বাঙ্গালী সংস্কৃতি ও ইসলাম; আ হ ম আলাউদ্দিন

0
20

সংস্কৃতির সংজ্ঞা :
সংস্কৃতি ইংরেজি Culture শব্দের আভিধানিক অর্থ চিৎপকর্ষ বা মানবীয় বৈশিষ্ট্যের উৎকর্ষ সাধন। ইংরেজি Culture শব্দটি এসেছে জার্মান শব্দ Cultura থেকে, যার অর্থ কর্ষণ (Cultivation)। কথাটির প্রথম পবর্তন করেছিলেন বেকন {সমাজ সংস্কৃতি সাহিত্য- অধ্যাপক ড. হাসান জামান, জ্ঞান বিতরনী-৩৮/২-ক, বাংলা বাজার, একুশে বইমেলা ২০১২ পৃষ্ঠা-৩১}

ইংরেজি এর প্রতিশব্দ হিসেবে সংস্কৃতি শব্দটি ১৯২২ সালে বাংলায় প্রথম ব্যাবহার করা শুর” হয় (মুহাম্মাদ হাবিবুর রহমানের একুশে ফেব্র”য়ারি সকল ভাষার কথা কয়। সময প্রকাশন, পৃষ্ঠা-২৬) সংস্কৃতি আরবি প্রতিশব্দ আস-সাকাফা এর সাধারণ অর্থ মার্জিত র”চি ও উত্তম স্বভাব। ভদ্রজনিত আচার-আচরণের অর্থেও শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
কোন স্থানের মানুষের আচার ব্যবহার জীবিকার উপর সঙ্গীত, নৃত্য, সাহিত্য, নাট্যশালা, সামাজিক সম্পর্ক, ধর্মীয় রীতি-নীতি শিক্ষা-দীক্ষা ইত্যাদির মাধ্যমে যে অভিব্যক্তি প্রকাশ করা হয় তাই সংস্কৃতি। (উইকিপিডিয়া)
নৃবিজ্ঞানী টেইলরের মতে, সমাজের সদস্য হিসেবে অর্জিত নানা আচরণ, যোগ্যতা এবং জ্ঞান, বিশ্বাস, শিল্পকলা, নীতি, আদর্শ, আইন, প্রথা ইত্যাদির এক যৌগিক সমন্বয় হল সংস্কৃতি। (টেইলর-১৯৭৪, ১)
স্যামুয়েল পুফেনডর্ফের সংজ্ঞা অনুযায়ী- সংস্কৃতি বলতে সেই সকল পন্থাকে বোঝায় যার মধ্য দিয়ে মানব জাতি তাদের প্রকৃত বর্বরতাকে কাটিয়ে ওঠে এবং ছলনাময় কৌশলের মাধ্যমে পূর্ণরূপে মানুষে পরিণত হয়। {Velkley, Richard (2002) The university of chicago press. p-11-30}
মি. ফিলিপ বাগাভী চমৎকার সংজ্ঞা প্রদান করেন। তিনি বলেন সংস্কৃতি বলতে যেমন চিন্তা ও অনুভূতির সকল দিক বুঝায়। তেমনি তা কর্মনীতি, কর্মপদ্ধতি এবং চরিত্রের সকল দিককেও পরিব্যাপ্ত করে।
ম্যালিনোস্কির মতে, সংস্কৃতি হলো মানব সৃষ্ট এমন সব কৌশল বা উপায় যার মাধ্যমে সে তার উদ্দেশ্য চরিতার্থ করে।{স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস, এ কে এম শওকত আলী খান-২০১৪, পৃষ্ঠা-৪৭}
সমাজ বিজ্ঞানী ম্যাকাইভার বলেন,
Culture is what we are or have.. আমরা অথবা আমাদের যা কিছু আছে তাই আমাদের সংস্কৃতি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর এডভান্সড রিসার্চ অন ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাকুইজিশন-সংস্কৃতির সংজ্ঞায় বলেছেন, সামাজিক আচরণ এবং মিথষ্ক্রিয়ার ধরণ জ্ঞানীর গঠন এবং সামাজিককিরণের মধ্য দিয়ে যে বুঝ অর্জিত হয় সেটাই সংস্কৃতি {সংস্কৃতি আসলে কী? কালের কন্ঠ অনলাইন, ২০ জুলাই, ২০১৭}
লন্ডনের বার্নেট এ্যন্ড সাউথগেট কলেজের নৃবিজ্ঞানী ক্রিস্টিনা-ডে-রসি লাইভ সায়েন্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, সংস্কৃতির আওতায় রয়েছে ধর্ম, খাদ্য, পোষাক, পোষাক পরার ধরণ, ভাষা, বিয়ে, সঙ্গীত, আমরা যা কিছু ন্যয় অন্যায় বলে ভাবি, আমরা যেভাবে টেবিলে বসি, যেভাবে অতিথিকে অভিবাদন জানাই, ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে যেভাবে আচরণ করি এবং দৈনন্দিন জীবন যাত্রার আরো অন্তত কয়েক লাখ বিষয়।
এসকল সংজ্ঞা বিশ্লেষণে বলা যায়- সংস্কৃতি হলো মানুষের বিশ্বাস, আচার- আচরণ ও জীবনধারা।

সংস্কৃতির স্বরূপ
সংস্কৃতির যেমন একটি ব্যক্তিক রূপ আছে, তেমনি এর একটি সমষ্টিক রূপ বিদ্যমান। সামষ্টিক রূপের নির্মিতি ঘটে প্রধানত পরিবারকে কেন্দ্র করে। তারপর সেটা ক্রমান্বয়ে এবটি বিশেষ সমাজ, দেশ, জাতি, আঞ্চলিক জনগোষ্ঠি রাষ্ট্র ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের রূপ ও চরিত্র বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। এভাবে সংস্কৃতির যেমন ব্যক্তিক পরিচয় আছে তেমনি পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রিক, আঞ্চলিক ও বিশ্বজনীন চিরন্তন রূপ ও ক্রমান্বয়ে গড়ে উঠে। {মুহাম্মাদ মতিউর রহমান, সংস্কৃতি নিয়ে কথা, দৈনিক ইনকিলাব, ৪ জুন ২০১৬}

সংস্কৃতি পরিবর্তনশীল
সংস্কৃতি সতত পরিবর্তনশীল। “সংস্কৃতির সব দিক বা উপাদান স্থায়ী বা স্থিতিশীল নয়। প্রতিনিয়তই পরিবর্তিত হয় সংস্কৃতির ধারা। পুরনো প্রথা বা রীতির আংশিক কিংবা সম্পূর্ণ পরিবর্তন সংস্কৃতিতে অতি সাধারণ বিষয় {হায়াৎ মাহমুদ, বাঙালি সংস্কৃতির ধারা, আমাদের সময়, ০১ মার্চ ২০১৬} কালের প্রবাহে বাংলা সংস্কৃতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এ পরিবর্তন সতত চলমান। পরিবর্তন, পরিবর্ধন, ও আত্তীকরণ একটি আধুনিক সংস্কৃতির প্রধানতম বৈশিষ্ট্য। এ বৈশিষ্ট্যটি আমাদের স্বীকার করতে হবে। সংস্কৃতির প্রবাহের মধ্য দিয়েই সংস্কৃতির ধারা তৈরী হয়।

সংস্কৃতায়ন বা সংস্কৃতির পরিবর্তন প্রক্রিয়া
এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কোন সমাজ বা সংস্কৃতি অন্য সমাজের মধ্যে পরিবর্তন সূচিত করে।
সাধারণত উন্নত সংস্কৃতি কোন দেশিয় সংস্কৃতিকে তিনভাবে প্রভাবিত করে।
১. উন্নত সংস্কৃতির কিছু উপাদান বজায় রেখে।
২. উন্নত সংস্কৃতির কিছু উপাদান বর্জন করে।
৩. দেশীয় সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবার জন্য কিছু সংশোধনের মাধ্যমে গ্রহণ করে।
{উইকিপিডিয়া, সাংস্কৃতায়ন, ৪ মার্চ ২০১৭}

সংস্কৃতির বাস্তব অস্তিত্ব
সংস্কৃতির পূর্ণ চিত্রটি উদঘাটন করার জন্য মন ঐকান্তিক বাসনা বোধ করে কিন্তু তার বাস্তব অস্তিত্ব প্রমানের জন্য বিশেষজ্ঞরা বিভ্রান্তিতে পড়েছেন। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রেই সংস্কৃতির বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতাকে নাম দেয়া হয়েছে সংস্কৃতি। আসলে এগুলো সংস্কৃতি নয়; সংস্কৃতির বাহন মাত্র।{ইসলামী সংস্কৃতি, উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ, ড. মুহাম্মাদ জামাল উদ্দিন, বাঙলা}

সংস্কৃতির উপাদান
সংস্কৃতির উপাদানকে আমরা দুই ভাগে ভাগ করতে পারি।
১. বস্তুগত সংস্কৃতি
২. অবস্তুগত সংস্কৃতি
{শাহিদুল ইসলাম, মানুষ ও তার সংস্কৃতি, দৈনিক জনতা, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৪}

বস্তুগত সংস্কৃতি
বস্তুগত সংস্কৃতি বলতে বোঝায়, এই নিষ্ঠুর ও কঠিন পৃথিবীতে অর্থাৎ প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে সংগ্রামে বেঁচে থাকতে বা প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করতে মানুষ যে সব বস্তুগত হাতিয়ার তৈরী করছে, যা মানুষের চলার পথে প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করে।
{অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন, অপসংস্কৃতির আগ্রাসনে বাংলাদেশ, বঙ্গ নিউজ ডটকম, ২৭ মে ২০১৩}

নৃবিজ্ঞানী এ-লেইন-ফক্স-পিট-রিভাস সর্বপ্রথম বস্তুগত সংস্কৃতি প্রত্যয়টি ব্যবহার করেন। ১৮৭৫ সালে ‘সাংস্কৃতিক বিবর্তন’ এর উপর লেখায় তিনি বস্তুগত সংস্কৃতিকে মনের নির্দিষ্ট ধারণার প্রতীকী ধরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
{বাংলাপিডিয়া, সংস্কৃতি বস্তুগত}

বস্তুগত সভ্যতার প্রগতিকে চিত্রিত করতে প্রস্তর, তা¤্র, ব্রোঞ্জ ও লৌহ এই চার যুগে ভাগ করা হয়। প্রস্তর যুগকে ভাগ করা হয় প্যালিওলিথিক (প্রাচীন প্রস্তর যুগ) মেসোলিথিক (মধ্য প্রস্তর যুগ) নিওলিথিক (নব্য প্রস্তর যুগ) এই তিন স্তর কালে। প্রস্তর এবং তা¤্র যুগের ক্রান্তিকালীন পর্যায় ক্যালকোলিথিক সংস্কৃতি নামে পরিচিত। {প্রাগুক্ত}
সংস্কৃতির যে উপাদানটি বস্তুর রূপ লাভ করে। বস্তুগত সংস্কৃতির উপাদানের মধ্যে রয়েছে খাদ্যদ্রব্য ও তার উপাদান, পোশাক-আশাক, আবাস ও গৃহস্থলির নানা উপকরণ, পথ-ঘাট, যানবাহন, চিকিৎসাব্যবস্থার উপকরণ ইত্যাদি। অর্থাৎ মানুষের জীবনধারণের সকল সহায়ক উপকরণই বস্তুগত সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে। এই উপকরণগুলো মানুষ তার প্রয়োজনে এবং অবস্তুগত সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তৈরী করেছে।

অবস্তুগত সংস্কৃতি
কোন সম্প্রদায়ের মূল্যবোধ, নিয়ম-নীতি, মনোভাব জীবনযাপনের ধরণ ঐ সম্প্রদায়ের অবস্তুগত সংস্কৃতি। সংস্কৃতির যে উপাদানটি উপলব্দি বা অনুধাবন করা যায় তাকে অবস্তুগত সংস্কৃতি বলে।
{শিক্ষা সাগর পাতা, জনকন্ঠ ২৬ নভেম্বর ২০১৭}

অবস্তুগত সংস্কৃতিই মানুষকে মানবিক ও মনুষত্ব সম্পন্ন করে তোলে। স্যামুয়েল পুফেনডর্ফের সংস্কৃতির সংজ্ঞায় এ কথাই ফোটে উঠেছে।
অনেক মনীষীর মতে অবস্তুগত সংস্কৃতিই সংস্কৃতির মূল উপাদান। দার্শনিক কান্ট-এর মতে সংস্কৃতির সাথে নৈতিক মূল্যবোধ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। {সমাজ সংস্কৃতি সাহিত্য, ড. হাসান জামান -৩২ পৃষ্ঠা}

বেকনের মতে ধহ ধঃঃৎরনঁঃব ড়ভ ঃযব ংঢ়রৎরঃ ড়ভ ঃযব সধহ. অর্থাৎ সংস্কৃতি হল মানুষের নিবিড় সত্তার সারভাগ {প্রাগুক্ত-৩১}
আরো কঠোর কথা বলেছেন স্পংলার। তার মতে, মানুষের সভ্যতার ব্যবহারিক দিকের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতির অবলুপ্তি শুর” হয় {প্রাগুক্ত-৩২}
অবস্তুগত সংস্কৃতির মধ্যে রয়েছে মানুষের র”চিবোধ স্বভাব-চরিত্র, আচরণ, কথা বলার বিষয় ও বঙ্গি, চলার ভঙ্গি পোষাক-আশাক, পারস্পরিক সম্পর্কের ধরণ।

বাঙ্গালীর প্রচীন ইতিহাস
ভৌগলিক সিমানা : কোন জাতিকে জানতে হলে তার ভৌগলিক সিমানা জানা আবশ্যক। প্রাচীন বাংলার সীমানা সম্পর্কে নীহাররঞ্জন রায় বলেন, “এই দেশের উত্তর সীমায় বাঙলার উত্তরতম দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি জেলা। এই দুই জেলার পশ্চিমে নেপাল পূর্বে ভুটান রাজসীমা। বাঙলার পূর্ব সীমায় উত্তরে ব্রহ্ম‏পুত্র নদ, মধ্যে গারো, খাসিয়া ও জৈন্তিয়াপাহাড়; দক্ষিণে লুসাই, চট্টগ্রাম ও আরাকান শৈলমালা। পশ্চিম সীমা দক্ষিণে গঙ্গার তটবহিয়া একেবারে বর্তমান দ্বারভাঙ্গা বা দ্বারবঙ্গ (বঙ্গর দ্বার) জেলার পশ্চিম সীমা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পশ্চিম সীমায় রাজমহল-সাঁওতাল পরগনা-ছোটনাগপুর, মানভূমি, ধলভূম, কেওঞ্জর, ময়ূরভঞ্জের শৈলময় অরন্যময় মালভূমি। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এই প্রাকৃতিক সীমাবিধৃত ভূমিখণ্ডের মধ্যেই প্রাচীন বাঙলার গৌড়-পুন্ড, বরেন্দ্রী, রাঢ়, সুক্ষ্ম, তা¤্রলিপ্তি, সমতট, বঙ্গ, বঙ্গাল, হরিকেল প্রভৃতি জনপদ।
{বাঙ্গালীর ইতিহাস (আদি পর্ব) নীহাররঞ্জন রায়, পৃষ্ঠা-৬৮-৭০ দেজ পাবলিশিং, কলকাতা অষ্টম সংস্করণ}

নৃতাত্তিক দৃষ্টিতে বাঙালি
বাঙালি একটি মিশ্র জাতি। পৃথিবীর বহু জাতি বাংলায় প্রবেশ করেছে। নৃবিজ্ঞানীদের মতে পৃথিবীর চারটি প্রধান নরগোষ্ঠী নিগ্রীয়, মঙ্গোলীয়, ককেশীয় ও অষ্ট্রেলীয়। এর প্রতিটির কোনো না কোন শাখার আগমন ঘটেছে বাংলায়। ধারণা করা হয় বাংলার প্রাচীন জনপদগুলোর মধ্যে অষ্ট্রিক ভাষিরাই সবচেয়ে বেশি। সাওতাল, বাঁশফোড়, রাজবংশী প্রভৃতি আদি অষ্ট্রেলিয়দের সাথে সম্পৃক্ত। এদের দ্বারা নির্মিত সমাজের পরিবর্তন ঘটে আর্যদের আগমনের পর বাঙালির রক্তে মিশ্রণ ঘটে পারস্য, তুর্কিস্তান ও আরব জাতির। আর্য, গুপ্ত, সেন, বর্মন, কম্বেজাখ্য, খড়গ, তুর্কি, আফগান, মুঘল পুর্তুগিজ, ইংরেজ, আর্মেনীয় প্রভৃতি জাতি বাংলাকে শাসন করে এবং বাঙ্গালি জাতি গঠনে অবদান রাখে। এজন্য বাঙ্গালীকে বলা হয় সংকর জাতি।
{বাঙালি জাতি, বাংলাপিডিয়া, ৫ মে ২০১৪}
বাঙ্গালী নূহ আ. এর বংশধর বলে দাবী করেছেন অনেক ঐতিহাসিক। ইতিহাসবিদ গোলাম হোসাইন জইদপুরি বাংলার ইতিহাস নিয়ে লেখা ফারসি গ্রন্থ রিয়াজ উস-সালাতিন-এ বলেন, হযরত নূহ আ. এর পুত্র হামের জেষ্ঠ সন্তান হিন্দ, হিন্দুস্তানে আসার দর”ণ এই অঞ্চলের নাম তার নামানুসারে রাখা হয়। হিন্দের দ্বিতীয় পুত্র বং এর সন্তানেরা বাংলায় উপনিবেশ স্থাপন কারেন
{বাংলার ইতিহাস ড. মোহাম্মাদ হাননান আগামী প্রকাশনী, ৩৬ বাংলা বাজার, ঢাকা, ফেব্র”য়ারী ২০১৪, পৃষ্ঠা-২৮}

আর্যরা প্রথমে রাড়ে অতপর বরেন্দ্রীতে বসতি স্থাপন করেছিলেন খৃষ্টের জন্মের আগে। তারও আগে অস্ট্রিক, দ্রাবিড় ও ভোট-চিনারাও এ অঞ্চলে বাস করতেন।
{গোরাম মুরশিদ, হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি, পৃষ্টা-১৬}

আর্যদের আগমনের পূর্বে এ দেশের প্রধান আধিবাসিরা ছিল দ্রাবিড়। দ্রাবিড়রা মূলত সেমেস্টিক অনুসারেিদর উত্তর পুর”ষ ছিলো। তাই তৌহিদবাদ সম্পর্কে এদের ধারনা ছিল।
{রোকসানা ভূঁইয়া নিলু, বাংলাদেশে ইসলাম আগমন প্রসার ও কাঠামোগতরূপ}

ভাষার ভিত্তিতে বাঙ্গালী
বাংলা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠীর অন্যতম ভাষা। এ ভাষা বঙ্গভূমির আদি ভাষা ছিল না। তখন বিভিন্ন অঞ্চলের আদিবাসীদের মধ্যে বিভিন্ন ভাষা প্রচলিত ছিল। আর্যরা নিয়ে আসেন পূর্বাঞ্চলের প্রাকৃত ভাষা। বৌদ্ধরা এনেছিলেন পালি ভাষা। বহু শতাব্দী ধরে উচ্চারণ ও ব্যকরণগত বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষা স্বতন্ত্র রূপ লাভ করে। এই ভাষার আদি রূপ খানিকটা পাওয়া যায় দশম শতাব্দী থেকে রচিত চর্যাপদে। তবে বাংলা ভাষা তখনো একেবারে আলাদা ভাষা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেনি। মিশে ছিলো অহমিয়া এবং ওড়িয়া ভাষার সঙ্গে। তাই সঠিকভাবে বললে বলতে হয় চর্যাপদের বাংলা হলো প্রাক-বাংলা।
{বাঙ্গালি সংস্কৃতি, বাংলাপিডিয়া, ২৩ ফেব্র”য়ারি ২০১৫}
তাই বলা যায় এই অঞ্চলের ইতিহাস প্রচীন হলেও বাংলা ভাষার ইতিহাস অত প্রাচীন নয়।

বাঙ্গালী সংস্কৃতি কত পুরোনো
বাঙ্গালী সংস্কৃতি কত পুরনো এ বিষয়ে ইতিহসবেত্তাদের মধ্যে মত বিরোধ পরিলক্ষিত হয়। কোন কোন লেখক সাম্প্রতিক কালে বাঙ্গালি সংস্কৃতিকে খুব পুরোনো বলে দাবী করেছেন। তবে অনেকের মতে বিষয়টি পুরো বিপরীত। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি গ্রন্থে বলা হয়েছে, আমাদের বিবেচনায় বাঙালি সংস্কৃতি আদৌ অতো পুরোনো নয়। কারণ বাংলা ভাষা দুরে থাক, তার জননীরও তখন জন্ম হয়নি। সত্যি বলতে কি, বাংলা ভাষার বয়স এক হাজার বছরও হয়েছে কিনা, তাতেও সন্দেহ আছে।
{গোলাম মুরশিদ, হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি, অবসর প্রকাশ সংস্থা, পৃষ্ঠা-১৬}

বাংলা ভাষার সবচেয়ে পুরানো যে নমুনা পাওয়া গেছে চর্যাপদে, সেই চর্যাপদের বয়স হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে এক হাজার বছর হলেও সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় ও সুকুমার সেনের মতে চর্যাপদ দশ থেকে দ্বাদশ শতকের। ড. মুহাম্মাদ শহিদুল্লাহর মতে সপ্তম অথবা অষ্টম শতকের রচনা বলে দাবী করেছেন। তাছাড়া চর্যপদের মধ্যে বাংলা ভাষার কিছু বৈশিষ্ট্য দেখা দিলেও তার অনেক কিছুই ওড়িয়া-অহমিয়া ভাষার সঙ্গে অভিন্ন ছিল। তাই চর্যপদের ভাষাকে ঠিক বাংলা বলা যায় না। {প্রাগুক্ত-১৭}
সুতরাং বাংলা ভাষাকে বাঙ্গালি সংস্কৃতির মৌলিক উপাদান গণ্য করলে বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাসকে এক হাজার বছরের কম বয়সী বলাই যুক্তিযুক্ত।

বাঙ্গালি সংস্কৃতির বিকাশ পর্ব
১৩৫২ সালে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ প্রথম গৌড় বরেন্দ্রী, সুক্ষ, সমতট, বঙ্গ ইত্যাদি এলাকা বিজয় করেন। সোনারগাঁ জয়ের পর নিজেকে ‘শাহে বাঙ্গালিয়ান’ বা বাঙালিদের সুলতান বলে ঘোষণা করেন। এরপর থেকেজ ধীরে ধীরে এই বিস্তীর্ণ এলাকা একটি সুলতানীর অধীনে আসে এবং তা বাঙ্গালা নামে পরিচিত হয়। {প্রাগুক্ত-২০}

কিন্তু চর্যাপদের কবি ভুসুকুপাদ প্রথম একটি চর্যায় নিজেকে বাঙ্গালী বলে দাবী করেন। কিন্তু সেটি ছিল অন্য অর্থে। যথা-
আজি ভুসুকু বঙ্গালী ভইলি
নিঅ ঘরিণী চণ্ডালে লেলি-
অর্থাৎ-চণ্ডাল তার স্ত্রীকে গ্রহণ করায় ভুসুকু বাঙ্গালি (জাতহীন বা নীচুজাতের) হলেন।
বাঙ্গালির এই অর্থ তখনকার সংস্কৃত শাস্ত্র থেকেও অনুমান করা যায়। তখনকার সংস্কৃত সাস্ত্রে বলা হয়েছে, “বঙ্গে যেওনা। কারণ সেটা হলো ব্রাত্যদের দেশ” সংস্কৃত ভাষায় ব্রাত্য অর্থ হলো হীনজাতি। {প্রাগুক্ত-২২}
তাই মোটামুটিভাবে এইটা বলা যায় যে, এই অঞ্চলে মুসলিম শাসনের মধ্য দিয়ে বাংলা অঞ্চল ও বাঙ্গালী সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।

ভাষাকে ভিত্তি করে বাঙ্গালি জাতি গঠনে মুসলমানদের অবদান
যদি বাংলা ভাষাকে বাঙ্গালি জাতিয়তাবাদের মৌলিক উপাদান ধারা হয় তাহলে দেখা যায় এ অঞ্চলে মুসলমানগণ আগমনের পর থেকেই মূলত বাংলা ভাষার সূচনা; ইতোপূর্বে আমরা যেটি আলোচনা করেছি। ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিম সেনাপতি মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজি বাংলা দেশে মুসলিম রাজত্ব কায়েমের ফলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের নবজন্ম ঘটে। মুসলমান শাসক হুসেন শাহ, গৌড়ের সামসুদ্দিন ইউসুফ শাহ এবং অপরাপর মুসলমান স¤্রাটেরা বাংলাদেশে বাংলা ভাষাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে আমাদের সাহিত্যে এক নতুন যুগ সৃষ্টি করেছিলেন। আর সে কারণেই দিনেশ চন্দ্র সেন মন্তব্য করে, “মুসলমান স¤্রাটগণ বর্তমান বঙ্গ সাহিত্যের জন্মদাতা এইরূপ বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। বঙ্গ সাহিত্য মুসলমানদেরই সৃষ্ট, বঙ্গভাষা বাঙ্গালী মুসলমানের মাতৃভাষা।”
{সুত্র : প্রাচীন বাঙ্গলা সাহিত্যে মুসলমানের অবদান, দীনেশ চন্দ্র সেন (১৯৪০) কলকাতা।}

দীনেশ চন্দ্র সেন আরো বলেন- ‘কয়লার খনির মধ্যে থাকিয়া হীরা যেমন জহুরির আগমনের প্রতীক্ষা করে, শুক্তির ভেতর মুক্তা লুকাইয়া থাকিয়া যেরূপ ডুববুরির অপেক্ষা করিয়া থাকে, বাংলা ভাষা তেমনই কোনো শুভদিন শুভক্ষণের জন্য প্রতীক্ষা করিতেছিল। মুসলিম বিজয় বাংলা ভাষার সেই শুভদিন শুভক্ষণের সুযোগ আনয়ন করিল।’ [দ্রষ্টব্য : বাংলা ভাষার ওপর মুসলমানের প্রভাব : শ্রী দীনেশ চন্দ্র সেন]।

বিশিষ্ট গবেষক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান“বাংলার সামাজিক ও সংস্কৃতির ইতিহাস” গ্রন্থের ভূমিকায় বলেন, “যদি বাংলায় মুসলিম বিজয় ত্বরান্বিত না হতো এবং এদেশে আরো কয়েক শতকের জন্য পূর্বের শাসন অব্যাহত থাকতো। তবে বাংলা ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যেত এবং অবহেলিত ও বিস্মৃত হয়ে অতীতের গর্ভে নিমজ্জিত হতো।

“বাংলা হলো মুসলমানদের প্রানের ভাষা। আর এ কারণেই আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ ১৯০৩ সালে ‘আল ইসলাম’ পত্রিকায় সর্বপ্রথম বাংলাকে মুসলমানদের মাতৃভাষারূপে তুলে ধরেন।”
[সূত্র : ড. ইফতেখারউদ্দিন চৌধুরী, দৈনিক ইত্তেফাক, সোমবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৩]

আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ ১৩২৫ বঙ্গাব্দে ‘আল-ইসলাম’-এ নির্ভীকচিত্তে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা দেন যে, “বাঙলা বাঙালী মুসলিমের কেবল মাতৃভাষাই নয়; জাতীয় ভাষাও।”

হিন্দুগনের সম্পর্কে অভিযোগ রয়েছে, “ব্রাহ্মণ্যবাদী সেন রাজারা বাংলা ভাষা চর্চা নিষিদ্ধ করেছিল। আর হিন্দু পুরোহিতরা এ কথা বলে বেড়াতো যে, যে ব্যক্তি বাংলা ভাষায় কথা বলবে সে নরকে যাবে।”
[সুত্র : খন্দকার কামর”ল হুদা, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও শেখ মুজিব, ১৯৯৫ পৃষ্ঠা ৩২]

ডক্টর দীনেশ চন্দ্র সেনের ভাষায়, ‘ইতরের ভাষা বলিয়া বঙ্গ ভাষাকে হিন্দু পণ্ডিত মণ্ডলী ‘দূর দূর’ করিয়া তাড়াইয়া দিতেন। (সওগাত, চৈত্র, ১৩৩৫)

তাইতো বাঙ্গালীর গঠনপর্বে কবি সাহিত্যিকগণ মুসলিম সুলতানদের প্রসস্থি গেয়েছেন। পঞ্চম শতাব্দীর শেষে এবং ষোড়শ শতাব্দীর শুর”তে রাজত্বকারী বিখ্যাত সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের প্রশাস্তি গেয়ে মিথিলার কবি বিদ্যাপতি লিখেন
সাহু হুসেন অনুমানে যাবে হানল মদন বাণে
চিরঞ্জীব রহু পঞ্চ-গৌড়েশ্বর কবি বিদ্যাপতি ভানে।
বিদ্যাপতির পরে মালাধর বসু বা যশোরাজ খান লিখেন, শ্রীযুত হুসন জগতভূষণ সেই ইহ রস জান।
পঞ্চ-গৌড়েশ্বর ভোগ-পুরন্দর ভনে যশরাজ খান।
{গোলাম মুরশিদ, হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি-২০}
সুতরাং বাংলা ভাষায় মুসলমানদের অবদান অনস্বিকার্য।

বাঙ্গালী সমাজে ধর্ম
একটি অঞ্চলে সমাজ ও ধর্ম জড়াজড়ি করে, থাকে। বাঙ্গালীর প্রাচীনকাল থেকে অদ্যবধি ধর্মই সমাজকে সর্বাধিক প্রভাবিত করেছে। এদেশে আর্যদের পূর্বে কারা বাস করতো তার ধারণা যেহেতু স্পষ্ট নয়; সেহেতু তাদের ধর্ম নিয়ে বলা কঠিন। কেউ কেউ বলেছেন, তারা প্রকৃতি পূজারী ছিলেন। “আর্যপূর্ব ভারতীয় আধিবাসিরা বিশেষ বৃক্ষ, পাথর, পাহাড়, ফল, ফুল, পশু, পক্ষী, বিশেষ স্থান ইত্যাদির উপর দেবত্ব আরোপ করে পূজা করত”
{নীহাররঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিহাস দেজ পাবলিশিং, কলকাতা, পৃষ্ঠা-৪৭৯}

আর্যরা এ অঞ্চলে এসেছিল খ্রিষ্টের প্রায় পাঁচশত বছর পূর্বে। তারা নিয়ে এসেছিলো একেবারে ভিন্নধর্মী সংস্কৃতি। তারা নিয়ে এসেছে বৈদিক ধর্ম। আর্যদের আগমনের ফলে দেশীয় এবং বহিরাগত সংস্কৃতির ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া শুর” হয়েছিলো। ফলে সমন্বয়ের মধ্যে দিয়ে উভয়ের ধর্মে পরিবর্তন আসতে শুর” করে।

এই অঞ্চলে আর্যসভ্যতার শক্তিশালী প্রভাব পড়ে মৌর্যদের আমলে। রাজধর্ম হিসেবে দ্র”ত ছড়িয়ে পড়তে থাকে বৌদ্ধ ধর্ম। অনেক রাজারাই বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। “অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পাল বংশের প্রতিষ্ঠা করেন গোপাল। তিনি ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের উৎসাহী সমর্থক। সে কারণে তিনি বঙ্গদেশে বৌদ্ধধর্মের প্রসারের জন্য সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তারপরে ধর্মপালও বিশেষ সহায়তা করেছিলেন বৌদ্ধধর্মের। পালদের আগে এ সময়কালে খড়গ, দেব এবং চন্দ্রবংশের বাজারাও বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। বস্তুতঃ কেবল বৌদ্ধ ধর্ম নয়; বৌদ্ধ প্রভাবিত শিক্ষাও পাল রাজাদের আমলে ছড়িয়ে পড়েছিলো।
{হাজার বছরের বাঙ্গালী সংস্কৃতি, গোলাম মুরশিদ, জুন ২০১৮,অবসর প্রকাশন সংস্থা, ৪৬/ হেমচন্দ্র দাস রোড, সূত্রাপুর, ঢাকা। পৃষ্ঠা-৫৩}

অপরদিকে গুপ্তদের আমরে সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিল ব্রাহ্মণ্য ধর্ম। এই সময়কার তা¤্রশাসনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ধর্মীয় কাজের জন্য জমি দান করা হতো ব্রাহ্মণদের ।
সপ্তম শতাব্দীর শুর”তে বঙ্গের পরাক্রান্তে রাজা শশাঙ্কের আমলে বৌদ্ধ ধর্মের উপর বড়ো রকমের আঘাত আসে। বৌদ্ধমূর্তি ভেঙ্গে ফেলা। বিহার ধ্বংশ করা, বিহার থেকে ভিক্ষুকদের বিতাড়িত করা, বোধগয়ার বোধবৃক্ষ কেটে ফেলা ইত্যাদি অনেক ঘটনাই ঘটেছিল বলে উল্লেখ করেছেন চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং। এর পরবর্তী সময়গুলোতেও ব্রাহ্মণ ধর্ম রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাপ্তি লাভ করে।
“বর্মণদের আমলে ব্রাহ্মণ ধর্মে প্রতি আনুকুল্য আরও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এ ধর্ম সবচেয়ে পৃষ্ঠপোষণা লাভ করে সেন আমলে। তাঁরা রীতিমতো ব্রাহ্মণ ধর্মের বিশেষ করে শৈবমতের পৃষ্ঠপোষণা শুর” করেন।
{প্রাগুক্ত পৃষ্ঠা-৫৪}

চীনা পর্যটকদের তথ্য মতে ইতিহাসবিদরা মনে করেন, চতুর্থ-পঞ্চম শতাব্দী থেকে রষ্ট্রীয় আনুকুল্যের ফলে ধীরে ধীরে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার কিছুটা কমে গিয়ে হিন্দু ধর্মের শ্রী বৃদ্ধি হতে থাকে।
এর পর আসে ইসলাম ধর্ম।

বাংলায় ইসলামের আগমন
ইখতিয়ার উদ্দিন মো‏হাম্মাদ বকতিয়ার খিলজির ১২০৪ সালে বঙ্গ বিজয়ের মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলে মুসলমানদের রাজনৈতিক বিজয়ের সূচনা হলেও ইসলাম এখানে আরো অনেক পূর্বেই এসেছে। রাসূলুাহ (স.) এর জীবদ্দশায়ই ইসলামের বাণী এদেশে এসে পৌঁছে। সপ্তম শতাব্দীর প্রথম দিকেই ভারতের পশ্চিম উপকূলে মালাবার রাজ্যে (বর্তমান কেরালা) ইসলাম প্রচারিত হয়। শায়খ খায়নুদ্দীন তাঁর “তুহফাতুল মুজাহেদীস ফী বাথে আহওয়ালিল বারতা কালীন” নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ভারতের মালবার রাজ্যের রাজা চেুর”মুল পার”মুল স্বেচ্ছায় সিংহাসন ত্যাগ করে মক্কা গমন করেন এবং হযরত মুহম্মদ (স.) এর দরবারে হাজির হয়ে
ইসলাম গ্রহণ করেন। (মোঃ শফিকুল ইসলাম, ইকরা, কুরআনিক স্কুল সোসাইটি, ২০১৩, পৃঃ ১১)

এই সময় মালাবারে বহু পৌত্তলিক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।এসময়ে ইসলামের সত্যবাণী বাংলায়ও প্রবেশ লাভ করে। হযরত মুহম্মদ (স.) এর কাছে উপমহাদেশের জনৈক শাসক এক ডেকচি “আদা” উপহার পাঠিয়েছিলেন বলে এ হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে, Sarbatak, King of Juja (India) sent an earthen pot full of ginger to Hazrat Muhammad, (Peace be on him) the Prophet as presents according to a narration bz Abu sazeed Khudri (R.). If is also reported that Hazrat Muhammad, (Peace be on him) the prophet sent Hudhze Usama and S’Ohazb to the King inviting him to accept Islam. He embraced Islam. Sarbatak also saidÓ I saw the prophet face first in Mecca and then in Medina.
(ইকরা, পৃষ্ঠা ১১-১২)

ইসলামের প্রথম কয়েক বসরে নবূয়াত ও প্রথম খলীফার আমলে না হলেও দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর ফার”ক রা. এর খিলাফত কালে বিশ্বনবীর সাহাবীগণের কেউ কেউ এই উপমহাদেশে আগমন করেছিলেন। এই বিষয়ে যে কয়জন সাহাবীর ভারত আগমনের সন্ধান পাওয়া যায়, তাঁরা হলেন-
১. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে উতবান
২. হযরত আছেম ইবনে আমর আত তামীমী
৩. হযরত ছুহার ইবনে আল আবদী
৪. হযরত সুহাইব ইবনে আদী
৫. হযরত আল হাকাম ইবনে আবিল আছ আস সাফাফী রা.

হযরত উসমান রা.-এর খিলাফতকালে যে দুই জন সাহাবী ভারতবর্ষে আগমন করেন তারা হলেন-
হযরত উবাইদুল্লাহ ইবনে মা’মার আত-তামীমী ও হযরত আবদুর রহমান ইবনে সামুরা ইবনে হাবীর ইবনে আবদে শামস।
আমীর মুয়াবীয়ার যুগে আসেন হযরত সিনান ইবনে সালমাহ ইবনে আল মুহাব্বিক আল-হুযালী। তদানীনন্তন ইরাক শাসনকর্তা জিয়াদ তাকে ভারত সীমান্তের শাসনকর্তা নিযুক্ত করে পাঠিয়ে ছিলেন। সাহাবীদের পর বহুসংখ্যক তাবিঈ ভারতে আগমন করেছিলেন। ইতিহাস হতে প্রমাণ পাওয়া যায়। আমীর মুয়াবীয়ার যুগে সর্ব প্রথম যে তাবিঈ ভারত আগমন করেন তিনি হলেন মুহলাব ইবনে আবূ ছফরা। তিনি ৪৪ হিজরী সনে হযরত আব্দুর রহমান ইবনে সামুরা সাহাবীর সংগে একজন সেনাধ্যক্ষ হিসাবে এখানে পদার্পন করেন।

মুহাম্মদ ইবনে কাসিমের অভিযানের পূর্ব থেকেই স্থল পথে ভারতে মুসলমানদের আগমনর শুর” হয়। সমগ্র উপমহাদেশে প্রবেশ মূলত সিন্ধুর পথ ধরেই হয়েছিল। প্রথমে দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর (রা.) র আমলে অর্থাৎ ১৫ হিজরী সনের মধ্যভাগে সিন্ধু অভিযান শুর” হয়। উল্লেখ্য যে, ৪৪ হিজরীতে আমীর মুয়াবীয়ার শাসনামলে সেনাপতি মুহাল্লাব ইবনে আবু সূফরী সিন্ধু সীমান্ত অতিক্রম করেন। মুহাল্লাবের পর কতিপয় ব্যক্তি যারা সিন্ধু সীমান্তে অভিযান পরিচালনা করে। তাদের মধ্যে ছিলেন-
১. আবদুল্লা ইবনে সাওয়ার
২. রাশেদ ইবনে আমর জাদীদী
৩. সীনান ইবনে সালামাহ
৪. আব্বাস ইবনে যিয়াদ
৫. মুনযির ইবনে জার”দ আবদী
[আবদুল মান্নান তালিব, “বাংলাদেশে ইসলাম” ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ, ১৯৮০ পৃষ্ঠা ৭১]

সম্প্রতি লালমনিরহাটের সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের মজদের আড়া গ্রামে ৬৯ হিজরীতে বা ৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত একটি প্রাচীন মসজিদের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একটি শিলালিপি পাওয়া যায়। যার মধ্যে স্পষ্টাক্ষরে আরবীতে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ হিজরী ৬৯” লেখা ছিল। এই শিলালিপিটিও ওই সময়ের ইসলামের দাওয়াতকে সত্যায়ন করে।
অবশেষে ৭১২ খৃস্টাব্দে (৯৩ হিজরী) মুহাম্মদ বিন কাসিম সমগ্র সিন্ধু জয় করেন। সিন্ধু বিজয়ের পর হিজরী প্রথম শতাব্দীতে ভারতের অভ্যন্তরে ইসলামের প্রবেশ ঘটে। ফলশ্র”তিতে বিভিন্ন মুসলিম বসতি গড়ে উঠতে শুর” করে। ধীরে ধীরে বহু অমুসলিম নর-নারী ইসলামের পতাকা তলে সমাসীন হতে লাগল। ইসলাম প্রচারের প্রয়াস আরো বেড়ে গেল।

লেখক আবদুল মান্নান তালিব তার ‘বাংলাদেশে ইসলাম’ গ্রন্থে একাদশ থেকে সপ্তদশ শতক কে তিনটি পর্যায়ে বিভাজন করেছেন।
প্রথম পর্যায়- একাদশ, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকের প্রথম পাদকে ইসলাম প্রচারের শৈশব ও কৈশোর অবস্থা বলেছেন।
২য় পর্যায়- ত্রয়োদশ শতকের দ্বিতীয় পাদ ও চতুর্থ শতককে ইসলাম প্রচারের যৌবন কাল।
৩য় পর্যায়- পঞ্চদশ, ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে ইসলাম প্রচারের ধারা মন্দীভূত হতে থাকে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
[আবদুল মান্নান তালিব, পূর্বোক্ত পৃষ্ঠা ৭৫]

বাংলায় মুসলিম সংখ্যাধিক্য
মুসলিম দাঈগণের দাওয়াতের মাধ্যমেই মূলত এ অঞ্চলে মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। কবে কতলোক ইসলাম গ্রহন করেছে তা সুনির্দিষ্ট্য করে বলা মুশকিল। একটি তথ্যমতে- “১৮৭২ সালের লোকগণনার পরিসংখ্যানে প্রথম দেখা যায় যে, বঙ্গদেশে মুসলমানগনদের সংখ্যা হিন্দুদের প্রায় সমান। এবং এর দু দশক পরে, ১৮৯১ সালের পরিসংখ্যানে হিন্দুদের তুলনায় মুসলমানদের সংখ্যা ছড়িয়ে যায়”। {প্রাগুক্ত-৬৫}
মুসলমানদের সংখ্যা কখন বৃদ্ধি পেয়েছে এ বিষয়ে আর একটু বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় উলরিখ ক্রেমার (১৯৯৩) এর তথ্যমতে। বঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধি সম্পর্কে তার গবেষনার ওপর ভিত্তি করে পনিনি মুরশিদের করা গ্রাফ-এ।

এই তথ্য অনুযায়ী ১২০৪ সালে বঙ্গদেশে মোট জনসংখ্যা ছিল ১২.৫৮ মিলিয়ন (ভারতবর্ষে ১৮ মিলিয়ন)। তা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়ে ১৮৭২ সালে দাঁড়ায় ৩৬.৭ মিলিয়ন (ভারতবর্ষে ২৫৫ মিলিয়নে) যাই হোক মুসলিম সংখ্যাধিক্যটা ছিল দৃশ্যমান।
কি কারণে মুসলমানগণ সফলতা লাভ করেছে তা নিয়ে ঐতিহাসিকগনের মধ্যে রয়েছে মতবিরোধ। একটি মত হলো তরবারীর সাহায্যে ইসলাম প্রচার। কিন্তু রিচার্ড ঈটন এবং অসীম রায়ের মতো অনেক ঐতিহাসিক এ অভিমত অস্বীকার করেন। তাদের একটি যুক্তি হলো, “দিল্লি অঞ্চলেই মুসলিম শাসন সবচেয়ে আগে স্থাপিত হয়েছিল। কিন্তু দিল্লি এবং এর আশে পাশে মুসলমানগণদের সংখ্যা বঙ্গের তুলনায় অনেক কম।”{প্রাগুক্ত-৬৩}

তাই হাজার বছরের বাঙ্গালী সংস্কৃতি বইতে বলা হয়েছে- “তরবারি দিয়ে তাঁরা নিয়মিত ধর্ম প্রচার করেছিলেন, এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায়না। তরবারি দিয়ে ব্যাপকভাবে ধর্মান্তরিত করা যায় কিনা, তাও প্রশ্নসাপেক্ষ। {পৃষ্ঠা-৬৪}

২য় মত হলো বহিরাগত মুসলমানের বঙ্গদেশে স্থায়ী বসবাস। কিন্তু বেশিরভাগ ঐতিহাসিক এই মত মেনে নিতে পারেন নি। এই ঐতিহাসিকদের মতে বিদেশ থেকে আসা মুসলমানদের সংখ্যা শতকরা পাঁচ ভাগের বেশি নয়।
৩য় মত হলো ইসলাম ধমের সামাজিক সাম্য প্রত্যক্ষ করেই নিম্নশ্রেণীর হিন্দুরা অমানবিক জাতিভেদের নির্যাতন থেকে রেহাই পাবার উদ্দেশ্যে ব্যাপক সংখ্যক মুসলমান হয়েছিলেন। করন ইসলাম ধর্মে জাতি ভেদ নাই।
অনেকে বলেছেন, মুসলিম শাসনের গোড়ার দিকে নিম্নবর্ণ হিন্দুর সংখ্যা কম ছিল। সমাজের নিচু শ্রেণীর বেশিরভাগই ছিলেন বৌদ্ধ। মুসলিম শাসন স্থাপিত হওয়ার দেড় শো/ দুশো বছর পরে সামান্য নেড়ানেড়ি ছাড়া সেই বৌদ্ধদের সংখ্যা দ্র”ত হ্রাস পেতে আরম্ব করেছিল।
এই দৃষ্টিকোন থেকে এই অঞ্চলের মানুষের মুক্তিদাতা আদর্শ হিসেবে ইসলাম এখানে আবির্ভূত হয়েছিল। চতুর্থত অনেকে মুসলিম শাসকদের সম্পর্কে এসে বড় পদ, দয়া-দাক্ষিন্য পাওয়ার লোভে মুসলমান হয়েছিলেন। দুয়ার্তে বার্বোসা বঙ্গদেশে ভ্রমন করতে এসেছিলেন ১৫১৮ সালে। তিনি লিখেছেন যে, জনগনের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ট্য অংশই হিন্দু। কিন্তু প্রতিদিন হিন্দুদের অনেকে মুসলমান হচ্ছিলেন {প্রাগুক্ত-৬৮}
পঞ্চম মত হলো- পীর, বুজুর্গ ও দরবেশ শ্রেণীর আগমন। এ সম্পর্কে যথার্থ উক্তি হলো, “অনেক ঐতিহাসিক বরং ব্যপকভাবে ধর্মান্তরের জন্য বিশেষ করে পীর দরবেশদের ভূমিকাকে গুর”ত্বপূর্ণ বলে মনে করেছেন। তাদের মতে তুর্কীদের শাসন শুর” হওয়ার আগ থেকেই অনেক সূফি-পীর মধ্যপ্রচ্য থেকে বঙ্গদেশে আসতে আরম্ব করেন। তারপর তুর্কিদের আমলে পীর-দরবেশদের সংখ্যা ক্রমশ বৃৃদ্ধি পেয়েছিল। {প্রাগুক্ত-৬৬}
তাদের হাত ধরেই বঙ্গে মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে থাকবে। আমিও তাই মনে করি।