সেগুলোর মাধ্যমে তৈরি বাষ্পের? বরং কাজটি তারই যিনি আগুন, পানি ও বায়ুকে সৃষ্টি করেছেন। যার ফলে এই বিদ্যুৎ, এই বাষ্প তোমরা পেয়েছ পাচ্ছো। এ ব্যাখ্যার দ্বারা প্রতীয়মান হলো যে, সে সব লোকই শুধু বুদ্ধিমান বলে আখ্যায়িত হওয়ার যোগ্য, যারা আল্লাহকে চিনবেন এবং সর্বাবস্থায় সর্বক্ষণ তাকে স্মরণ করবেন।
একদা নবী কারীম সা. সাহাবাদের চুপচাপ বসে থাকা একটি দলের নিকট গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছ? তারা বললেন, আল্লাহর সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কে চিন্তা করছি। রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, হ্যাঁ আল্লাহর সৃষ্টি সম্বন্ধে চিন্তা করো; কিন্তু তার সত্তা সম্বন্ধে চিন্তা করোনা। যেহেতু তিনি ধারণার অতীত।

মানব সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে অবগতি লাভের জন্যে
আল্লাহ তা’আলা মানুষকে সবচেয়ে সুন্দর আকৃতি ও সর্বাধিক জ্ঞান দিয়ে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। আর এটা আল্লাহ তা’আলা এজন্যই করেছেন, যাতে তার দয়া ও কুদরতের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। মানুষই আল্লাহ তা’আলার সুন্দরতম সৃষ্টি। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা বলেন ‘আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম অবয়বে।’(সূরা তীন-৪)
মানুষকে সৃষ্টি করে আল্লাহ তা’আলা বিভিন্ন ধরণের ভাষা ও বর্ণ প্রদান করেছেন; যা সত্যিই বিস্ময়কর। আর চিন্তাশীলদের জন্য এখানেও রয়েছে চিন্তার অনেক উপাদান। কালামে পাকে ঘোষিত হয়েছে ‘তাঁর আরও এক নিদর্শন হচ্ছে নভোম-ল ও ভু-ম-লের সৃজন এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র। নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে।’

সৃষ্টি থেকে কল্যাণ লাভের লক্ষ্যে
প্রাণী, উদ্ভিদ, জড় তথা পৃথিবীর সকল বস্তু আল্লাহ তা’আলা মানব জাতির কল্যাণের জন্যে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আসমান-যমীন ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী স্থানে যা আছে তার কিছুই আমি অনর্থক সৃষ্টি করিনি। (সূরা আন‘আম)
আল্লাহর এ সৃষ্টিকে কীভাবে ঘর্ষণ করলে, কীভাবে মিশ্রণ করলে, কীভাবে খ- খ- করলে, কীভাবে আগুনে পোড়ালে, কোন বস্তু আবিস্কার করা যায়। কোথায় খনন করলে কী উদ্ভাবন করা যায়, এ নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে সৃষ্টিকে স্বীয় কল্যাণে ব্যবহার করা।

পৃথিবীর গতি নির্ধারণের জন্য গবেষণা
পৃথিবীতে আহ্নিক গতি ও বার্ষিক গতি আছে। এ গতি না থাকলে জীবনের অস্তিত্ব থাকতো না। এ আহ্নিক গতির কারণে দিন রাতের আবর্তন, বায়ু প্রবাহ, সমুদ্রস্রােত, সময় গণনা, জোয়ার-ভাটা হয়। অন্য দিকে বার্ষিক গতির জন্যে ঋতুর পরিবর্তন, দিন-রাতের হ্রাস-বৃদ্ধি ও প্রাণীয় উদ্ভিদের জীবন বৈচিত্রের পরিবর্তন হয়। আর এ সকল বিষয়াবলী সম্পর্কে জানতে আমাদেরকে কুরআন এবং আনুসাঙ্গিক বিষয়াবলীর ওপর গবেষণা করতে হবে। এ ব্যাপারে কুরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘চন্দ্রের জন্য আমি বিভিন্ন মনযিল নির্ধারণ করেছি। অবশেষে পুরাতন খর্জুর শাখার অনুরূপ হয়ে যায়। সূর্য নাগাল পেতে পারে না চন্দ্রের এবং রাত্রি অগ্রে চলে না দিনের প্রত্যেকেই আপন আপন কক্ষপথে সন্তরণ করে।” (সূরা ইয়াসিন ৩৯-৪০)
‘তিনি রাত্রিকে দিবস দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এবং দিবসকে রাত্রি দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এবং তিনি সূর্য ও চন্দ্রকে কাজে নিযুক্ত করেছেন। প্রত্যেকেই বিচরণ করে নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত।”(সূরা যুমার-৫)

প্রকৃতি জগত সম্পর্কে জ্ঞান লাভে গবেষণা
আল্লাহ তা’আলা প্রকৃতিকে বিভিন্ন ধরণের সুন্দর সুন্দর উপকরণ দ্বারা সজ্জিত করেছেন। আর তা গবেষণার মাধ্যমে বের করা সম্ভব। আল্লাহ বলেন “মানুষ তার খাদ্যের প্রতি লক্ষ্য করুক, আমি আশ্চর্য উপায়ে পানি বর্ষণ করেছি, এরপর আমি ভূমিকে বিদীর্ণ করেছি, অতঃপর তাতে উৎপন্ন করেছি শস্য, আঙ্গুর, শাক-সবজি, যাইতুন, খর্জুর, ঘন উদ্যান, ফল এবং ঘাস, তোমাদের ও তোমাদের চতুষ্পদ জন্তুদের উপকারার্থে।” (সূরা আবাসা ২৪-৩২)
আল্লাহ তা’আলা আরও বলেন, “তাদের জন্য একটি নিদর্শন মৃত পৃথিবী আমি একে সঞ্জীবিত করি এবং তা থেকে উৎপন্ন করি শস্য, তারা তা থেকে ভক্ষণ করে”। (সূরা ইয়াসিন-৩৩)
“আল্লাহই বায়ু প্রেরণ করেন, অতঃপর সে বায়ু মেঘমালা সঞ্চারিত করে অতঃপর আমি তা মৃত ভূ-খ-ের ওপর পরিচালিত করি। অতঃপর তা দ্বারা সে ভূ-খ-কে তার মৃত্যুর পর সঞ্জীবিত করে দেই।” (সূরা ফাতির-৯)

সত্যজ্ঞান লাভের জন্য গবেষণা
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে ‘আর যখন তাদের কাছে পৌঁছে কোন সংবাদ শাস্তি-সংক্রান্ত কিংবা ভয়ের, তখন তারা সেগুলোকে রটিয়ে দেয়। আর যদি সেগুলো পৌঁছে দিত রাসূল পর্যন্ত কিংবা তাদের শাসকদের পর্যন্ত, তখন অনুসন্ধান করে দেখা যেত সে সব বিষয়, যাতে রয়েছে অনুসন্ধান করার মত’। (সূরা নিসা-৮৩)

আইন গবেষণা করা
ইসলামী আইন এবং প্রচলিত আইন, আল্লাহর আইন এবং মানবরচিত আইনকে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা। অর্থাৎ আল্লাহর আইন কিভাবে মানবজাতির সমূহ কল্যাণ ও শান্তি আনতে পারে। আর মানবরচিত আইন দ্বারা কিভাবে অশান্তি ও অরাজকতা সৃষ্টি হয়। আল্লাহর আইন কিভাবে সংকট ও সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম, আর মানবরচিত আইন কিভাবে সংকট তৈরি করে এগুলোকে চিন্তা-গবেষণা করে বের করা। ইসলামী আইনের বৈশিষ্ট্যগুলোকে খুঁজে খুঁজে বের করে এর শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরার জন্য গবেষণা করা। বর্তমান দুনিয়াতে অপরাধের মাত্রা দৈনন্দিন বেড়েই চলছে। এই অপরাধ দমনের জন্য ইসলামী আইনের পন্থা ও পদ্ধতি নিয়ে চিন্তা গবেষণা করে তা প্রকাশ করা।

ফিকাহ গবেষণা
মানবজাতিকে এই পৃথিবিতে সীরাতে মুস্তাকীমের পথে পরিচালিত করার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে যেসব বিধান দান করা হয়েছে, সেসব বিধানকে সুবিন্যস্ত করার জন্য গবেষণা করা। কুরআন, হাদীস, ইজমা, কিয়াসকে মৌলিক উৎস সাব্যস্ত করে মুজতাহিদ ইমামগণ ইসলামের সূচনা থেকেই সেই কর্ম চালিয়ে আসছেন। বর্তমান পৃথিবীতে বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষ ও পাশ্চাত্য অপশক্তির বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের কারণে নতুন নতুন সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে এবং মানুষের জিজ্ঞাসাও বাড়ছে। এ কারণে ইমামদের প্রণীত মূলনীতির আলোকে আধুনিক বিশ্বে আবর্তিত জটিলতা সমাধানের জন্য ইসলামী ফিকাহের গবেষণা অব্যাহত রাখা অপরিহার্য।

তাফসীর গবেষণা
কিয়ামত অবধি আগত মানবজাতির যাবতীয় সমস্যার সমাধান আল্লাহ তা’আলা কুরআনে পাকের মাঝে রেখে দিয়েছেন। কুরআনে হাকিম থেকে সে সমস্যার সমাধান কল্পে গবেষণা করা সময়ের দাবি। তবে তাফসীর গবেষণার ক্ষেত্রে সাহাবী, তাবেয়ী ও পূর্বসূরীদের রচিত মূলনীতি অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরী।

হাদীস গবেষণা
পূর্বসূরীদের রচিত মূলনীতি অবলম্বন করে মুসলিম উম্মাহর যাবতীয় প্রয়োজন মেটানোর জন্য হাদীস থেকে উৎসারিত জ্ঞানকে কাজে লাগানো। হাদীস নিয়ে যারা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে তাদের দাঁতভাঙা জবাব দেয়ার জন্য হাদীস গবেষণা অব্যাহত রাখা।

সীরাত গবেষণা
রাসূলে কারীম সা. মানবজাতির সামগ্রিক জীবনের আদর্শ মডেল। মানব জীবনের সকল দিক ও ক্ষেত্রে রাসূল সা. এর সীরাতকে সামনে নিয়ে তার প্রয়োগ ঘটানোর জন্য কার্যকরী প্রদক্ষেপ নিতে গবেষণা করা।

অর্থনীতি গবেষণা
পুঁজিবাদি অর্থনীতির কারণে সারাবিশ্বে অবৈধ পন্থায় যেভাবে সম্পদ আহরণ চলছে, এতে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দিন দিন বাড়ছে। এমনকি পূঁজিবাদি অর্থনীতির কারণে মানুষ ¯্রষ্টা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নাফরমানিতে নিমজ্জিত হচ্ছে। এজন্য ইসলামী অর্থনীতির গবেষণা সময়ের দাবি। যে পথ দেখিয়েছেন আমাদেরকে বিশ্ববিখ্যাত আলেমে দীন আল্লামা তাকী উসমানী দা.বা.।

রাজনীতি গবেষণা
আমাদের দেশে ইসলামী রাজনীতি সম্পর্কে দুটি ধারা চলছে। একটি ধারা মতে ইসলাম কেবলই নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত তথা ইবাদতসর্বস্ব একটি ধর্মাদর্শের নাম মাত্র। এতে রাজনীতির কোন স্থান নেই। অপর ধারাটির মতে ইসলাম রাজনীতিসর্বস্ব একটি ধর্মাদর্শের নাম। হুকুমতে এলাহী প্রতিষ্ঠাই এর মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। ইবাদত ইত্যাদি এর সহায়ক মাত্র, মূল উদ্দেশ্য নয়। ‘ইসলামে রাজনীতির অবস্থান’ সম্পর্কিত এ ধারণা দুটিই কুরআন সুন্নাহ তথা দীন ইসলামের মূল চিন্তা-চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিপন্থি। এসব বিষয়ে গবেষণার সঠিক তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা।

ইসলামের পূর্ণাঙ্গতা সম্পর্কে গবেষণা করা
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ দীন; পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থার নাম। আকীদা বিশ্বাস থেকে আরম্ভ করে ইবাদত, লেনদেন, ব্যক্তি জীবনের সামগ্রিক বিষয়, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, অর্থনীতি, রাজনীতি, দাওয়াতে তাবলীগ, জিহাদ ও তাসাউফ সব কিছুই ইসলামের মধ্যে বিদ্যমান। এসব বিষয়ে গবেষণাধর্মী আর্টিকেল তৈরি করা। গবেষণা হোক কল্যাণের, মানবতার মুক্তির জন্য। গবেষণা হোক নিজেকে জানার, মহান রবের পরিচয় লাভের জন্য।

পরকালে জবাবদিহিতা থেকে মুক্তির জন্য গবেষণা
আল্লাহ পাক মানুষকে কান, চোখ, অন্তর দান করেছেন সব কিছুকে কাজে লাগিয়ে চিন্তা-গবেষণা করার জন্য। কিন্তু যদি তা না করা হয় তাহলে এর জন্য পরকালে জবাবদিহিতা করতে হবে। তাই আল্লাহ ইরশাদ করেন ‘নিশ্চই কান, চক্ষু ও অন্তঃকরণ এদের প্রত্যেকটিই জিজ্ঞাসিত হবে’। (সূরা বনী ইসরাঈল-৩৬)
নিজেদেরকে জবাবদিহিতা থেকে মুক্ত রাখার জন্য গবেষণা করা অপরিহার্য একটি বিষয়।

গবেষণা কর্মে মুসলমানদের অবদান
মুসলিম সভ্যতা বিশ্বের উন্নতির সর্ব বিভাগে এমন সৃজনশীলতা ও আবিস্কারের জনক হয়ে আছে যা ঐতিহাসিক সত্য। রসায়ণ বিভাগে দৃষ্টি দিলেই দেখা যায়, রসায়ন বা কেমিস্ট্রির জন্মদাতা মুসলমান। রসায়ন ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য হলো ‘জাবির’। বন্দুক, বারুদ, কামান, প্রস্তর নিক্ষেপণ আবিস্কারও মুসলমানদের অবদান। “আল ফুরসিয়া ওয়াল মানাসিবুল হারাবিয়া”। এটি যুদ্ধের উন্নত কৌশল ও বারুদ বা অগ্নেয়াস্ত্র সম্পর্কে বিখ্যাত আরবী গ্রন্থ। যা একজন মুসলমানই লিখেছেন। ভূগোলেও মুসলমানদের অবদান বিস্ময়কর। ৬৯ জন ভুগোলবিদ ‘সূরাতুল আরদ’ নামে পৃথিবীর প্রথম মানচিত্র এঁকেছিলেন। ফরগানী, বাত্তানি ও আল খারজেমী প্রমূখ এর ভৌগলিক অবদান স্বর্ণ মন্ডিত বলা যায়। কম্পাস যন্ত্রের আবিস্কারকও ‘ইবনে আহমদ’ নামের একজন মুসলমান। ‘ইবনে আবদুল মাজদ’ নামের মুসলিম বিজ্ঞানী পানির গভীরতা ও সমুদ্রের স্রােত মাপক যন্ত্রের আবিস্কার করেছেন। বিজ্ঞান বিষয়ে মুসলিম বিজ্ঞানীদের লিখিত যেসব মূল্যবান প্রাচীন গ্রন্থ পাওয়া যায় আজও তা বিজ্ঞান জগতে পুঁজি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ‘আল কিন্দি’ নামের একজন মুসলিম বিজ্ঞানী ২৭৫ টি গবেষণামূলক পুস্তক একাই রচনা করেছেন। ৮৬০ সালে-হাসান, আহমাদ ও মুহাম্মদ সম্মিলিতভাবে একশত রকমের যন্ত্র তৈরির নিয়ম ও ব্যবহার প্রণালী এবং তার প্রয়োজন নিয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন। পশু-পাখি, লতা-পাতা নিয়ে গবেষনা করার পথ সুগম করেছন ‘আল আসমাঈ’। তিনি এটা করেছেন “চার্লস ডারউইন” এর বিবর্তনবাদেরও অনেক আগে। আল আসমাঈ এর জন্ম ৭৪০ আর মৃত্যু ৮২৮ সাল। তিনি গবেষণাধর্মী যেসব গ্রন্থ রচণা করে গেছেন তা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। পৃথিবীতে সর্বপ্রথম চিনি তৈরি করেন মুসলমানরাই। ইয়াকুব ইবনে আবদুল্লাহ লিখেছেন, ‘মু’জাম আল উবাদা’ যা ভূ-তত্ত্ব সম্পর্কীয় বিখ্যাত গ্রন্থ। ৭০২ সালে তুলো থেকে তুলোট কাগজ প্রথম সৃষ্টি করেছেন ইউসুফ ইবনে উমার। জাবির ইবনে হাইয়ান ইস্পাত তৈরি, ধাতুর শোধন, তরল বাষ্পীকরণ, কাপড় ও চামড়া রং করা, ওয়াটার প্রুফ বস্তু তৈরি, লোহার মরিচা প্রতিরোধক বার্ণিশ, চুলের কলফ ও লেখার পাকা কালি সৃষ্টিতে অমর হয়ে আছেন।
ম্যাঙ্গানিজ ডাই অক্সাইড থেকে কাঁচ তৈরির প্রথম চিন্তাবিদ মুসলিম বিজ্ঞানী ‘আর-রাজী’। যাকে ইংরেজী অক্ষরে লেখে (জধুবং) ইমাম রাজী এক দিকে ছিলেন ধর্মীয় পন্ডিত, অপর দিকে ছিলেন গণিতজ্ঞ ও চিকিৎসা বিশারদ। সোহাগা, লবন, পারদ, গন্ধক, আর্সেনিক ও সালমিয়াক নিয়ে তাঁর লেখা ও গবেষণা উল্লেখযোগ্য। ইউরোপেরও আগে পৃথিবীতে সর্ব প্রথম জল জমিয়ে বরফ তৈরী করা এই ইমাম রাজীর-ই অক্ষয় কীর্তি। পৃথিবীতে গনিত বিশারদদের মাঝে ওমর খৈয়ামের স্থান উজ্জল রতেœর মত। আকাশ জগত পর্যবেক্ষণ করার জন্য সর্বপ্রথম মানমন্দির আবিস্কার করেন হাজ্জাজ ইবনে মাসার এবং হোসাইন ইবনে ইসহাক। তাঁরা প্রথম ৭২৮ সালে মানমন্দির তৈরি করেন। দ্বিতীয় মানমন্দির তৈরি হয় ৮৩০ সালে জন্দেশপুরে। বাগদাদে হয় তৃতীয় মানমন্দির তৈরি। আর ‘আল মামুন’ তৈরি করেন দামেস্ক শহরে চতুর্থ মানমন্দির। মুসলিম ঐতিহাসিকদের বাদ দিয়ে ইতিহাস বিষয়ে কল্পনা করা যায় না। ইংরেজরা তো বেশিরভাগ অনুবাদ কাজই করেছেন। ইতিহাসের মূলে রয়েছেন মুসলিম ঐতিহাসিকগণ। যেমন আল বিরুনী, ইবনে বতুতা, আলী বিন হামীদ, বায়হাকী, উৎবী, কাজী মিনহাজুদ্দীন সিরাজ, মুহি উদ্দীন, মুহাম্মদ ঘোরী, জিয়াউদ্দীন বারণী, আমীর খসরু, শামসী সিরাজ, বাবর, ইয়াহইয়া বিন আহমদ, জওহর, আব্বাস শেরওয়ানী, আবুল ফজল, বাদউনী, ফিরিশতা, কাফি খাঁ, মীর গোলাম হোসাইন, হোসাইন সালেমী ও সঈদ আলী প্রমুখ মনীষীবৃন্দ।
আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, তারীখে সিন্ধু, চাচানামা, কিতাবুল ইয়ামিনী, তারিখে মাসঊদী, তারিখে ফিরোজশাহী, তারিখুল হিন্দ, তা’জুম্মাসির, তবকাতে নাসীরী, খাজেনুল ফতওয়া, ফতওয়া উস-সালাতিন, কিতাবুর-রাহলাব, তারিখে মোবারকশাহী, তারিখে সানাতিনে আফগান, তারিখে শেরশাহী, মাখজানে আফগান, আকবরনামা, আইনী আকবরী, মুনতাখাবুত তাওয়ারিখ, মুনতাখাবুল লুবাব, ফতহুল বুলদান, আনসাবুল আশরাক ওয়া আখবারুহা, উয়ূনুল আখইয়ার, তারিখে ইয়াকুব, তারিখে তাবারী, আখবারুজ জামান, মারওয়াজুজ জাহাব, তামবীনুল আশরাফ, কামিল, উসদুল গাবাহ, আখবারুল আব্বাস, কিতাবুল ফিদ-আ, মু‘জামুল বুলদান প্রভৃতি ইতিহাস গ্রন্থগুলোর নাম ততদিন থাকবে যত দিন পৃথিবী থাকবে।
মুসলমানরা শুধু দেশ জয়ই করেননি বরং যখন যে দেশ মুসলমানদের অধীনে এসেছে সেখানে মুসলমান পন্ডিতদের বসিয়েছেন গবেষণা কর্মে নিবেদিত থাকতে। এই গবেষকরা নতুন ও পুরাতন পুথি-পত্র ও পুস্তক সম্ভারে ভর্তি করেছেন বহু গ্রন্থাগার। গ্রন্থ বা পুস্তক সংগ্রহ মুসলমানদের জাতীয় স্বভাবে পরিণত হয়েছিলো। হযরত আলী রা. প্রশাসন, বিদ্রোহ দমন প্রভৃতি প্রয়োজনে কর্মব্যস্ত থাকলেও তার চেষ্টায় কুফার জামে মসজিদ জ্ঞান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিলো। দেশ-বিদেশের ছাত্ররা সেখানে জ্ঞান অর্জনের জন্য ছুটে যেতেন। হযরত আলী স্বয়ং ছিলন সেখানকার অধ্যক্ষ। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস যখন পরলোক গমন করেন তখন এক বড় উট বোঝাই বই রেখে গিয়েছিলেন। অথচ তখনকার যুগে এ যুগের ন্যায় বই সংগ্রহ সহজলভ্য ছিলো না। কারণ সবই ছিলো হাতের লেখা। ‘আমর ইবনুল আলা’ যিনি এত অধীক পরিমাণে বিশুদ্ধ ও মস্তিষ্ক নিসৃত বাণী লিখে সংগ্রহ করেছিলেন যা কিনা একটি ঘরের ছাদ পর্যন্ত ঠেকে গিয়েছিলো।
উমাইয়্যা খেলাফতকালে ব্যাকরণ লেখা, ইতিহাস লেখা এবং স্থাপত্য বিদ্যার অগ্রগতি শুরু হয়। মি. হিট্টির মতে উমাইয়্যা ‘আমল হচ্ছে উন্নতির যুগে ডিমে তাপ দেয়ার যুগ’। খলীফা মামুনের বিশাল গ্রন্থাগার ছিলো। যার লাইব্রেরীয়ান ছিলেন, মুহাম্মদ ইবনে মূসা আল খারেজেমি। তিনিই পৃথিবীতে বীজ গণীতের জন্মদাতা। তৎকালীন বিশ্বের তিনিই ছিলেন শ্রেষ্ঠতম গণিতজ্ঞ। তিনিই গণিতশাস্ত্রে [০] শূন্যের জন্মদাতা। তিনি বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ ছিলেন। খলীফার অনুরোধে তিনি আকাশের একটি মানচিত্র অঙ্কন করেন এবং একটি পঞ্জিকার জন্ম দেন। এজন্য তাকে উপাদি দেয়া হয়েছিলো ‘সাহিব আলজিজ’। ঐতিহাসিক আল মুকাদ্দিস বলেন-আদদউল্লাহ সিরাজ শহরে এমন একটি লাইব্রেরী তৈরি করেছিলেন যার অট্টালিকা এত সু-বিশাল ছিলো সেকালে তার দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত ছিলো না। সবুরের একাডেমি সংলগ্ন একটি গ্রন্থাগার ছিলো, যার বই সংখ্যা ১০৪০০ সবগুলোই হাতে লেখা। ৯৭০ খ্রিস্টাব্দে মিশরে আল আজহার মসজিদ নির্মিত হয়। আল আজিজ মসজিদের সঙ্গে একটি একাডেমি তৈরি করেন যা বর্তমানে আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত। তৎকালে সেই গ্রন্থাগারের গ্রন্থ সংখ্যা ছিলো ১৮০০০। হিজরীর দশম শতাব্দীতে দামেষ্কে বহু সংখ্যক মসজিদ ও খানকা ছিলো, সেগুলোতে ছাত্ররা হাদীস, তাফসীর, কেরাত ও হেফজ ইত্যাদি অধ্যয়ন করতো। এগুলো ছাড়াও শুধু কুুরআন গবেষণার জন্য মাদরাসা ছিলো ৭ টি, হাদীসের জন্য ১৬ টি, কুরআন ও হাদীসের একত্রে গবেষণার জন্য ৩ টি। শাফেয়ী ফেকাহ গবেষণার জন্য ৬৩ টি, হানাফী ফেকাহর জন্য ৫২ টি, মালেকী ফেকাহর জন্য ৪ টি, এবং হাম্বলী ফেকাহ গবেষণার জন্য ১১ টি মাদরাসা ছিলো। ১০০৪ সালে আল হাকিম ‘দারুল ইলম’-এর উদ্বেধন করেন। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে কুরআন-হাদীস, ভাষাতত্ত্ব, জ্যোতির্বিদ্যা, ব্যাকরণ ও চিকিৎসা শাস্ত্র প্রভৃতি শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা ছিলো। প্রতিমাসে বেশ কয়েকবার বিতর্ক সভা অনুষ্ঠিত হত। অষ্টম শতকে খলিফা হারুনের সময় বাগদাদ, সিরিয়ার দামেস্কে, ত্রিপলি ও হামায় কাগজের কল স্থাপিত হয়। অতএব এ কথা অত্যন্ত সত্য, মুদ্রণ যন্ত্রের আবিস্কারের আগে কাগজকল সাহিত্য তৎপরতায় নতুন যুগের দারোদ্ঘাটন করে।

অতএব বিশ্বের বুদ্ধিজীবীরা এই অবদান অস্বীকার করতে পারেন না। তবে দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, মুসলমান যেন হতভাগ্য জাতি আর তাদের ইতিহাস শুধু অত্যাচার আর বিলাসিতার ফানুস।