নবীজী সা. এর বিপ্লব ও বিজয়ের ক্রমধারা; মাওলানা আবদুর রাজ্জাক

0
14

সীরাত
সীরাত আরবী শব্দ। বহুবচন সিয়ার।‘আল মুজাম আল আজম’ ও মিসবাহুল লুগাত’ নামক বিখ্যাত দুটি আরবি অভিধানে এর অর্থ করা হয়েছে পথ-পদ্ধতি, সুন্নাত, প্রস্থান করা, জীবন চলার ধরণ ইত্যাদি। আর ইসলামী বিশ্বকোষে অন্যান্য অর্থের সঙ্গে ‘মুহাম্মদ সা. এর গাযওয়ার বর্ণনা, মুহাম্মদ সা. এর জীবনচরিত’ ইত্যাদি অর্থেও উল্লিখিত হয়েছে। কালামে পাকে সীরাত শব্দটির ব্যবহার লক্ষ করা যায় সূরা ত্বহার ২১নং আয়াতে। এখানে সীরাত শব্দটি তার আভিধানিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আর সীরাত শব্দের পারিভাষিক অর্থ বোঝানো হয়েছে মহানবী সা. এর সার্বিক জীবন চরিত্রকে। তাই রাসূল সা. এর বিখ্যাত জীবনীগ্রন্থগুলোর নামের সঙ্গে এই সীরাত শব্দের সম্পৃক্ততা দেখা যায়। মোটকথা সীরাতুন্নবী হলো আল্লাহর নবী সা. এর জীবনালেখ্য, জীবনাদর্শ; যা আল্লাহপ্রদত্ত এক বিচ্ছুরিত আলোকের বাস্তব রূপ। নবীজী সা. যে বিচ্ছুরিত আলোকচ্ছটায় মানবজাতির সামনে নিজেকে পেশ করেছেন। যার মাধ্যমে মানবজাতিকে পথভ্রষ্টতার গভীর অন্ধকার থেকে মুক্ত করে সত্য সুন্দরের আলোকিত পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মানুষের দাসত্বের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করে আল্লাহর দাসত্বের দিকে নিয়ে এসেছেন।

নবীজীর সীরাতের বৈশিষ্ট্য
১. আমাদের নবীজী সা. এর নবুওয়াত বিশেষ কোন দেশ বা জাতির জন্য নয়; বরং তিনি কেয়ামত পর্যন্ত আগত সমস্ত জাহানের সকল জাতির জন্য নবী। আল্লাহ তা‘আলা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন-
“হে নবী! আমিতো তোমাকে সমগ্র জাতির প্রতি সুসংবাদদাতা এবং সতর্ককারী রূপে প্রেরণ করেছি, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা বোঝেনা”।১
“হে রাসূল! তাদেরকে বলুন, হে লোক সকল আমি তোমাদের সকলের প্রতি রাসূল।”২
“মহান ঐ সত্তা যিনি তাঁর বান্দার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছেন, যাতে সে বিশ্ববাসীর জন্য সতর্ককারী হতে পারে।”৩
নবীজী সা. নিজেই বলেছেন-
“পূর্বের নবীগণ বিশেষভাবে তাঁর সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরিত হতেন, আর আমি সমগ্র মানবজাতির নিকট (জন্য) প্রেরিত হয়েছি।৪

২. আমাদের নবীজী সা. শুধু সমকালের জন্য নয়; বরং সর্বকালের সব মানুষের জন্য তিনি রাসূল। তিনি সব শ্রেণি পেশার মানুষের জন্য যেমন আদর্শ, তেমনি কেয়ামত পর্যন্ত সব সময়ের জন্য তাঁর রিসালত পরিব্যাপ্ত। কারণ, তিনি শেষনবী। তাঁর পরে আর কোন নবী আসবেনা। শেষনবী হওয়ার এই গৌরব একমাত্র তাঁর। কালামে পাকে ইরশাদ হয়েছে-
“মুহাম্মদ সা. তোমাদের কোন পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষনবী।”৫
হাদীসে পাকে ইরশাদ হয়েছে-
“আমি শেষনবী, আমার পর আর কোন নবী নেই”। তাঁর আনীত বিধি-বিধান যেহেতু শেষ বিধি-বিধান, তাঁর দেয়া ম্যাসেজ যেহেতু শেষ ম্যাসেজ। তাই কেয়ামত পর্যন্ত তাঁর আনীত বিধি-বিধানে, তাঁর দেয়া ম্যাসেজ এবং তাঁর আদর্শেই একমাত্র শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে, অন্য কোন আইন বা আদর্শে নয়।

৩. তিনি মানবজাতির জীবনের সকল ক্ষেত্র ও বিভাগের জন্য আদর্শ। মানুষের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থ, সকল ক্ষেত্রে তাঁর আদর্শ বিদ্যমান। মানুষ তাঁর ব্যক্তি জীবন থেকে আন্তর্জাতিক জীবন পর্যন্ত যে কোন বিষয়ে তাঁকে আদর্শ মেনে শান্তি ও সফলতা অর্জন করতে পারে।
কালামে পাকে ইরশাদ হয়েছে-
“ নিশ্চই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের চরিত্রে রয়েছে উত্তম আদর্শ।”৬

৪. আমাদের নবীজী সা. এর শরীয়ত সকল শরীয়তের চেয়ে কামেল ও পূর্ণাঙ্গ। আর শরীয়ত কামেল হওয়া নবুওয়াত কামেল হওয়ার প্রমাণ বহন করে।
আল্লাহ তা’আলা কালামে পাকে ঘোষণা করেন-
“আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করে দিলাম।৭

৫. আমাদের নবীজীর উম্মত সকল উম্মতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।
কালামে পাকে ইরশাদ হয়েছে-
“তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত। মানব জাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে। ”৮

৬. নবীজী মুহাম্মদ সা. এর উম্মত বিশ্বাস, কর্ম ও ইবাদত, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিকসহ সব দিক থেকে ভারসাম্যপূর্ণ।
কালামে পাকে ঘোষিত হয়েছে-
“এভাবে আমি তোমাদেরকে একটি মধ্যপন্থী জাতিরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছি।”৯

সীরাত অধ্যয়নের গুরুত্ব
মহান আল্লাহ তা’আলা নবীজী সা. কে ধরাপৃষ্ঠে প্রেরণ করেছেন অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে। তাই কালামে পাকের বহু জায়গায় আল্লাহর আনুগত্যের সাথে সাথে তাঁর রাসূলের আনুগত্যের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। অধ্যয়নের মাধ্যমে তাঁর আদর্শের জ্ঞান অর্জিত হলে অনুকরণ ও আনুগত্যের ধ্যান-ধারণা তৈরি হবে। নবীজী সা. হলেন কুরআনুল কারীমের বাস্তব নমুনা। কালামে পাকে যত আদর্শের কথা বলা হয়েছে, তাঁর বাস্তবরূপ ছিলেন রাসূল সা.।
হযরত আয়েশা রা. বলেন-
“রাসূল সা. এর সীরাত তো হলো আল কুরআন।১০
তাই সীরাত অধ্যয়ন যে যত বেশি করবে সে কুরআন তত বেশি বুঝতে সক্ষম হবে। মানুষের জীবনের উত্থান-পতন নবীজী সা. এর সীরাত অনুসরণের সাথে জড়িত। তাঁর সীরাত মানবজীবনের সকল দ্বিধা-সংশয় দূর করার মহৌষধ। মানুষের বহিরঙ্গের পরিপট্য, অন্তর্জগত আলোকিত, শিষ্টতাপূর্ণ আচার-আচরণের গুণ অর্জনের জন্য, বিশুদ্ধভাষী, সদালাপী ও চরিত্রে ভারসাম্য সৃষ্টির জন্য সীরাত অধ্যয়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নবীজী সা. কে ভালোবাসা ঈমান পরিপূর্ণ হওয়ার শর্ত। আর ভালোবাসার দাবি হলো তাঁর আদর্শের অনুসরণ। তবে মনোজগতে নবীজী সা. এর প্রতি ভালাবাসা সৃষ্টি হবে তাঁর সীরাত অধ্যয়নের মাধ্যমে। কারণ, সীরাত অধ্যয়ন দ্বারাই তাঁর সততা সম্পর্কে হৃদয়ে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাতে পারে।

দীন কায়েমের জন্য নববী আদর্শের প্রয়োজনীয়তা
শিশু, কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ, মালিক, শ্রমিক, ক্রেতা, বিক্রেতা, সৈনিক, সেনাপতি, রাষ্ট্রপ্রধান সকলের জন্য আমাদের নবীজী সা. আদর্শ মডেল। যারা দীন কায়েমের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করবেন তাদের জন্যও রাসূল সা. আদর্শ। দীন যার মাধ্যমে এসেছে, দীন প্রতিষ্ঠার জন্য যাকে প্রেরণ করা হয়েছে তাঁর আদর্শ বাদ দিয়ে দীন কায়েম হতে পারে না। তিনি যে পথ ও পদ্ধতিতে দীন প্রতিষ্ঠা করেছেন। সাহাবায়ে কেরাম যে নিয়ম-নীতি শিক্ষা দিয়েছেন তা উপেক্ষা করে কারো পক্ষে দীন কায়েম করা সম্ভব নয়। তাই যারা ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠার জন্য ময়দানে আছেন, রাজনীতি করছেন, তাদেরকে নবীজী সা. এর সীরাত বিশেষভাবে অধ্যয়ন করে তা থেকে দীক্ষা নিতে হবে। সে মতে নিজেদের শ্রম-শক্তি ব্যয় করতে হবে।

নবীজী সা. এর আগমনের উদ্দেশ্য
কালামে পাকে সূরা বাকারার ১২৯ এবং ১৫১, সূরা আলে ইমরানের ১৬৪ এবং সূরা জুম’আর ২নং আয়াতে নবীজী সা. এর দায়িত্ব হিসেবে চারটি বিষয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। (এক) কালামে পাকের আয়াতের তেলাওয়াত, (দুই) কিতাব শিক্ষা অর্থাৎ কুরআনুল কারীমের তা’লীম, তার অর্থ ও মর্ম শিক্ষা দেয়া, (তিন) হেকমত শিক্ষা দেয়া অর্থাৎ কুরআনুল কারীমের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সুন্নাহ শিক্ষা দেয়া, (চার) লোকদেরকে পরিশুদ্ধ করা অর্থাৎ মানুষের আত্মচরিত্রকে পঙ্কিলতা থেকে শুদ্ধতা দান করে মানবসমাজের সর্বোচ্চস্তরে উপনীত করা। নবীজী সা. এর দায়িত্ব সম্পর্কে মহান আল্লাহ আরো বলেন, “হে রাসূল! তোমার পালনকর্তার পক্ষ থেকে যা কিছু তোমার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে তার প্রচার-প্রসার কর। যদি তুমি তা না কর তাহলে বোঝা যাবে তুমি আল্লাহর পয়গাম পৌঁছাওনি। আল্লাহ তা’ আলা তোমাকে মানুষের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করবেন।” ১১
উপর্যুক্ত আয়াতে মহান আল্লাহ তাঁর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত সব বিষয়াদি উম্মতকে পৌঁছানোর নির্দেশ প্রধান করেছেন। নবীজী সা. তাঁর প্রতি অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনও করেছিলেন। বিদায় হজ্জের ভাষণ দানকালে সে কথার সাক্ষও দিয়েছিলেন। এখান থেকে বোঝা যায়, যারা নবীর ওয়ারিস তাদেরও দায়িত্ব মহান আল্লাহর নাজিলকৃত সব বিধি-বিধান উম্মতের কাছে পৌঁছানো। কোনোটি বাদ না দেয়া। কালামে পাকের বহু আয়াতে নবীজী সা. কে জান্নাতের সুসংবাদ দাতা এবং জাহান্নামের ভয় প্রদর্শনকারী রূপে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আবার কোন কোন আয়াতে বলা হয়েছে, নবীজী সা. এর দায়িত্ব সত্যকে স্পষ্ট করে উত্তমরূপে তুলে ধরা। সূরা ইবরাহিমের ৪নং আয়াতেও এটি বিবৃত হয়েছে। আরো বহু আয়াত দ্বারা বোঝা যায়- কুফরী শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নির্র্দেশ দিয়ে নবীজী সা. কে প্রেরণ করা হয়েছে। সূরা তওবার ৩৩ এবং সূরা সফ এর ৯নং আয়াতে নবীজী সা. কে প্রেরণ করার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে- “তিনি আল্লাহ যিনি তাঁর রাসূলকে হেদায়েত ও সত্য দীনসহ প্রেরণ করেছেন। যেন ইসলামকে অন্যসব দীনের ওপর বিজয়ী করা হয়। মুশরিকরা তা অপ্রীতিকর মনে করুক না কেন ”। আল্লাহর বিধানানুসারে ইনসাফ ও ন্যায়ভিত্তিক বিচারব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা- যা সূরা নিসার ১০৫ নং আয়াতে বিবৃত হয়েছে। মানুষের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত হিদায়াত ও দিক-নির্দেশনা তথা জীবন বিধানকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণসহ সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দেওয়া, কর্মময় জীবনে তা বাস্তবায়ন করে দেখিয়ে দিয়ে তার সম্ভাব্যতা, কার্যকরিতা ও সুফলকে সুস্পষ্ট করে দেওয়া। যা সূরা নাহলের ৪৪নং আয়াতে বিবৃত হয়েছে।

নবীজী সা. এর মিশন
নবীজী সা. এর মিশন মানব জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগে পরিব্যপ্ত অভূতপূর্ব সংস্কার আন্দোলন। আধ্যাত্মিক, নৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি সকল বৈশিষ্টের অধিকারী একটি ব্যাপক ও সর্বাত্মক আন্দোলন।

সে সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
রাজনৈতিক দিক থেকে তখন পারস্য ও রোম এই দু’টি শক্তি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিল। পারস্যের ধর্মমত ছিল অগ্নিপূজা। এর প্রতিপত্তি ছিল ইরাক থেকে ভারতের সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত। আর রোমের ধর্ম ছিল খ্রিস্টবাদ। এটি গোটা ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকাকে পরিবেষ্টন করে ছিল। ভারতের ধর্মীয় ইতিহাসে এই যুগটিকে সবচেয়ে অন্ধকার যুগ বলে গণ্য করা হতো। এ যুগে শিরকের চর্চা মাত্রাতিরিক্ত রকমে বেড়ে গিয়েছিল। দেবতাদের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে ৩৩ কোটি পর্যন্ত পৌঁছেছিল।১২
আরবের লোকজন কোন এক ধর্মের অনুসারী ছিলো না; বরং নাস্তিকতা, খ্রিস্টবাদ, ইহুদিবাদ, শিরক ইত্যাদি সমস্ত ধর্মসমূহের প্রচলন আরব দেশে ছিল। কুদরতের প্রতিটি বিস্ময়কর বস্তুর তারা পূজা করতো। মিষ্টির উপাদান দ্বারা নির্মিত মূর্তির পূজা করে অবশেষে ভেঙে খেয়ে ফেলতো। ইহুদীদের মধ্যে সুদ-ঘুষ, অত্যাচার, লোভ-লালসা সাধারণ ব্যাপার ছিল।১৩

নবী আগমনের জন্য আরব কেন উপযুক্ত ছিল
১. নবীজী সা. এর দাওয়াত গোটা দুনিয়ায় প্রচারিত হওয়া প্রয়োজন ছিল। আর এজন্য একটি পুণ্যবান বিপ্লবী কাফেলার তৈরী করাও খুব দরকার ছিল। যে কাফেলা তাঁর মিশনকে অব্যহত রাখবে। আর এই কাফেলার যে সব গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজন, তা আরবদের মাঝে বিদ্যমান ছিল।
২. আরবের ভৌগলিক অবস্থান দুনিয়ার জনবসতিপূর্ণ এলাকার কেন্দ্রস্থল। এ কারণে এখান থেকে নবীজীর দাওয়াত চারদিকে প্রচার করা সুবিধাজনক ছিলো।
৩. আরবী ভাষার একটি অতুলনীয় বিশেষত্ব ছিলো।
৪. আরবরা ছিলো দুর্ধর্ষ প্রকৃতির বীর জাতি। বিপদাপদকে তারা কোন পরোয়া করতো না। স্বভাবগতভাবে তারা ছিলো শক্তিবান; যুদ্ধ বিগ্রহকে তারা খেল-তামাশা মনে করতো।

আন্দোলন শুরু যেভাবে
দাওয়াত ও আন্দোলন কীভাবে কোন মাধ্যমে শুরু হবে তা অসীম জ্ঞান-ভা-ারের মালিক আল্লাহ নিজেই ঠিক করে দিয়েছেন। নবীজী সা. দাওয়াতী কার্যক্রম যখন শুরু করেন তখন উত্তরাঞ্চলের সিরিয়া রোমদের দখলে ছিল। আর দক্ষিণাঞ্চলের ইয়ামান ছিল সা¤্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। নবীজী সা. আরবদের মাঝে এমন বিশ্বস্ত ছিলেন যে, তিনি যদি তখন আরব জাতীয়তাবাদের ধোয়া তুলে ঐক্যের ডাক দিতেন তাহলে কুরাইশগণ খুব সহজেই সেই ঐক্যের ডাকে সাড়া দিতেন। নবীজী সা. এর দাওয়াত পরিচালনাকালে আরবে সুবিচার ছিল অনুপস্থিত। স্বল্প সংখ্যক লোক সকল সম্পদ ও ব্যবসা বাণিজ্য কুক্ষিগত করে সুদি কারবারের মাধ্যমে তা বাড়িয়ে চলছিলো। বিপুল সংখ্যক দেশবাসী দরিদ্র ও ক্ষুধার্ত ছিল। তাদের মানবীয় মর্যাদাই ছিল না। তখন নবীজী সা. সমাজের সম্পদশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার মাধ্যমে একটি সামাজিক বিপ্লব আন্দোলন পরিচালনা করতে পারতেন। অত্যাচার নির্যাতন ছিল সে সমাজের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। মদপান ও জুয়া সামাজিক প্রথার মধ্যে শামিল ছিল। ব্যভিচার প্রচলিত ছিল। নবীজী সা. চারিত্রিক মানোন্নয়ন, সমাজ শুদ্ধিকরণ কর্মসূচি নিয়ে নৈতিক সংস্কারের একটি আন্দোলন শুরু করতে পারতেন। কিন্তু নবীজী সা. এসব কোন পদ্ধতি গ্রহণ না করে মহান আল্লাহ তা’আলার আদেশে একমাত্র ঈমানের ভিত্তিতেই নৈতিকতা গঠনের কাজ শুরু করলেন। ঈমানকেই একমাত্র ভাল-মন্দের মানদ- ও নৈতিক মূল্যবোধ নির্ধারক হিসেবে বিবেচনা করলেন।

আন্দোলনের প্রথম ধাপ মক্কী জীবন
‘ইকরা বিসমি রাব্বিকা’ এর মাধ্যমে ওহীর সূচনা হওয়ার দীর্ঘ একমাস পর মহান আল্লাহ তা’আলা নবীজী সা. কে নির্দেশ করেন- “হে বস্ত্রাবৃত! ওঠো, লোকদেরকে সতর্ক কর। তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর। তোমার পরিচ্ছদ পবিত্র রাখ। অপবিত্র থেকে দূরে থাক।১৪
অর্থাৎ হে কম্বল জড়ানো ব্যক্তি! আপনার কম্বল জড়িয়ে শয্যা গ্রহণের অবকাশ কোথায়। আপনার প্রতি আল্লাহর দীনকে প্রতিষ্ঠা করার এক বিরাট দায়িত্ব চাপানো হয়েছে, আপনি উঠুন। আমার একত্ববাদ প্রচার করুন এবং যারা আমার সত্তায়, গুণে ও ক্ষমতায় আমার সাথে অন্য বস্তুকে শরিক করে তাদেরকে এর ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করুন। আপনার শয়ন করার সময় নেই। নবী কারীম সা. এর প্রতি এ নির্দেশ এমন এক সময় ও পরিবেশে অবতীর্ণ হয়, যখন মক্কাসহ সমগ্র আরবের লোক ও জনপদগুলো শিরক এর দুর্গন্ধময় কূপে নিপতিত ছিল এবং তিনি ছিলেন একাকী। তাঁর সঙ্গী-সাথী কেউই ছিল না। এহেন পরিবেশে সর্বজন বিরোধী একটি মতাদর্শ নিয়ে দ-ায়মান হওয়া এবং তা জনসম্মুখে প্রচার করা কত বড় ঝুঁকির ব্যাপার ছিল তা একটু চিন্তা করলেই বোধগম্য হয়। এমন পরিবেশের মধ্যেই আল্লাহ বললেন, আপনি তৌহিদের পতাকা নিয়ে দ-ায়মান হোন এবং মানুষকে তৌহিদের পরিপন্থী আকীদা-বিশ্বাসের ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করতে থাকুন। এটাই আপনার প্রথম কাজ।১৫

মক্কী জীবনের চারটি স্তর
মক্কী জীবনের প্রথম স্তর- তিন বছরের সময়কাল। এসময়ে দাওয়াতের কাজ গোপনে গোপনে আঞ্জাম দেওয়া হয়। হযরত খাদিজা রা., হযরত আবু বকর, হযরত আলী, হযরত বেলাল রা. সহ ত্রিশজন মুসলমান হন।
মক্কী জীবনের দ্বিতীয় স্তর : আদেশ এলো প্রকাশ্য দাওয়াতের। “হে নবী! তুমি তোমার নিকটাত্মীয়বর্গকে সতর্ক কর”।১৬
উপর্যুক্ত নির্দেশ পালনের জন্য নবীজী সা. দুটি সমাবেশের আয়োজন করেন। এ সম্পর্কে হাদিসের কিতাবসমূহে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।১৭ দ্বিতীয় স্তরের মেয়াদ দু’বছর। এ সময়ে ঠাট্টা-বিদ্রƒপ করে, নানারূপ অপবাদ দিয়ে, মিথ্যা প্রতারণা চালিয়ে এবং বিরুদ্ধ কথাবার্তা বলে আন্দোলনকে দমিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়। দ্বিতীয় স্তরে মুশরিকরা ইসলামী আন্দোলনকে দমানোর জন্য চার ধরণের ষড়যন্ত্র করেছিল। যা কুরআনে পাকে বিবৃত হয়েছে।
(এক) ঠাট্টা-বিদ্রƒপ। যা কুরআনে এভাবে বিবৃত হয়েছে- “কাফিররা বলল, হে ঐ ব্যক্তি! যার প্রতি কুরআন নাযিল করা হয়েছে, তুমি তো পাগল।”১৮
“আর ঐ কুরাইশী কাফেররা এই কথায় বিস্মিত হল যে, তাদের নিকট তাদেরই মধ্য থেকে একজন ভয় প্রদর্শকরূপে আগমন করেছেন এবং তারা বলতে লাগল এই ব্যক্তি যাদুকর, মিথ্যাবাদী।”১৯
“আর কাফেররা যখন কুরআন শোনে, তখন তারা আপনাকে এমন দৃষ্টিতে দেখে মনে হয় যেন তারা আপনার মূলোৎপাটন করে ফেলবে। আর বলে যে, এই ব্যক্তি পাগল।”২০
“আরে, এরাই নাকি সে ব্যক্তি; আমাদের মধ্য হতে যাদের ওপর আল্লাহ করুণা করেছেন।”২১
(দুই) জনমনে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি। যা কুরআনে এভাবে বিবৃত হয়েছে- “আর তারা বলে থাকে যে, এটা পূর্বকালের উপাখ্যান; যা এই ব্যক্তি অন্যের কাছ থেকে লেখে নিয়েছে। আর তাই সে সকাল-সন্ধা পাঠ করে থাকে।”২২
“এটা মিথ্যা ব্যতীত আর কিছুই নয়, যা সে রচনা করে নিয়েছে। এ জন্য তাঁকে অন্য কিছু লোকজন সাহায্য করেছে।”২৩
“নিশ্চয় মুহাম্মদ কে এটা (কুরআন) কোন একজন মানুষ শিক্ষা দেয়।”২৪
“ইনি কেমন রাসূল, যিনি খাওয়া-দাওয়া করেন এবং হাটে-বাজারেও চলাফেরা করেন।”২৫
(তিন) ধূম্রজাল তৈরী। যা কুরআনে এভাবে বিবৃত হয়েছে- “লোকদের মধ্যে কিছু লোক এমন আছে, যারা খেল-তামাশার কথাবার্তার মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর পথ হতে বিভ্রান্ত করার প্রচেষ্টা চালায়।”২৬
(চার) আপোস-রফার কৌশল। যা কুরআনে এভাবে বিবৃত হয়েছে- “তারা চায় যে, নবী কারীম সা. যদি কিছুটা নমনীয় বা শিথীল হয়ে যান, তাহলে তারাও নমনীয় হবে।”২৭
ইবনে জারীর ও তাবরানীর এক বর্ণনায় রয়েছে যে, মুশরিকগণ নবীজী সা. এর নিকট প্রস্তাব পেশ করলো যে, যদি তিনি এক বছর যাবৎ তাদের মা’বুদের পূজা অর্চনা করেন, তাহলে তারাও নবীজী সা. এর মা’বুদের ইবাদত করবে। আব্দ বিন হুমায়েদ থেকে একটি বর্ণনা এভাবে এসেছে- “মুশরিকগণ প্রস্তাব করলো যে, যদি আপনি আমাদের মা’বুদকে গ্রহণ করেন, তবে আমরাও আপনার খোদার ইবাদত করবো।”২৮
রাজনৈতিক দৃষ্টিতে এটা ছিলো খুবই লোভনীয় প্রস্তাব। কিন্তু রাসূলে কারীম সা. প্রস্তাবটি গ্রহণ করলেন না। কারণ ইসলামের জন্যে ময়দান তৈরি না করে বাতিলের সাথে আপোষক্রমে ক্ষমতায় গেলেও ইসলাম কায়েম হতে পারে না।
মক্কী জীবনের তৃতীয় স্তর : মুশরিকদের চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও ইসলামী আন্দোলন যখন দৃঢ়ভাবে অগ্রসর হতে থাকে, তখন জুলুম-নির্যাতনের ধারা শুরু হয়। মুসলমানদের ওপর নিত্য-নতুন জোর-জুলুম চলতে থাকে। এ অবস্থা প্রায় পাঁচ-ছয় বছরকাল অব্যহত থাকে।
মক্কী জীবনে চতুর্থ স্তর :আবু তালিব ও হযরত খাদীজা রা. এর ওফাতের পর থেকে হিজরত পর্যন্ত প্রায় তিন বছর। এ স্তরটি হযরত মুহাম্মদ সা. এবং তাঁর সঙ্গীদের জন্য অত্যন্ত কঠিন সংকটকাল ছিলো।

প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া
এ পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলন যতটুকু অগ্রসর হয়েছিল তার প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া বিভিন্নভাবে প্রকাশ পায়।
১. কিছু সৎ লোক এ আন্দোলনকে কবুল করলো। তারা সংঘবদ্ধভাবে এ আন্দোলনকে যে কোন মূল্যে এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রস্তুত হলো।
২. এমন কিছু যোগ্য নেতৃত্ব ও দক্ষ কর্মীবাহিনী তৈরী হলো, যাঁরা ঈমানের বলে বলীয়ান, নৈতিকতার মানে উন্নীত, তাওয়াক্কুলে দৃঢ়। যারা হাজারো নির্যাতনের মুখেও ঈমান ত্যাগ করবেনা। নবীজী সা. এর নির্দেশে নিজের মাতা-পিতা, সন্তান-সন্ততি, ঘর-বাড়ী, ধন-দৌলতসব কিছু ত্যাগ করতে প্রস্তুত। তাঁরা এত বেশি উৎসর্গপ্রাণ ছিলো যে, নবীজী সা. তাদের থেকে জীবন চাইবেন আর তারা তা দিবেনা সেটা ছিল কল্পনাতীত। এমন অসংখ্য ঘটনা সীরাতের কিতাবে বিদ্যমান।
৩. হযরত উমর, হযরত হামযা রা. সহ প্রভাবশালীদের ইসলাম গ্রহণের কারণে মুশরিকদের মনোবল ভেঙে যেতে থাকলো।
৪. মক্কা ও কুরাইশদের গ-ি অতিক্রম করে এ আন্দোলন অপেক্ষাকৃত বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়লো।
৫. তবে অজ্ঞতা, ব্যক্তিস্বার্থ কিংবা বাপ-দাদার অনুসৃত ধর্মের প্রতি অন্ধবিশ্বাস হেতু বহুলোক এ আন্দোলনের বিরোধীতার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো। এক কথায় জাহেলিয়াত ও ইসলামের মধ্যে, দেব-দেবীর সন্তান এবং আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দাদের মাঝে সংঘাত শুরু হলো।

মক্কী জীবনে আন্দোলন কিভাবে অগ্রসর হলো
এ সময়ে যে সমস্ত সূরা নাযিল হয়, তার বিষয়বস্তু, নির্দেশাবলী ও শিক্ষাগুলো সামনে রাখলে এ পর্যায়ে আন্দোলনকে কোন কোন অবস্থার ভেতর দিয়ে এগোতে হয়েছে, তা অনেকটাই অনুমান করা যায়। এই দীর্ঘ ও কঠিন সংঘাতকালে আল্লাহ তা’আলা যে সব কালাম নাযিল করেন, সে সবের বক্তব্য ও বর্ণনাভঙ্গি অত্যন্ত আবেগময় এবং প্রভাবশীল। এতে ঈমানদারগণকে তাদের কর্তব্য-কর্ম বাতলে দেয়া হয় এবং তার ওপর অবিচল থাকার নির্দেশ দেয়া হয়। তাদের ব্যক্তি-চরিত্রকে উচ্চ থেকে উচ্চতর মানে উন্নীত করার পদ্ধতি বলে দেয়া হয়। তাকওয়া ও পরহেজগারী রপ্ত করা এবং অধিক পরিমাণে এ গুণটি অর্জন করার ওপর জোর দেয়া হয়। নৈতিক চরিত্রের সমুন্নতি এবং আদত-অভ্যাস সংশোধনের জন্য তাগিদ দেয়া হয়। লোকদের মধ্যে সংগঠনী চেতনা উজ্জীবিত করে সমষ্টিগত চরিত্রের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। দীন-ইসলাম প্রচারে সঠিক পন্থা বাতলে দেওয়া হয় এবং কঠিন ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ধৈর্য ধারণ করার জন্য বারবার তাগিদ দেওয়া হয়। সাফল্যের ওয়াদা এবং জান্নাতের সুসংবাদ দিয়ে লোকদের মনোবল বৃদ্ধি করা হয়। দীন-ইসলামের বন্ধুর পথে অবিচল থাকা এবং হিম্মতের সঙ্গে আল্লাহর পথে অব্যাহত সংগ্রাম চালিয়ে যাবার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়। সর্বোপরি লোকেরা যাতে দুঃখ-মুসিবত ও নির্মমতা বরদাশত করতে সক্ষম হয়, সেজন্য তাদের মধ্যে আত্মত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের উদ্দীপনার সঞ্চার করা হয়। পক্ষান্তরে বিরুদ্ধবাদী অর্থাৎ আল্লাহর দীনের প্রতি বিরূপ লোকদেরকে ও তাদের শোচনীয় পরিণতি সম্পর্কে বারবার সতর্ক করে দেয়া হয়। এ ধরণের গাফিলতি ও অবিশ্বাসের কারণে ইতোপূর্বে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিসমূহের শিক্ষামূলক ঘটনাগুলো তাদেরকে বারবার শোনানো হয়। (এ সমস্ত ঘটনার কথা খোদ আরবরাও কম বেশি অবহিত ছিলো)। যে বিরাট জনপদের ওপর দিয়ে তারা দিনরাত যাতায়াত করতো, সেগুলোর ধ্বংসাবশেষের দিকে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। পরন্তু তারা জমিন ও আসমানে দিনরাত যে সব সুস্পষ্ট নিদর্শন প্রত্যক্ষ করেছিলো, সেগুলোর সাহায্যে তাওহিদ ও আখেরাতের দলীল-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়। শিরকের অনিষ্টতা ও ভয়াবহ পরিণতি সুস্পষ্ট ভাষায় বিবৃত করা হয়। খোদার বিরুদ্ধে বিদ্রোহাত্মক ভূমিকা গ্রহণের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে দেওয়া হয়। আখিরাতের প্রতি অবিশ্বাসের ফলে জীবনে যে বিকৃতি ও বিপর্যয় দেখা দেয়, সে সম্পর্কে খোলাখুলিভাবে বুঝিয়ে দেয়া হয়। বাপ-দাদার অন্ধ অনুসৃতির ফলে মানবতার যে অপূরনীয় ক্ষতি সাধিত হয়, তার প্রতিও আঙ্গুল দিয়ে নির্দেশ করা হয়। আর এসব কথা এমন অকাট্য দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতে বিবৃত করা হয় যে, একটু তলিয়ে চিন্তা করলেই তা মনের গভীরে দৃঢ়ভাবে বদ্ধমূল হয়ে যায়।

মাদানী জীবন
নববী জিম্মাদারী ও দায়িত্বসমূহের মাঝে আল্লাহর বিধানানুসারে ইনসাফ ও ন্যায়ভিত্তিক বিচারব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলাও একটি অন্যতম দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনের তাগিদে নবীয়ে কারীম সা. মক্কার জীবনে সুস্থ সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা শুরু করেন। কিন্তু বিরুদ্ধবাদী কায়েমী স্বার্থবাদীদের কূট-ষড়যন্ত্র ও ঔদাসিন্যের কারণে তা সফল হয়নি। তবে এই কর্মপ্রচেষ্টার ফলে সুস্থ সমাজ গড়ে তোলার চেতনা দ্বারা একদল মানুষ অনুপ্রাণিত হয়ে আদর্শিক ভিত্তিতে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। মক্কার জমীনকে তাঁর মিশন সফল করার জন্য প্রাথমিকভাবে অনূকূল মনে না হওয়ায় তিনি তাঁর অনুসারীদের নিয়ে ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদীনায় হিজরত করেন। মদীনার পরিবেশ তাঁর জন্য খানিকটা অনুকূল হলেও মক্কার মুশরিকদের পক্ষ থেকে যে কোন সময় আক্রান্ত হওয়ার ভয় ছিল। তদুপরি বিরুদ্ধবাদী শক্তি তথা ইয়াহুদী, পৌত্তলিক, মুশরিক ও মুনাফিকদের বিদ্বেষ থেকে মুসলমানরা মোটেই শংকামুক্ত ছিলনা। এজন্য মদীনায় আগমনের পর মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুসলমানদের ধর্মীয় ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার একটি কেন্দ্র স্থাপিত হওয়ার পর পরই তিনি মদীনায় সামাজিক সংহতি গড়ে তোলার প্রতি বিশেষভাবে মনোনিবেশ করেন। মদীনায় সুষ্ঠু সমাজ গড়ার লক্ষে আনসার ও মুহাজিরসহ মদীনায় বসবাসরত অপরাপর গোত্রসমূহকে নিয়ে তিনি একটি শান্তি প্রক্রিয়া গড়ে তোলার প্রাথমিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং গোত্রসমূহের পারস্পরিক আচরণবিধি সংক্রান্ত একটি সাধারণ চুক্তিনামা প্রণয়ন করেন। যা ইতিহাসে মদীনা সনদ নামে পরিচিত। উক্ত সনদের ৫৩টি ধারা ছিল।২৯

মদীনায় ক্ষুদ্র রাষ্ট্র
ঐতিহাসিক মদীনা সনদ ঘোষণার মধ্য দিয়ে অতিক্ষুদ্র পরিসরে মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্রের অঘোষিত শুভসূচনা হয়। যেখানে রাসূল সা. এর নির্দেশেই যাবতীয় কাজ-কর্ম আঞ্জাম পেতে শুরু করে। মদীনা সনদের মাধ্যমে যে সব বিষয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেগুলোর আলোকে চিন্তা করলে ইসলামী রাষ্ট্রের মৌলিক উদ্দেশ্যসমূহ নি¤েœাক্ত শিরোনামে প্রকাশ করা যায়।
১. আল্লাহর আধিপত্য রাসূল সা. এর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করা।
২. ইসলাম ও মুসলমানদেরকে অন্যান্য ধর্ম ও ধর্মাবলম্বীদের ওপর শক্তিশালী ও বিজয়ী করা।
৩. বহিঃশত্রুর আক্রমণকে প্রতিহত করা এবং দেশের সীমান্ত রক্ষা করা।
৪. নাগরিকদের জান-মাল ও অধিকার সংরক্ষণ করা এবং জুলুম ও অন্যায়কে প্রতিহত করা।
৫. ন্যায়ভিত্তিক বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা এবং প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার যথাপ্রাপ্য অধিকার প্রদান করার মাধ্যমে আদল ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা।
৬. শরীয়তের নির্ধারিত শাস্তির বিধান ও ইসলামী আইন দেশের সর্বত্র বাস্তবায়ন ও কার্যকর করা।
৭. কল্যাণ ও তাকওয়ার কাজে পরস্পরে সহযোগিতা করা।
৮. আল্লাহর নামকে সর্বত্র বুলন্দ করার উদ্দেশে আল্লাহর পথে দাওয়াত ও জিহাদের কাজ অব্যাহত রাখা।

তেরো বৎসরের কর্মময় জীবনে নবুয়তের মূল মিশন এগিয়ে নেয়ার সাথে সাথে তিনি রাষ্ট্রীয় কাঠামোও গড়ে তুলেছেন, প্রশাসন ব্যবস্থাও বিন্যস্ত করেছেন, যুদ্ধ-বিগ্রহও চালিয়ে গেছেন, নাগরিকদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বিধান, শিক্ষা-দিক্ষার উন্নয়ন, নৈতিক মানোন্নয়ন, আধ্যাত্মিক চেতনার বিকাশ ইত্যাদি ক্ষেত্রেও অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছেন। এসময়ের মাঝে তিনি মোট ২৭টি মতান্তরে ২৮টি গাযওয়া (নিজে যে যুদ্ধের অধিনায়ক থেকেছেন) এবং ৫৬টি সারিয়া (নিজে যে যুদ্ধে উপস্থিত থাকেননি) যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। যার বিস্তারিত বিবরণ ইতিহাসের গ্রন্থসমূহে বর্ণিত আছে। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত ২৭টি গাযওয়ার মাঝে মোট ৯টিতে যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

বদরপূর্ব অভিযান
মদীনা সনদ সম্পাদিত হওয়ার পর রাসূল সা. মদীনার সুরক্ষার প্রতি সবিশেষে মনোনিবেশ করেন এবং রাষ্ট্রসীমার অভ্যন্তরে বহিঃশত্রুর অনুপ্রবেশ ঠেকানোর ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেন। বিশেষ করে শক্তিশালী কুরাইশরা যাতে কোনভাবেই মদীনায় অনুপ্রবেশ করতে না পারে এবং তারা যেন বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে মদীনার রাষ্ট্রসীমার ভেতর দিয়ে সিরিয়া গমনাগমন না করতে পারে এ ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকতেন। যখনই খবর পেতেন যে, মক্কার কোন কাফেলা মদীনার ভূখ- অতিক্রম করছে তখনই তাদের পিছু ধাওয়া করতেন। এভাবে হিজরতের ১৮ মাসের মধ্যে তিনি ৮টি অভিযান পরিচালনা করেন। এই অভিযানগুলোর মাধ্যমে কুরাইশদের সন্ত্রস্ত করে রাখা যেমন উদ্দেশ্য ছিল তেমনিভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিম বাহিনীর সামরিক মহড়া প্রদর্শনের মাধ্যমে মদীনার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বসবাসরত গোত্রসমূহকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যও নিহিত ছিল।

বদর যুদ্ধ ও তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব
৬২৪ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে (২য় হিজরীর রমযান মাসে) সংঘটিত হয় বদর যুদ্ধ। এ যুদ্ধে প্রতিপক্ষ মক্কার কুরাইশদের ওপর মুসলমানদের বিজয় মদীনা কেন্দ্রীক ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটির প্রভাব-বলয়ে বেশ সম্প্রসারণ ঘটে। এ যুদ্ধ মুসলিম উম্মার বিস্তৃতির ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে কাজ করে। কারণ মক্কার শক্তিশালী অভিজাততন্ত্রের বিরুদ্ধে দুর্বল ও সহায়-সম্বলহীন মুসলিম বাহিনীর একচ্ছত্র বিজয় সমগ্র আরব ভূখ-ে সাড়া ফেলে দেয় এবং গোটা আরব বিস্ময়ে স্থবির হতবাক হয়ে পড়ে। এ যুদ্ধের ফলে নি¤েœাক্ত প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। যথা-
১. মদীনার রাষ্ট্রের ভীত সুদৃঢ় হয় এবং অত্র অঞ্চলে তার নেতৃত্ব দৃঢ় ভিত্তি লাভ করে। আরব উপদ্বীপে মুসলিম উম্মাহর বলিষ্ঠ কেন্দ্র গড়ে উঠে।
২. কুরাইশদের মর্যাদা ও সামরিক শক্তির বিপুল ক্ষতি সাধিত হয় এবং মনস্তাত্বিকভাবে তারা দুর্বল হয়ে পড়ে।
৩. আরবদের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী গোত্রসমূহের কাছে মদীনার রাষ্ট্র ও নবী কারীম সা. এর গুরুত্ব ও মর্যাদা দারুনভাবে বেড়ে যায় এবং বহু গোত্র মদীনার রাষ্ট্র ও নবী সা. এর আনুগত্য স্বীকার করে নেয়।
৪. ইতিপূর্বে যেসব গোত্রের সাথে রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তা আরো সুদৃঢ় হয়।
৫. পরাজিত মক্কার মুশরিক শক্তির মাঝে প্রতিশোধ স্পৃহা প্রবল হয় এবং তারা যে কোন মূল্যে মুসলিম বাহিনীকে নিস্ত-নাবুদ করে ফেলার জন্য উঠে-পড়ে লেগে যায়। এজন্য তারা বিভিন্ন গোত্রের সাথে সন্ধি-চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এমনকি তারা মদীনার ইয়াহুদীদের সাথেও সম্পর্ক গড়ে তোলে।
৬. মদীনার ইয়াহুদীরাও মুসলিম বাহিনীর শক্তিমত্তার বিষয়টি অবলোকন করে অন্তরে অন্তরে শংকিত হয়ে পড়ে এবং ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহকে সমূলে উৎপাটনের জন্য উঠে-পড়ে লেগে যায়। তারা মক্কার কুরাইশদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে। এমনকি ইয়াহুদী কবিরা মক্কায় গিয়ে বদরে মৃতদের জন্য সমবেদনা প্রকাশ করতে মর্ছিয়া গায় এবং কুরাইশদেরকে এর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য কৌশলে অনুপ্রাণিত করতে চেষ্টা করে। বস্তুতঃ বদরের যুদ্ধের মাঝ দিয়ে মদীনাকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটি একটি শক্তিশালী ভিত্তি লাভ করে। গোটা আরবের লোক অবাক বিস্ময়ে এই রাষ্ট্রটির দিকে চোখ তোলে তাকাতে শুরু করে। কারণ দাপটশালী কুরাইশদেরকে পরাজিত করা সে তো চাট্টিখানি কথা নয়। তারা এই নতুন রাষ্ট্রটির শক্তির উৎস সন্ধানে ব্রত হয়। অপরপক্ষে কায়েমী স্বার্থবাদীরা ‘গজিয়ে’ ওঠা এই নতুন শক্তিকে নির্মূল করার ফন্দি-ফিকিরে লেগে যায়। এসময় রাসূল সা. কে যে ধরণের বৈরি শক্তির মোকাবেলা করতে হচ্ছিল। যথা-
১. মদীনার বাইরের বিস্তীর্ণ ভূখ- জুড়ে বিদ্যমান মুশরিক শক্তি।
২. মদীনার অভ্যন্তরে অমুসলিম শক্তি; তাদের মাঝে ইয়াহুদীরাই ছিল অন্যতম।
৩. মুসলিম নামধারী মুনাফিকদের শক্তি। যারা মুসলিম বাহিনীর শক্তিমত্তা দেখে ভীত-সন্ত্রস্ত ছিল; আবার যদি বিরোধী শক্তি বিজয়ী হয়ে যায় এই আশংকায় দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। ফলে এরা দু’মুখো সাপের ন্যায় দুপক্ষের সাথেই নিজেদের যোগাযোগ রক্ষা করে নিজেদের আখের গোছাবার ফিকিরে লিপ্ত ছিল।

বনু কায়নুকা অভিযান
বদর যুদ্ধে মহা বিজয়ের পর নবীজী সা. বনু কায়নুকার প্রতি মনোনিবেশ করলেন। নবীজী সা. দ্বিতীয় যিলকদ মাসে ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে বনূ কায়নুকাকে অবরোধ করার নির্দেশ দিলেন। কেননা তারা মদীনা সনদের শর্ত ভঙ্গ করে কার্যতঃ রাষ্ট্রদ্রোহীতায় লিপ্ত হয়েছিল। মুসলমানরা তাদেরকে ১৫ দিন অবরোধ করে রাখে। মুসলিম বাহিনীর মোকাবেলা করতে তারা সাহস হারিয়ে ফেলে। অগত্যা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। রাসূল সা. সাহাবীগণের সঙ্গে পরামর্শক্রমে তাদেরকে মদীনা থেকে উচ্ছেদের নির্দেশ দেন।

উহুদ যুদ্ধ ও তাঁর রাজনৈতিক ফলাফল
মক্কার মুশরিকরা আবার শক্তিসঞ্চয় করে ৩য় হিজরীর শাওয়াল মাসে (৬২৫ খ্রি. মার্চ মাসে) পুনরায় মদীনা আক্রমণে আসলে উহুদের যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। এ যুদ্ধে মুসলমানদের সাময়িক পরাজয় ঘটে। এ পরাজয়ের ফলে মুসলিম বাহিনীর নিকট এ বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, এ যুদ্ধে পরাজয়ের মূল কারণ ছিল নি¤œরূপ-
১. যুদ্ধের স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাসূল সা. ও মদীনার অভিজ্ঞ মহলের সিদ্ধান্তের সাথে মতানৈক্য।
২. যুদ্ধ সমাপ্ত ঘোষণা করা এবং শত্রুপক্ষের পরাজয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার আগেই গনিমতের মাল সংগ্রহের ব্যাপারে মত্ত হয়ে পড়া।
৩. তীরান্দাজ বাহিনী রাসূল সা. এর নির্দেশ পরিপূর্ণভাবে মান্য না করা।
নবীজী সা. সাহাবায়ে কেরামের মনোবল চাঙ্গা করার জন্য উহুদ যুদ্ধের পর দিন এক কাফেলা নিয়ে কুরাইশ বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবন করেন; যাতে তারা পুনরায় মদীনার দিকে অগ্রসর হতে না পারে। এতে মুসলিম বাহিনীর মনোবল চাঙ্গা হয়। অন্যদিকে কুরাইশসহ এতদাঞ্চলের অপরাপর গোত্রগুলোও অনুধাবন করতে পারে যে, মুসলিম বাহিনীর শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়নি।

বনূ নাযির অভিযান
মদীনায় বসবাসরত ইয়াহুদীগোত্র বনূ নাযির উহুদ যুদ্ধে মুশরিকদের পূর্ণ সহযোগিতা করে। নবীজী সা. কে হত্যার ষড়যন্ত্র করে এবং মদীনায় একটি গনঅভ্যূত্থান ঘটানোর ব্যাপারে মুনাফিকদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করে। নবীজী সা. ৪র্থ হিজরীর রবিউল আওয়াল মুতাবিক ৬২৫ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে বনূ নাযিরকে অবরোধ করার নির্দেশ দেন। মুসলিম বাহিনী তাদের অবরোধকে সুদৃঢ় করে ফেলে এবং তাদের সাথে মুনাফিকদের সকল যোগাযোগের পথ রুদ্ধ করে দেয়। ফলে মুসলিম বাহিনীর হাতে তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। নবীজী সা. এদেরকেও মদীনা থেকে উচ্ছেদ করে দেন এবং খায়বারে যেয়ে বসবাস করার নির্দেশ দেন।

আহযাব যুদ্ধ ও মুসলমানদের রাজনৈতিক বিজয়
কুফরী শক্তি নবীজী সা. কে এককভাবে প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। সে মতে ৫ম হিজরীর যিলকদ মোতাবেক ৬২৭ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে তারা ১০হাজারের সুসজ্জিত এক বাহিনী নিয়ে আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে মদীনা অবরোধের জন্য বের হয়। নবীজী সা. পূর্ব থেকে অবগত হয়ে মদীনার যেদিক থেকে তাদের প্রবেশের সম্ভাবনা ছিল, সেদিকগুলোতে খন্দক খনন করিয়ে নিয়ে ছিলেন। তিন হাজার বাহিনী নিয়ে তিনি সে খন্দকের পার্শ্বে অবস্থান গ্রহণ করেন। শত্রু বাহিনী খন্দক অতিক্রম করতে সাহস না পাওয়ায় তারা খন্দকের এই পাড়ে অবস্থান নিয়ে তীরের মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু করে। এ সময়ে বনূ নাযির মদীনায় অবশিষ্ট বনূ কুরায়যার সাথে যেয়ে মিলিত হয়। নবীজী সা. তাদের ওদিকটায় খন্দক খনন করানোর প্রয়োজন অনুভব করেননি। কেননা সেদিকটায় সুদৃঢ় দুর্গ প্রাচীর বিদ্যমান ছিল। বনূ কুরায়যা মদীনা সনদ লঙ্ঘন করে দুর্গের দেওয়াল ভেঙে সেদিক থেকে শত্রুবাহিনীর প্রবেশের সুযোগ করে দেয়। অবশ্য নবীজী সা. আল্লাহর নুসরত ও তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং উদ্ভাবনী প্রখর মেধা খাটিয়ে সম্মিলিত বাহিনীর মাঝে ভাঙ্গন ধরিয়ে দেন এবং ইয়াহুদীদের ব্যাপারে মুশরিকদের অন্তরে সংশয় সৃষ্টি করে দেন। আবার অন্যান্য গোত্রকে কুরাইশদের ব্যাপারে সন্দিহান করে তোলেন। এর ফলে তাদের ঐক্য ভেঙ্গে যায়। পরে আল্লাহর রহমত হিসেবে রাতে প্রচ- শৈতপ্রবাহ শুরু হয়। এতে তাদের অন্তরে শংকা ও ভয় ঢুকে যায় এবং তারা অবরোধ উঠিয়ে যে যার মতো চলে যায়। এরপর আর কখনো তাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া সম্ভব হয়নি। খন্দকের যুদ্ধের এই পরিণতির ফলে কুরাইশদের অবস্থান খুবই দুর্বল হয়ে পড়ে। আরবের অন্যান্য গোত্র কুরাইশদের শক্তিমত্তার প্রতি সন্দিহান হয়ে পড়ে। তাছাড়া গোত্রগুলো এও লক্ষ করতে থাকে যে, মদীনার এই নতুন রাষ্ট্রটির অবস্থান দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে।

বনূ কুরায়যার অভিযান ও তাঁর ফলাফল
সম্মিলিত বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার পর নবী সা. ৫ম হিজরীর যিলকদ (৬২৭খ্রি. মে) মাসে রাষ্ট্রদ্রোহীতা ও বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধে বনী কুরায়যাকে অবরোধ করার নির্দেশ দেন। মুসলিম বাহিনী তাদেরকে অবরোধ করলে তারা আওস গোত্রের নেতা হযরত সা’দ ইবনে মা’আয এর ফয়সালা অনুসারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের শর্তে আত্মসমর্পণ করে। কেননা ইতিপূর্বে তারা আউসের সঙ্গে সন্ধিবদ্ধ ছিল। হযরত সা’দ যুদ্ধের সময় তাদের বিশ্বাসঘাতকতা, শত্রুর সাথে হাত মেলানো এবং দেশকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়ার ন্যায় জঘণ্য অপরাধের কথা বিবেচনা করে তাদেরকে মদীনা থেকে উচ্ছেদ করে দেওয়ার ফয়সালা দেন। বনূ কুরায়যাকে উৎখাতের মধ্য দিয়ে মদীনা ইয়াহুদীদের ন্যায় ষড়যন্ত্র-প্রিয় এক দুষ্ট সম্প্রদায় থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হয়।

হুদাইবিয়ার সন্ধির মাধ্যমে রাজনৈতিক বিজয়
সম্মিলিত বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করারপর নবীজী সা. ইসলামী রাষ্ট্রকে সুসংহত করার প্রতি মনোনিবেশ করেন। সর্বত্র শান্তি প্রতিষ্ঠাই ছিল তাঁর মূল মিশন। বাধ্য হয়েই তাঁকে যুদ্ধের পথ অবলম্বন করতেহয়েছিল। ৬২৮ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মোতাবেক ৬হিজরীর যিলকদ মাসে নবীজী সা. ১৪শত সফর সঙ্গী নিয়ে মক্কার উদ্দেশে রওয়ানা হন। কুরাইশ তাঁকে মক্কায় প্রবেশ করতে বাধা দিলে তিনি হুদায়বিয়া নামক স্থানে অবস্থান গ্রহণ করেন।এখানে কুরাইশদের দূতের সঙ্গে তাঁর কথা-বার্তা বিনিময় হয়। দু’পক্ষের মতবিনিময়ের পর একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কুরআনে কারীম এই সন্ধিকে ‘ফাতহে মুবীন’ বা মহাবিজয় বলে আখ্যায়িত করেছে। এই সন্ধির মাধ্যমে কুরাইশরা আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামী রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে স্বীকার করে নিয়েছিল। এই সন্ধির মাধ্যমে নবীজী সা. মক্কার মুশরিক শক্তি থেকে নিশ্চিয়তা লাভ করে মদীনার ইয়াহুদি শক্তির প্রতি পূর্ণ আত্মনিয়োগ করেন। মুসলমানরা সর্বমহলে ইসলামী আদর্শের ব্যাপারে মতবিনিময়ের সুযোগ লাভ করার কারণে কুরাইশদের দুই প্রধান ব্যক্তিত্ব খালেদ ইবনে ওয়ালিদ ও আমর ইবনুল আ’স সহ বহুলোক ইসলামের ছায়াতলে প্রবেশ করেন। মোটকথা এ সন্ধি মুসলমানদের জন্য এক বিরাট রাজনৈতিক সাফল্যের পটভূমি তৈরি করে এবং এটি মক্কা বিজয়ের পথকে সুগম করে দেয়।

খায়বারের যুদ্ধের রাজনৈতিক ফায়দা
সপ্তম হিজরীর মুহাররাম মাস মোতাবিক ৬২৮ খ্রি. মাঝামাঝি সময়ে অর্থাৎ জুন মাসের এদিকে তিনি ১৪শত সৈন্যের এক বিরাট বাহিনী নিয়ে খায়বার অভিমুখে রওয়ানা হয়ে যান। ইয়াহুদিরা তার আগমন সম্পর্কে অনুমান করার আগেই তিনি তাঁর বাহিনী নিয়ে অতর্কিত খায়বারের দুর্গগুলো অবরোধ করে ফেলেন। খায়বারের দুর্গের সামনে দুই বাহিনীর মাঝে তুমুল লড়াই হয়। মুসলিম বাহিনী জানবাজি রেখে মরণপণ লড়াই করে দুর্গগুলো দখল করে নেয় এবং ইয়াহুদীদেরকে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য করে। ইয়াহুদীদের আত্মসমর্পনের মাঝ দিয়ে আরব উপদ্বীপে ইয়াহুদীদের আধিপত্য চিরতরে শেষ হয়ে যায়। তাদের থেকে পুনঃবিদ্রোহের আর কোন আশংকা না থাকায় নবীজী সা. খায়বার থেকে তাদেরকে উৎখাত না করে বর্গাচাষী হিসেবে সেখানে অবস্থানের সুযোগ দেন। খায়বারের ইয়াহুদীদের আত্মসমর্পনের ফলে উত্তর হিজাযের অন্যান্য নগরী যথা- ফাদাক, ওয়াদীউল কূরা, তায়মা ইত্যাদি অঞ্চলের ইয়াহুদীরাও আত্মসমর্পন করে এবং জিযিয়া কর দেওয়ার শর্তে মুসলমানদের সাথে সন্ধিচুক্তি করে নেয়।

মুতার যুদ্ধ ও তাঁর রাজনৈতিক বিজয়
গাস্গানী সম্রাট ও রোমান স¤্রাটরা নতুন ‘গজিয়ে’ ওঠা এই ইসলামী শক্তির ব্যাপারে খুবই আতঙ্কগ্রস্ত ছিল। গাস্সানী সম্রাট শুরাহবিলের নিকট নবীজী সা. পত্র প্রেরণ করলে সে তাঁর দূত হারেস বিন উমায়েরকে হত্যা করে ফেলে। দূত হত্যা পৃথিবীর কোন আইন সমর্থন করে না। তাই নবীজী সা. তাকে সমুচিত শিক্ষা দিতে ৮ম হিজরীর জমাদিউল আওয়াল মাসে (৬২৯ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর) মদীনা থেকে উত্তর দিকে হিজায ও সিরিয়ার সীমান্তে অবস্থিত মুতা নামক অঞ্চলে এই বাহিনীর রোম ও রোম কর্তৃক নব অধিকৃত গাসসানীদের সম্মিলিত বিশাল বাহিনীর মুখোমুখি হয়। গাসসানীদের সঙ্গে রোমান বাহিনীর এক প্লাটফর্মে সমবেত হয়ে যাওয়ার বিষয়টি মুসলিম বাহিনীর নিকট সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল। ফলে তাদেরকে তাদের চেয়ে বহুগুণ বেশি শক্তিশালী এক বাহিনীর মুখে পড়ে যেতে হয়। মুসলিম বাহিনী আল্লাহর ওপর ভরসা করে তাদের চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী এই বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। প্রচ- লড়াইয়ে তাদের তিন নেতাই শহীদ হয়ে যায়। এমনকি মুসলিম বাহিনী তাদের বেষ্টনীর মাঝে পড়ে যায়। এসময় হযরত খালেদ ইবনে ওয়ালিদ রা. সৈন্য বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তিনি তাঁর রণদক্ষতা বলে যুদ্ধ করতে করতে মুসলিম বাহিনীকে রোমানদের বেষ্টনী থেকে নিরাপদে বের করে নিয়ে আসেন। সৈন্য বাহিনীকে রোমানদের বেষ্টনী থেকে এভাবে নিরাপদে বের করে আনার বিষয়টিকে নবীজী সা. বিরাট সাফল্য বলে আখ্যায়িত করেন এবং এই কৃতিত্বের জন্য হযরত খালেদ রা. কে সাইফুল্লাহ খেতাবে ভূষিত করেন।

মক্কা ও হুনাইন জয়
কুরাইশের মিত্র গোত্র বনু বকর হঠাৎ নবীজী সা. এর মিত্র গোত্র খুজা’আর ওপর আক্রমণ করে বসে। কুরাইশদের কিছু যুবকও বনু বকরকে সাহায্য করে। আর এর মাধ্যমে হুদায়বিয়ার সন্ধির শর্ত লংঘিত হয়। এটাকে নবীজী সা. মক্কা অভিযানের একটি উপযুক্ত সুযোগ বলে মনে করলেন। কেননা তিনি বিভিন্ন সূত্রে অনুমান করতে পেরেছিলেন যে, ভেতরে ভেতরে মক্কা ইসলাম ও মুসলিম বাহিনীকে স্বাগত জানাবার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। তাছাড়া নবীজী সা. ও এতদিনে বিরাট জনসমর্থন ও বিপুল শক্তি সঞ্চয় করে নিয়ে ছিলেন। অবশ্য কুরাইশরা এ ভুল সংশোধনের জন্য চেষ্টা চালায়। তারা এ ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আবু সুফিয়ানকে হুদায়বিয়ার সন্ধি নবায়ন করার জন্য প্রেরণ করেন। কিন্তু আবু সুফিয়ানের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। কারণ নবীজী সা. তার সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান এবং সাহাবীরাও এ ব্যাপারে তাকে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানায়। সুতরাং সে এ ব্যাপারে অনেকটা নিশ্চিত হয়েই মক্কায় ফিরে আসে যে ‘যুদ্ধ হবেই’। নবীজী সা. কুরাইশদের পুনরায় কোন দূত প্রেরণের সুযোগ না দিয়ে সৈন্য বাহিনীকে প্রস্তুত হতে নির্দেশ দেন। আনসার, মুহাজির ও নওমুসলিম গোত্র মিলিয়ে ১০হাজারের বিরাট বাহিনী ৮ম হিজরীর রমযান মাসে (৬৩০ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারী) মক্কার পথে যাত্রা করে। মক্কা প্রবেশের পথে মুসলিম বাহিনী কর্র্তৃক আবু সুফিয়ান ধৃত হয়। সে তখন কুরাইশদের জন্য নিরাপত্তা চাওয়ার উদ্দেশ্যে নবীজী সা. এর সাথে দেখা করার জন্য বের হয়েছিল। ধৃত হয়ে আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণ করে ফেলে এবং নবীজী সা. এর এক ফরমান নিয়ে মক্কায় ফিরে আসে। মক্কায় প্রবেশ করেই নবীজী সা. এর নির্দেশ অনুসারে কুরাইশদের উদ্দেশে এ মর্মে ঘোষণা দেয় যে, যারা বায়তুল হারামে প্রবেশ করবে তারা নিরাপদ; আর যে নিজ গৃহে অবস্থান করে দরজা বন্ধ করে রাখবে সেও নিরাপদ; আর যে আবু সুফিয়ানের গৃহে প্রবেশ করবে সেও নিরাপদ। দু’এক স্থানে ছোট-খাট সংঘর্ষ ব্যতীত মুসলিম বাহিনী বলতে গেলে বিনা যুদ্ধেই মক্কা নগরে প্রবেশ করে। নবীজী সা. মক্কা প্রবেশ করলে সকল প্রতিশোধের অগ্নি দপ করে নির্বাপিত হয়ে যায়। তিনি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। সকল মানুষ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে।

মক্কা বিজয়ের ফলাফল
১. মক্কা বিজয়ের ফলে সমগ্র জাযিরাতুল আরব থেকে মূর্তিপূজার যুগের চির অবসান ঘটে। নবীজ সা. নিজে কাবা ঘরের মূর্তিগুলো ধ্বংস করেন। মুসলমানরা বাড়ি বাড়ি তল্লাশী চালিয়ে প্রত্যেক বাড়ির উপাসনা কক্ষে রাখা মূর্তিগুলোকে ধ্বংস করে দেয়।
২. মক্কা বিজয়ের মাঝ দিয়ে কুরাইশদের সাথে বিরোধিতার অবসান ঘটে। ফলে মুসলিম বাহিনী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ পায়।
৩. মুসলিম বাহিনীর শক্তিমত্তা ও প্রভাব গোটা আরবের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন স্থানে বসবাসরত আরব গোত্রসমূহ ও বেদুঈন সম্প্রদায়গুলো এটা উপলব্ধি করে যে, আরবের শক্তি কেন্দ্র মক্কা থেকে মদীনায় স্থানান্তরিত হয়ে গেছে। এই বাস্তবতা উপলব্ধির কারণেই মক্কা বিজয়ের পরবর্তী বছরগুলোতে বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধি দল মদীনায় উপস্থিত হয়ে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আনুগত্যের প্রকাশ্য স্বীকৃতি দিয়ে যায়। ইবনে সা’দ উল্লেখ করেন যে, ৯ম হিজরীতে প্রায় ৭১টি প্রতিনিধি দল নবীজী সা. এর সাথে দেখা করে আনুগত্য প্রকাশের উদ্দেশ্যে মদীনায় আগমন করে।৩০
৪. মদীনার সরকারের রাজনৈতিক আধিপত্য ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আরো সুদৃঢ় ভিত্তি লাভ করে। সুতরাং রাষ্ট্রের অভ্যন্তর থেকে বিরোধীতা ও বিদ্রোহের পরিবেশ সম্পূর্ণ খতম হয়ে যায় এবং গোটা আরব ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার মাধ্যমে মুক্তির কাফেলায় শরীক হয়ে নিজেদের সৌভাগ্যবান করে তোলে।

মক্কা যখন বিজিত হয়ে যায় তখন তায়েফে বসবাসরত সাকীফ ও হাওয়াযেন গোত্র বুঝতে পারে যে, আরব উপ-দ্বীপে মূর্তিপূজার যবনিকাপাত ঘটে গেছে। যেহেতু মক্কার সাথে তায়েফের যোগসূত্র বিদ্যমান ছিল এবং তারা মক্কার নেতৃবৃন্দের সহযোগী শক্তি বলে গণ্য হত, এ কারণে পরবর্তী আক্রমণ তাদের ওপর হতে পারে একথা অনুমান করে তারা অপরাপর গোত্রসমূহের সাথে সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে নবীজী সা. এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলে। নবীজী সা. এর আক্রমণের পূর্বেই তারা মরণপণ আক্রমণের উদ্দেশে নিজেদের মাল-সম্পদ, পশু-প্রাণী ও সন্তান-সন্ততি সঙ্গে নিয়ে আপন আবাসস্থল থেকে বেরিয়ে আসে। নবীজী সা. এ খবর জানতে পেরে পূর্বোক্ত ১০হাজারের সঙ্গে মক্কা বিজয়ের সময় ইসলাম গ্রহণকারী আরও ২হাজার সর্বমোট ১২হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে হিজরী ৮সালের রমযান মাসের কোন এক প্রভাতের আবছা আলো আঁধারির মাঝে তিহামার নিতটবর্তী হুনায়ন উপত্যকায় গিয়ে পৌঁছেন। এ সময় উপত্যকার দুই পার্শ্বে পূর্ব থেকে অবস্থান গ্রহণকারী হাওয়াযেনের যোদ্ধারা বৃষ্টির ন্যায় তীর বর্ষণ করতে শুরু করে। অতর্কিত এই হামলায় মুসলিম বাহিনী দিক-দিশা হারিয়ে ফেলে এবং কেউ কারো দিকে না তাকিয়ে ময়দান ছেড়ে পালাতে থাকে। পরে নবীজী সা. হযরত আব্বাস রা. কে আনসার ও মুহাজিরদের আহবান করার জন্য নির্দেশ দেন। এই আহবান শুনে অনেকেই নবীজী সা. এর নিকট এসে সমবেত হয়; যেখানে হাওয়াযেনীরা যুদ্ধের ব্যূহ রচনা করে দাঁড়িয়ে ছিল। এরপরে দলে দলে মুসলমানরা ফিরে আসতে থাকে। দু’দলের মাঝে প্রচ- লড়াই হয়। লড়াইয়ের তীব্রতা থেকে হাওয়াযেনীরা কেউ কারো দিকে না তাকিয়ে পালাতে থাকে। অনতিবিলম্বেই তারা আবার নবীজী সা. এর নিকট ফিরে এসে তাদের ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেয়। এভাবে তায়েফের অঞ্চল মুসলমানদের অধিনে চলে আসে।

সমগ্র আরব ইসলামের
মক্কা বিজয়ের পর আরবের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যমান গোত্রগুলো দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। ফলে গোটা আরব উপত্যকা অর্থাৎ দক্ষিণে ইডেন বন্দর থেকে হাযারা মাউত পর্যন্ত, উত্তরে তাবুকের পাহাড়ি অঞ্চল পর্যন্ত, পশ্চিমে লোহিত সাগরের পাড় পর্যন্ত, পূর্বে নজদ, ইয়ামামা ও হিজর পর্যন্ত, (তবে কোন কোন ঐতিহাসিক বর্ণনার আলোকে মনে হয় যে, পূর্বে পারস্য উপসাগরের পশ্চিম তীরের অঞ্চল তথা বাহরাইনের আব্দুল কায়েস গোত্রের অঞ্চল এবং ওমানের বেশ কিছু অঞ্চলও) ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্ভূক্ত হয়ে গিয়েছিল। পারস্যের শাসনাধীন ইরাকের কিছু কিছু গোত্র এবং রোম শাসিত সিরিয়ার কিছু কিছু গোত্র ছাড়া সমগ্র আরব্য গোত্রগুলো ইসলামী রাষ্ট্রের প্রভাবাধীন এসে পড়ে। এ সময় পর্যন্ত এসে গাসসানীরা ও রোমানরাই ইসলামী শক্তির প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ কারণে নবীজী সা. তাদের বিরুদ্ধে একটি বড় ধরণের যুদ্ধের সংকল্প করেন। আরবের অধিকাংশ গোত্রের সমন্বয়ে ৩০হাজারের এক বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করা হয়। তিনি নিজেই এর নেতৃত্বে ছিলেন। এই বিশাল বাহিনী নিয়ে ৯ম হিজরীর রজব মাসে তিনি হিজাযের উত্তর সীমানায় তাবুক নামক স্থানে যেয়ে অবস্থান গ্রহণ করেন। শত্রু বাহিনী তাদের সংবাদ পেয়ে সরে পড়ার ফলে যুদ্ধ হয়নি। নবীজী সা. সীমান্তবর্তী নগরসমূহ- আইলা, আযরাহ, দাওমতুল জানদাল, বালিক্বা, নকব ইত্যাদি অঞ্চলের সাথে সন্ধি করে ফিরে আসেন। এর ফলে ইসলামী রাষ্ট্রের উত্তর সীমানা সিরিয়ার সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়ে।

হয়তো যুদ্ধের প্রস্তুতি না হয় বশ্যতার স্বীকৃতি
নবম হিজরীর শেষে নবীজী সা. সকল মুশরিক সম্প্রদায়ের সাথে ইতোপূর্বে সম্পাদিত যে কোন ধরণের চুক্তি থেকে আল্লাহ ও তাঁর নবীজীর দায়-দায়িত্ব প্রত্যাহারের প্রকাশ্য ঘোষণা দেওয়ার জন্য হযরত আলী রা. কে মক্কায় প্রেরণ করেন। তিনি আরাফার দিনে সমবেত সকল সম্প্রদায়ের সম্মুখে সূরায়ে বারা’আতের শুরুর দিকের আয়াতগুলো তেলাওয়াত করে শোনান। এই ঘোষণার অর্থ ছিল যে, এরপর মুশরিক সম্প্রদায়সমূহের সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের আর কোন সন্ধি থাকল না। এরপর ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাস করতে হলে হয় ইসলাম গ্রহণ করে কিংবা বশ্যতা স্বীকার করে জিযিয়া কর দিয়ে বসবাস করতে হবে, অন্যথায় যুদ্ধের পথ বেছে নিতে হবে। আহলে কিতাবীরা যেহেতু ইতোপূর্বেই ইসলামী রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকার করে নিয়েছিল, অতএব তাদের জন্য জিযিয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। সেই ঘোষণার সাথে এ কথাও বলে দেওয়া হয় যে, এখন থেকে হজ্জ ইসলামী পদ্ধতিতে হবে। অতএব, কোন অমুসলিম বায়তুল হারামে প্রবেশ করতে পারবে না।

উপসংহার
মহান আল্লাহ তা‘আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নবীজী সা. কে আদর্শরূপে প্রেরণ করেছেন। তিনি স্বীয় কর্মজীবনের ২৩ বছরের মাথায় আরব ভূখ-ে দীন ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করেছেন অত্যন্ত সফলভাবে। আর এর জন্য তাকে কঠিন সংগ্রাম ও সাধনা করতে হয়েছে দীর্ঘ সময়। প্রথম তেরো বছর তিনি বিপ্লবের মৌলিক উপাদান যোগ্য নেতৃত্ব, দক্ষ কর্মী বাহিনী ও সংগঠন তৈরি করেছেন। প্রথম তিন বছর তিনি গোপনে গোপনে কার্যক্রম পরিচালনা করেন। পরে যখন প্রকাশ্যভাবে দীন কায়েমে ব্রত হন, তখন তাঁকে এবং তাঁর সহযোগীদের কঠিন নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করতে হয়। তিনি অভিজ্ঞতা দ্বারা বুঝতে পারলেন- মক্কার বৈরি পরিবেশে থেকে দীনকে বিজয় করা সম্ভব নয়। তাই তিনি মদীনায় হিজরত করেন এবং সেখানে স্বতন্ত্র ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করেন। সে রাষ্ট্রকে সুরক্ষার জন্য তিনি ক্ষেত্রবিশেষ সন্ধি-চুক্তি করেছেন। জিহাদের বিধান নাজিল হলে তিনি একের পর এক অভিযান পরিচালনা করে শত্রুদের পরাজিত করেছেন। শুধু দাওয়াতের মাধ্যমে দীন প্রতিষ্ঠা সম্ভব হলে তিনি জিহাদের পথে যেতেন না। শুধু জিহাদই একমাত্র পথ হলে দাওয়াতের মাধ্যমে শুরু করতেন না। দীন প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি প্রেরিত হয়েছেন। দীন প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি তিনি দেখিয়ে গেছেন। তাই দীন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আমাদেরকেও তাঁর মতে থাকতে হবে। তাঁর পথে চলতে হবে।

লেখক, মাওলানা আবদুররাজ্জাক/গবেষক ও গ্রন্থকার

তথ্যসূত্র
১. সুরা সাবা-২৮
২. সূরা আ’রাফ-১৫৮
৩. সূরা ফুরকান -০১
৪. বুখারী শরীফ
৫. সূরা আহযাব-৪০
৬. সূরা আহযাব-২১
৭. সূরা মায়িদা-০৩
৮. সূরা আলে ইমরান-১১০
৯. সূরা বাকারা-১৪৩
১০. তবকাতে ইবনে সা’দ
১১.সূরা মায়িদা-৬৭
১২. রাসূলুল্লাহর বিপ্লবী জীবন পৃ: ১০-১১
১৩. তারীখুল ইসলাম মুহাম্মদ মিয়া, ১ম খ-, পৃ. ৩৭
১৪. সূরা মুদ্দাছছির-১-৪
১৫. তাফসীরে শরহে জালালাইন-৭ম খ-, পৃ. ১৬৯
১৬. সূরা শুআরা-২১৪
১৭. সহীহ বুখারী, ২য় খ-, ৭০২-৭৪৩ পৃ, সহীহ মুসলিম, ১ম খ-, ১১৪
১৮. সূরা হিজর-০৬
১৯.সূরা সোয়াদ-০৪
২০.সূরা ক্বলাম-৫১
২১. সূরা আনআম-৫৩
২২. সূরা ফুরকান-০৫
২৩. সূরা ফুরকান-০৪
২৪. সূরা নাহল-১০৩
২৫. সূরা ফুরকান-০৭
২৬. সূরা লোকমান-০৬
২৭. সূরা ক্বলাম-০৯
২৮.ফতহুল কদীর, ইমাম শওকানী, ৫ম খ-, পৃ. ৫০৮
২৯. সীরাতে ইবনে হিশাম, দ্বিতীয় খ-, পৃ. ১৪৭-১৫০
৩০. আধুনিক রাষ্ট্র বিজ্ঞান ও ইসলাম-১৭৯
এছাড়াও নিম্নোক্ত গ্রন্থাবলী থেকে সহযোগিতা নেওয়া হয়।
সীরাতে মোস্তফা, আল্লামা ইদরীস কান্ধলভী রহ.
নবীয়ে রহমত, আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.
আর রাহিকুল মাখতুম, মাওলানা সফিউল্লাহ মোবারকপুরী
সীরাতে খাতামুল আম্বিয়া, মুফতী শফী রহ.
খুতুবাতে হাকীমুল ইসলাম, কারী তাইয়েব সাহেব রহ.
মুহসেনে ইনসানিয়্যাত, নঈম সিদ্দীকী
ইসলামী সমাজ বিপ্লবের ধারা, সাইয়েদ কুতুব