চিন্তাযুদ্ধের আক্রমণ: মোকাবিলার পথ ও পদ্ধতি; মুফতি আবদুর রহমান গিলমান

0
14
চিন্তাযুদ্ধের আক্রমণ: মোকাবিলার পথ ও পদ্ধতি মুহাম্মাদ আবদুর রহমান গিলমান

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষের হিদায়াতের জন্য প্রত্যেক যুগে এবং জায়গায় নবী আ. দের পাঠিয়েছেন। নবী প্রেরণের মূল উদ্দেশ্য মানুষের বিস্মৃত বিশ্বাসÑ তাওহিদকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া। মানুষকে আল্লাহ তা‘আলা নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন। স্বীয় ফুঁক দ্বারা তাতে রুহ দান করেছেন। তাকে জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন। ফিরিশতাদের সিজদাযোগ্য করে সৃষ্টিজীবের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। আল্লাহর প্রতিনিধির মর্যাদা দান করেছেন এবং সৃষ্টির পর জান্নাতে নিজের প্রতিবেশীর স্থান দিয়েছেন। কিন্তু শয়তান যে কি না মানুষকে সৃষ্টির সেরা মানতে নারাজ, যাকে দরবারে এলাহি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, সে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে কুমন্ত্রণা দিয়ে আদম আ. কে জান্নাত থেকে বের করে দেয়। তবে আদম আ. ক্ষমাপ্রার্থনা এবং বিনয়ের কারণে আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে মুক্তি দিয়েছেন। তাঁর এবং তাঁর সন্তানদের জন্য জান্নাতের দরজা খোলা রেখেছেন। তবে এই জান্নাত অর্জন হবে দুনিয়াতে কষ্ট-ক্লেশ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সফলতার মাধ্যমে। আর এখানে যদি ব্যর্থ হয় তাহলে জাহান্নামের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
শয়তান যখন থেকেই নিজের অহঙ্কার এবং অবাধ্যতা বশতঃ আদম আ. কে সিজদা করতে অস্বীকৃতি জানালো, তখন থেকেই সত্য-মিথ্যা সংঘাতের সূচনা হলো। এই সংঘাত কোন অস্ত্রের নয়, নয় কোন বাহ্যিক উপকরণাদির। কারণ, শয়তান তীর তরবারি কামান ইত্যাদি নিয়ে আসেনি। সে এসেছিল কিছু কল্পিত মিথ্যা আশ্বাস নিয়ে। যা ছিল চিন্তার ওপর আঘাত। বোধ-বিশ্বাসের ওপর আক্রমণ। চিন্তা-চেতনা, বোধ-বিশ্বাসের ওপর এই আক্রমণকেই চিন্তাযুদ্ধ বলে। সাম্প্রতিককালের আরব স্কলারদের গবেষণা মতে “চিন্তাযুদ্ধ” বা “আল গাজভুল ফিকরি”-এর পরিভাষাটি নতুন হলেও তার ইতিহাস অনেক পুরাতন। যা উপরের আলোচনা দ্বারাই বুঝা যাচ্ছে। “চিন্তাযুদ্ধ” পরিভাষাটির উৎপত্তি হয় ১২শ শতাব্দিতে। এর উৎপত্তির ইতিহাস সম্পর্কে যতদূর জানা যায় ১০৯৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২৯১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ফিলিস্তিন ভূখ-, বিশেষ করে বায়তুল মুকাদ্দাসে খ্রিস্টানদের কর্তৃত্ব বহাল করার জন্য ইউরোপের খ্রিস্টানরা অনেক যুদ্ধ করে। ইতিহাসে এগুলোকে ক্রুসেড যুদ্ধ নামে আখ্যায়িত করা হয়। এসব যুদ্ধ ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার ভূখ-ে ক্রুসের নামে চালানো হয়েছিল। ক্রুসেড যুদ্ধের এই ধারা দীর্ঘকাল ধরে চলতে থাকে। এ সময় নয়টি বড় যুদ্ধ হয় এবং তাতে লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়।ক্রুসেড যুদ্ধের এই ধারাবাহিকতায় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট সেন্ট লুইস ১২৫০ খ্রিস্টাব্দে মিসরে মনসুরার যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বন্দি হয়। পরবর্তীতে সামান্য মুক্তিপণ দিয়ে মুক্তি পায়। এই সম্রাট বন্দি থাকা অবস্থায় গভীর চিন্তা ভাবনা করতে লাগল যে মুসলমানদের সহায় সম্বল এবং বাহ্যিক উপকরণ আমাদের চেয়ে কম হওয়া সত্ত্বেও কেন তারা আমাদের ওপর বিজয় লাভ করে? দীর্ঘ গবেষণার পর সে এই ফলাফল বের করল যে মুসলমানদের শক্তির উৎস বাহ্যিক উপকরণ নয়; বরং ঈমানের দৃঢ়তা, বিশুদ্ধ আকিদা, নিষ্কলুস চরিত্র এবং মানবীয় গুণাবলীই হচ্ছে তাদের শক্তির উৎস। তার মৃত্যুর কয়েকবছর পূর্বে মুসলমানদের সাথে তাদের ধারাবাহিক পরাজয়ের কারণে এই চিন্তা করতে বাধ্য হয় যেÑ মুসলমানদের ওপর বিজয় অর্জন করার জন্য তাদের ওপর চিন্তা ও আদর্শগত আক্রমণ করতে হবে। আর এর জন্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষ এবং প্রস্তুতি গ্রহণ একান্ত জরুরি। তিনি তার অন্তিম বাণীতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করার জন্য চারটি সুপারিশ করে গেছেন।
১. মুসলিম শাসকদের মাঝে অনৈক্য সৃষ্টি করবে।
২. মুসলিমদের মাঝে বিশুদ্ধ আকিদা এবং দৃঢ় ঈমানের অধিকারী কোন গোষ্ঠী যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে, সে ব্যাপারে সজাগ থাকবে।
৩. মুসলিম সমাজব্যবস্থাকে অশ্লীলতা, চারিত্রিক পদস্খলন এবং অর্থনৈতিক অপচয়ের মাধ্যমে দুর্বল বানিয়ে দিবে।
৪. গাজা থেকে এনতাকিয়া পর্যন্ত একটি বিস্তৃত ঐক্যবদ্ধ ইউরোপ রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করবে। (এই এলাকাটি বর্তমানে ফিলিস্তিন, ইসরাইল এবং শাম-এর অন্তর্ভুক্ত।)
ক্রুসেড যুদ্ধের ফলাফল ইউরোপের চিন্তার পরিবর্তন ঘটিয়েছে। মুসলমানদের সাথে চিন্তার ময়দানে লড়াইয়ের জন্য জ্ঞানের অস্ত্র তৈরি করেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান চিন্তাযুদ্ধের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছে।
তবে চিন্তাযুদ্ধের পরিভাষাটি ব্যাপকহারে পরিচিতি এবং প্রসিদ্ধি লাভ করে ঊনবিংশ শতাব্দিতে।বিশ্ব থেকে ইসলামী খিলাফত বিলুপ্তির পর ইসলামের শত্রুদের জন্য তাদের পথে আর কোনো বাধা রইলো না। গোটা বিশ্ব থেকে ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য, মুসলমানদেরকে ইসলামের গন্ডি থেকে বের করে ধর্মহীনতার বন্ধনে আবদ্ধ করার জন্য তারা সর্বদিক দিয়ে আক্রমণ শুরু করল। সশস্ত্র যুদ্ধের পাশাপাশি মুসলমানদের চিন্তা-চেতনা ও আকিদা-বিশ্বাসের ওপর আঘাত হানার জন্য চিন্তাযুদ্ধের ভয়াবহ এই আগ্রাসন শুরু করল। সশস্ত্র যুদ্ধের চেয়ে চিন্তাযুদ্ধের আক্রমণ, প্রভাব ও কার্যকরিতা বহুগুণে বেশি ও বিধ্বংসী। কারণ, সশস্ত্র যুদ্ধে শত্রুপক্ষ চিহ্নিত এবং পরিচিত থাকে। কোন সময় মুখোমুখি থাকে। চিন্তাযুদ্ধে শত্রু অপরিচিত, অনির্দিষ্ট থাকে যা অতর্কিত আক্রমণ করে। সশস্ত্র যুদ্ধে শত্রুপক্ষের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য জানাশোনা থাকে। চিন্তাযুদ্ধে তা সাধারণত দৃষ্টির আড়ালে থাকে।সশস্ত্র যুদ্ধে আক্রমণ হয় শরীর, ঘরবাড়ি এবং সামরিক শক্তির ওপর। এর দ্বারা ক্ষয়-ক্ষতি বস্তু কেন্দ্রিক। অন্য দিকে চিন্তাযুদ্ধে আক্রমণের লক্ষবস্তু হয় চিন্তা, বিশ্বাস, আদর্শ ও চেতনা। আর এর ক্ষয়ক্ষতি আদর্শ কেন্দ্রীক। মতাদর্শের পরাজয়ের পর বস্তুকেন্দ্রীক ক্ষয়ক্ষতি তখন অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। বুঝা গেল চিন্তাযুদ্ধের প্রভাব ও কার্যকরিতা সশস্ত্র যুদ্ধের চেয়ে বহুগুণ বিধ্বংসী ও ভয়াবহ।

চিন্তাযুদ্ধের ক্ষেত্রসমূহ
পৃথিবীতে বহু ধরনের যুদ্ধের প্রচলন রয়েছে। যেমন, সশস্ত্র যুদ্ধ, স্নায়ূযুদ্ধ, চিন্তাযুদ্ধ, মল্লযুদ্ধ, কলমযুদ্ধ, তর্কযুদ্ধ ইত্যাদি। তবে যুদ্ধের পদ্ধতি যেমনই হোক না কেন, এর জন্য উপযুক্ত ক্ষেত্র প্রয়োজন। অনেক সময় ক্ষেত্র’র উপরই যুদ্ধের জয়-পরাজয় নির্ভর করে। যুদ্ধক্ষেত্র যে পক্ষের অনুকূলে হয়, বিজয় তাদের ভাগ্যেই জোটে। যুদ্ধ যে ক্যাটাগরির, তার ক্ষেত্রও তেমনি হবে।চিন্তাযুদ্ধ একটি অদৃশ্য বিষয়। এটি প্রত্যক্ষ বস্তুনির্ভর নয়। যদিও পরোক্ষভাবে বস্তুর সম্পৃক্ততা মুক্ত নয়। তাই চিন্তাযুদ্ধের ক্ষেত্রগুলোও অনেকটা অদৃশ্য। দৃষ্টির আড়ালে। আবার সে ক্ষেত্রগুলো চিন্তাযুদ্ধের আবিষ্কারকদের অনুকূলে। তারাই তৈরি করেছে এগুলো।যার কারণে এই যুদ্ধে অনেকাংশে তারা সফল। এখানে চিন্তাযুদ্ধের বিশেষ ক্ষেত্রগুলো সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো।চিন্তাযুদ্ধের প্রধান ক্ষেত্র চারটি।
প্রথম ক্ষেত্র প্রাচ্যবাদ। এটি এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে গোঁড়া মতবাদের ভিত্তিতে ইসলামী জ্ঞান শিক্ষা করা হয়। এর দ্বারা উদ্দেশ্য ইসলামের মৌলিক বিষয়ের মাঝে সংমিশ্রণ ঘটিয়ে দেয়া এবং ইসলামের প্রাণে আঘাত করে এর রূপরেখা পরিবর্তন করে ইসলামের মহত্বকে ক্ষত-বিক্ষত করে দেয়া। এ কাজের সাথে সংশ্লিষ্টদেরকে প্রাচ্যবিদ বলে।

প্রাচ্যবাদের লক্ষবস্তু
১. মুসলমানদের আকিদা বিশ্বাস এবং ইসলামী শরীয়তের পরিসমাপ্তি। তাদের মৌলিক লক্ষ্যবস্তু হলÑ ইসলামী শরীয়ত এবং আকায়েদকে নিঃশেষ করে দেওয়া। ইসলামী শরীয়তের স্বাতন্ত্র্যতা এবং বিশুদ্ধতা নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া।
২. পশ্চিমা জগতকে ইসলাম থেকে দূরে রাখা। পশ্চিমা জগত যে হারে ইসলামের দিকে ঝুঁকছে, তাতে ইহুদি-খ্রিস্টানচক্র গভীর উদ্বিগ্ন।বিশেষজ্ঞদের ধারণা আমেরিকাতে প্রতি বছর যে হারে মানুষ ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হচ্ছে, আগামী পঞ্চাশ বছরে হয়তো সেটি একটি মুসলিম রাষ্ট্রে পরিণত হবে।তাই প্রাচ্যবাদের মাধ্যমে পশ্চিমা জগতকে তারা ইসলাম থেকে দূরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রাচ্যবিদদের কর্মপদ্ধতি এবং গবেষণানীতি
প্রাচ্যবিদরা প্রথমত তাদের গবেষণার একটি লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে নেয়। পরবর্তীতে সে লক্ষবস্তু উপযোগী বিষয় নির্বাচন করে। বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে কুরআন, সুন্নাহ, ফিকাহ থেকে নিয়ে ইতিহাসÑ এমনকি আরবি ভাষা, সাহিত্য, কবিতা এবং ভ্রমণকাহিনীও বেছে নেওয়া হয়। যাতে কাক্সিক্ষত গবেষণার ভিত্তি স্থাপন করা যায়। এরপর এসব বিষয় থেকে বাচাই করে একটি ভিত্তিহীন কথাকে সুসজ্জিত করে এমন সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয় যে পাঠক এর দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে পারে না।
চিন্তাযুদ্ধের দ্বিতীয় ক্ষেত্রসাম্রাজ্যবাদ।সাম্রাজ্যবাদ বলতে বুঝায় কোন এলাকায় নিজেদের এজেন্ট নিযুক্ত করে এমনভাবে কর্তৃত্ব অর্জন করা যে সেখানকার ধন-সম্পদ লুটতরাজ করা যায়। ক্যামব্রীজ ডিকশনারি এর ভাষ্য অনুযায়ী (Colonialism) দ্বারা উদ্দেশ্য এমন পদ্ধতি অবলম্বন করাÑ যার দ্বারা একটি রাষ্ট্র অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে। এক কথায় পররাজ্যের ওপর অধিকার বিস্তারের নীতিকে সাম্রাজ্যবাদ বলে।

সাম্রাজ্যবাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য
সাম্রাজ্যবাদীরা এমন কিছু লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যার দ্বারা গোটা ইসলামী বিশ্বের অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ যাতে তাদের হাতে চলে যায়। যেমনÑ
১. নিজেদের অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি অর্জন। যাতে তারা কারো মুখাপেক্ষী না হতে হয় এবং অর্থের মাধ্যমে অন্যদেরকে ঘায়েল করতে পারে।
২. মুসলিম বিশ্বে অর্থনৈতিক এবং সামরিক অবরুদ্ধতা সৃষ্টি করা। তখন স্বাভাবিকভাবেই মুসলিম বিশ্ব নিজ পাঁয়ে দাঁড়াতে সক্ষম হবে না। তাদের মুখাপেক্ষী হতে হবে। আর এই মুখাপেক্ষিতার কারণে তাদেরকে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে ব্যবহার করা যাবে।
৩. বিশ্ববাণিজ্য এবং অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়া। মুসলিমবিশ্বের অর্থনৈতিক এবং সামরিক অবরুদ্ধতা পরিপূর্ণ করতে পারলে বিশ্বঅর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে এমনিতেই চলে যাবে।
৪. সমগ্র মুসলিম বিশ্বের ওপর প্রভাব বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণ করা। যা ইতোমধ্যে প্রায় হয়ে গেছে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই প্রায় গোটা মুসলিম জাহান সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দখলে চলে আসে।
৫. ইসলামী খিলাফত ধ্বংস। কারণ, সাম্রাজ্যবাদী চিন্তা বিকাশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা ইসলামী খিলাফত।
৬. মুসলিম বিশ্বকে খ–বিখ- করা। ইসলামী খিলাফত না থাকলেও মুসলিম রাষ্ট্রগুলো যদি একতাবদ্ধ থাকে, তাহলেও সাম্রাজ্যবাদী চিন্তার বিকাশ এবং তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধক হবে। তাই মুসলিম বিশ্বকে খ–বিখ- করাও তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
৭. মুসলিম বিশ্বের ভাবমূর্তি এবং বৈশিষ্ট্য ক্ষুন্ন করা। এরও দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমতঃ মুসলিম বিশ্বের যে নীতি-নৈতিকতা এবং নূন্যতমও যে ইসলামী আদর্শ রয়েছে, তা ধ্বংস করে দেওয়া। যাতে এরপ্রতি কেউ আকৃষ্ট না হয়। দ্বিতীয়তঃ মুসলিম বিশ্বের ভাবমূর্তি নষ্ট করে বিশ্ব দরবারে তাদেরকে এমনভাবে উপস্থাপন করা যেÑএরা বিশ্ব শান্তির জন্য ক্ষতিকর। এরা সন্ত্রাসবাদ এবং জঙ্গিবাদের ধারক-বাহক। এরপর এই মুসলিম রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ করলেও তখন কেউ আর তার পাশে দাঁড়াবে না।
চিন্তাযুদ্ধের তৃতীয় ক্ষেত্র বিশ্বায়ন। বিশ্বায়ন এমন একটি আন্দোলন, যার উদ্দেশ্য বিভিন্ন অর্থনীতি, সভ্যতা, সংস্কৃতি, সমাজব্যবস্থা, প্রথা-প্রচলন এবং ধর্মীয়, জাতীয় ও দেশিয় স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যকে নির্মূল করে গোটা দুনিয়াকে আমেরিকান দৃষ্টিভঙ্গি ও মতবাদ অনুযায়ী আধুনিক পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার ওপর নিয়ে আসা যায়।

বিশ্বায়নের লক্ষবস্তু
বিশ্বায়ন গোটা পৃথিবীর ওপর আধিপত্য বিস্তারের চিন্তা করে। কিন্তু তাদের মূল লক্ষবস্তু হিসেবে মুসলিমবিশ্বকে টার্গেট করা হয়েছে। এর কারণ হলো-
১. ভৌগলিকভাবে গোটা দুনিয়ার মুসলিম রাষ্ট্রগুলো অত্যন্ত সুবিধামূলক স্থানে রয়েছে।
২. মুসলিমবিশ্ব বিস্ময়কর খনিজসম্পদ সমৃদ্ধ।
৩. তিনটি বড় ধর্ম ইসলাম, খ্রিস্ট এবং ইয়াহুদিদের ধর্মীয় পবিত্র স্থানগুলো মুসলিমবিশ্বে।
৪. বিশ্বায়নের উপযুক্ত জবাব একমাত্র ইসলামী জীবন ব্যবস্থাই দিতে পারে। এজন্য বিশ্বায়নের নিকট ইসলামই একমাত্র আতঙ্কের কারণ।এ চারটি কারণে বিশ্বায়ন মুসলিমবিশ্বকে তাদের প্রধান টার্গেট বানিয়েছে।
চিন্তাযুদ্ধের চতুর্থ ক্ষেত্র খ্রিস্টান মিশনারি। খ্রিস্টান মিশনারি বলতে খ্রিস্টধর্মে দিক্ষিত হওয়াকে বুঝায়। খ্রিস্টান মিশনারি দ্বারা উদ্দেশ্য খ্রিস্টধর্মের বাইরের লোকদেরকে নিয়মতান্ত্রিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে খ্রিস্টান বানানো। এই কাজের সাথে সম্পৃক্তদেরকে মিশনারি বলে।

মিশনারিদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য
মিশনারিদের প্রধান লক্ষ্য যা ইতোপূর্বে উল্লেখ হলো। অর্থাৎ, খ্রিস্টধর্মের বাইরের লোকদেরকে নিয়মতান্ত্রিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে খ্রিস্টান বানানো। তবে প্রসিদ্ধ একজন খ্রিস্টান মিশনারি এবং প্রাচ্যবিদ স্যামুয়েল জোয়েমার১৯৩৫ সালে খ্রিস্টান মিশনারিদের এক সম্মেলনে ভাষণ দিতে গিয়ে মিশনারিদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছিলেন ‘মুসলমানদেরকে খ্রিস্টান বানানো আমাদের উদ্দেশ্য নয়। কারণ খ্রিস্টান হওয়া অনেক সম্মানের। মুসলমানরা এর যোগ্য নয়। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হল মুসলমানদেরকে ইসলাম ও কুরআন থেকে দূরে সরিয়ে রাখা। তাদেরকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা। এটুকু করতে পারলেই তাদের নিয়ে যা ইচ্ছা তাই করা যাবে। যে পথে যেতে বলা হবে, তারা সে পথেই যাবে।’
মিশনারিদের আরো কিছু লক্ষ্য রয়েছে, যা স্যামুয়েল-এর বক্তব্যকে সমর্থন করে। যেমন, ইসলামী আকিদা-বিশ্বাস নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। ইসলাম ধর্ম থেকে মুসলমানদের আস্থা উঠিয়ে ফেলা। কুরআন মাজিদের শাব্দিক বিকৃতি, অর্থের পরিবর্তন এবং মুসলমানদেরকে কুরআন থেকে দূরে সরিয়ে রাখা। হুজুর সা.-এর রিসালাতে সংশয় সৃষ্টি করা। মুসলিম বিশ্বের ওপর প্রভার বিস্তারের লক্ষ্যে সাম্রাজ্যবাদ এবং প্রাচ্যবাদকে সহযোগিতা করা, ইত্যাদি।

চিন্তাবিদদের উদ্বেজক আক্রমণ
চিন্তাযুদ্ধের মাধ্যমে ইহুদি-খ্রিস্টান চিন্তাবিদগণ মুসলিম উম্মাহর যে ক্ষতি সাধন করেছে, তা সহজেই পুরণ হবার নয়।মুসলিম উম্মাহর আকিদা-বিশ্বাস থেকে নিয়ে চিন্তা-চেতনা, কৃষ্টি-কালচার, স্বভাব-চরিত্র, সভ্যতা-সংস্কৃতি, চলা-ফেরা, উঠা-বসা, খাওয়া-দাওয়া সব কিছুই এই আক্রমণে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে। মুসলিম উম্মাহ আজ নামসর্বশঃ হয়ে আছে। অন্তঃসারশূন্য একটি জাতিতে পরিণত হয়েছে। শুধু বাহ্যিকভাবে মুসলমানের খোলসটাই রয়েছে। ভেতরে ঈমানী দৃঢ়তা আর ইসলামী চেতনা বলতে কিছু নেই।মুসলিম জাতি কখনো সশস্ত্র যুদ্ধে পরাজয়ের জাতি ছিলো না। অস্ত্র-সস্ত্রে সজ্জিত বিশাল শক্তিধর বাহিনীকে মুষ্টিমেয় নিরস্ত্র কয়েকজনই নাস্তানাবুদ করে দিয়েছিল।কিন্তু আজ মুসলিম উম্মাহ চিন্তাযুদ্ধে পরাজয়ের কারণে সশস্ত্র যুদ্ধে পরাজিত হচ্ছে। দিকে দিকে ধুঁকে ধুঁকে মরছে মুসলিম জাতি। নির্যাতিত, নিপীড়িত আর নিষ্পেষিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বীরের জাতি আজ কাপুরুষের জাতিতে পরিণত হয়েছে। যে অদৃশ্য শক্তিবলে মুসলিম উম্মাহ সর্বদা বিজয়ের মালা ছিনিয়ে এনেছিল, চিন্তাযুদ্ধে পরাজয়ের কারণে সে শক্তি আজ নিঃশেষ হয়ে গেছে।তাই মুসলিম উম্মাহকে আবার জেগে উঠতে হবে। যে সকল ক্ষেত্রে তারা আক্রমণ করেছে, সেগুলো চিহ্নিত করে তার পাল্টা জবাব দিতে হবে।নিম্নে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের আক্রমণের ক্ষেত্রগুলো তুলে ধরা হলো।

ইসলাম ধর্ম ও এর আনুষাঙ্গিক বিষয়ের ওপর আক্রমণ
০১. ইসলাম ধর্ম প্রচলিত ইয়াহুদি এবং খ্রিস্টান ধর্ম থেকে সৃষ্ট এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। অর্থাৎ ইসলাম সর্বশেষ এবং ঐশী কোন ধর্ম নয়; বরং পূর্ববর্তী ধর্মগুলো থেকে এর উৎপত্তি। (নাউজুবিল্লাহ)
০২. গোটা পৃথিবীকে খ্রিস্টানসাম্রাজ্য বানানো তাদরে চূড়ান্ত লক্ষ্য। এ জন্য খ্রিস্টধর্মের প্রচার-প্রসারে তারা প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
০৩. মুসলমানদের আকিদা-বিশ্বাসে সংশয় সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং পাশ্চাত্যের নাস্তিক্যবাদী ধারণা এবং বস্তুবাদী চিন্তার প্রচলন করা হচ্ছে।
০৪. হুজুর সা.-এর রিসালাতে সন্দেহ এবং সংশয় সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা বলে বেড়াচ্ছেÑ মুহাম্মাদ সা. একজন সফল চিন্তাবিদ এবং নেতাÑ তা ঠিক, কিন্তু তাঁর সত্য নবী হওয়াটা সুনিশ্চিত নয়।
০৫. কুরআন মাজিদে সন্দেহ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে তারা প্রমাণ করতে চায় যে, কুরআন মুহাম্মাদ সা.-এর লিখিত একটি কিতাব। এটি কোন আসমানী গ্রন্থ নয়।
০৬. হাদিসের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। তাদের বড় লক্ষবস্তু হাদিসে নববী। এক্ষেত্রে তাদের কিছু প্রসিদ্ধ আপত্তি আছে। যেগুলোর উত্তর উলামায়ে কিরাম ইতোমধ্যে দিয়েছেন।
০৭. মনগড়া এবং দুর্বল বর্ণনার হাদিস প্রচার প্রসার করছে। তারা একদিকে বিশুদ্ধ হাদিসের উৎসকে লক্ষবস্তু বানিয়েছে, অন্যদিকে মনগড়া বানানো কিছু হাদিস তাদের গবেষণা কাজে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে সেগুলোর প্রচার প্রসার করছে।
০৮. ইসলামী ফিকাহ বা আইন শাস্ত্রকে “রোমান ল” বা রোমান আইন থেকে তৈরি বলে প্রচার করছে।
০৯. জিহাদের ভুল ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। পশ্চিমারা সব সময়ই মুসলমানদের জিহাদী উদ্দীপনার ভয়ে আতঙ্কিত থাকে। এজন্য তারা মুলমানদেরকে জিহাদ থেকে দূরে রাখার জন্য এর বিভিন্ন বিকৃত ও ভুল ব্যাখ্যা করছে।
১০. এমন কিছু গবেষক এবং বুদ্ধিজীবী তৈরি করা হচ্ছে, যাদের দ্বারা ইসলামের মূল প্রাণশক্তি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। যারা দীনের নামেই মানুষদেরকে দীন থেকে দূরে রাখছে। তথাকথিত ঐ ইসলামী বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের গবেষণা এবং ফতোয়ায় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আনুগত্যের সবক দিয়ে থাকেন।

ইসলামী সমাজ, রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর আক্রমণ
০১. জাতিসংঘের ওপর ভর করে মুসলিম বিশ্বের সমস্যাগুলোকে জটিল করে রেখেছে। যেমনÑ কাশ্মীর, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যু ইত্যাদি।
০২. জাতিসংঘের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের ওপর এমন কিছু আইন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছেÑ যা বাহ্যত আন্তঃদেশীয় বললেও এর বাস্তব প্রয়োগ শুধুমাত্র মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর ওপর করা হয়।
০৩. সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কখনো জাতিসংঘের মাধ্যমে, কখনো বা নিজেরা সরাসরি মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সাথে এমন চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে যায়, যার কারণে পরবর্তীতে মুসলিম রাষ্ট্রগুলো ফেঁসে যায়।
০৪. মুসলিমবিশ্বকে খ–বিখ- করার জন্য বিভিন্ন সময় তাদের ওপর যুদ্ধ-বিগ্রহ চাপিয়ে দেওয়া হয়।
০৫. মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সীমানা নির্ধারণ করে সেগুলোকে বিভক্ত করা হয়েছে। এখন এক সীমানার মুসলমানরা অন্য সীমানার মুসলমানদেরকে তাদের প্রতিপক্ষ মনে করছে।
০৬. বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রের পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়া হচ্ছে। আবার কোন কোন মুসলিম রাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধও উস্কে দেয়া হচ্ছে।
০৭. সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বিভিন্ন মুসলিমরাষ্ট্রে নিরাপত্তার নামে তাদের সৈন্য নিয়োগ দিচ্ছে। এটা মূলতঃ বন্ধুর ছদ্মাবরণে শত্রুতা বৈ আর কিছু নয়।
০৮. বিভিন্ন মুসলিমরাষ্ট্রে গণতন্ত্রের বিকাশ করে সেখানে তাদের এজেন্ট এবং অনুগত সরকার নিযুক্ত করছে।
০৯. প্রতিটি মুসলিমরাষ্ট্রকে জাতীয়তা এবং প্রাদেশিকতার ভিত্তিতে বিভক্ত করার জন্য এমন দল তৈরি করে দিয়েছে, যারা জাতীয়তা এবং প্রাদেশিকতা প্রচার করছে।
১০. গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাই উন্নতির মাধ্যমÑ তা মানুষকে বিশ্বাস করানো হচ্ছে।
১১. মুসলমানদের বিভিন্ন গোত্র, সাম্রাজ্য এবং রাজত্বের মাঝে হিংসার আগুন জ্বালানো হচ্ছে। মুসলিম বিশ্বের একটি সম্প্রদায়কে আরেকটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে, একটি রাষ্ট্রকে আরেকটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উস্কে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করা হচ্ছে। যাতে মুসলমানরা পরস্পর মতানৈক্যের মাঝে লিপ্ত থাকে এবং রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে শক্তি অর্জন করতে না পারে।
১২. মুসলমানদের মাঝে জাতীয়তাবাদ, জাতিপূজা এবং রাষ্ট্রপূজা উস্কে দেওয়া হচ্ছে। যাতে এক খলিফার ওপর একমত হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। সাথে সাথে এই প্রোপাগান্ডা চালানো হচ্ছে যে, খিলাফত একটি অনর্থক এবং অকল্যাণকর রাষ্ট্রব্যবস্থা। খিলাফতের বিলুপ্তিও স্বয়ং মুসলমানদের হাতেই করানো হয়েছে।
১৩. বৈশ্বিক দ্বন্দ্বগুলোর নিরসনের জন্য ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে খিলাফতের পরিবর্তে একটি বিকল্প বিশ্বসংস্থা “জাতিসংঘ” প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
১৪. মুসলিমবিশ্বে নতুন নতুন রাজনৈতিক এবং ভাষাভিত্তিক পার্টিসমূহের উৎপত্তি এবং এর ক্রমবিকাশ করা হচ্ছে।
১৫. মুসলমানদের মাঝে ফিতনা সৃষ্টির লক্ষেনতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং চিন্তা চেতনার আলোকে বিভিন্ন ধর্মীয় উপদল গঠন করে যাচ্ছে এবং গঠিত উপদলকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে যাচ্ছে।
১৬. মুসলিমবিশ্বের নেতৃত্ব তাদের হাতে রাখার জন্য নিজেদের পছন্দসই নেতৃত্ব তৈরি করে রাখে। আর সুযোগ মতো এদেরকে নেতৃত্বের স্থানে বসায়। যার কারণে মুসলিমবিশ্ব তাদের অধিকার আদায়ের জন্য একতাবদ্ধ হতে অক্ষম।
১৭. মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে ইসলামকে রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং অর্থনীতি থেকে দূরে রেখে পশ্চিমা মূল্যবোধ অনুযায়ী ধর্মহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।

ইসলামী কৃষ্টি-কালচার ও চিন্তা-চেতনার ওপর আক্রমণ
০১. ইসলামী সমাজের চাল-চলন, রীতি-নীতি, সভ্যতা-সংস্কৃতি নিয়মতান্ত্রিকভাকে তারা শিক্ষা গ্রহণ করছে। আর এর দ্বারা সহজেই মুসলমানদের মাঝে প্রবেশ করে তাদের কৃষ্টি-কালচারের ওপর আক্রমণ করছে।ইসলামী রাষ্ট্রগুলোর প্রচলিত ভাষা শিখে নেয়, যাতে ঐ সকল রাষ্ট্রে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, ব্যবসায়িক এবং গুপ্তচরবৃত্তির কাজ করা যায়।
০২. পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোকে চাকচিক্যময় করে উপস্থাপন এবং সেগুলোর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা হচ্ছে।তাদের, বিশেষ করে প্রাচ্যবিদদের বই-পুস্তক পড়ে একজন সাধারণ মুসলমান মনে করবেÑ সে মানুষের সমাজে নয়; বরং কোন প্রাণী জগতে বসবাস করছে। মনুষ্যত্ব শুধুমাত্র ইউরোপেই পাওয়া যায়। মুসলমানদেরকে উৎসাহিত করা হচ্ছে যে, ধর্ম-কর্ম ছেড়ে পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণেই তাদের মূল্যায়ন এবং মুক্তি রয়েছে।
০৩. মুসলমানদেরকে দুর্বল এবং বোকা হিসেবে প্রমাণ করা হচ্ছে। অধিকাংশ প্রাচ্যবিদরা তাদের সাহিত্যে মুসলমানদের সাথে আন্তরিকতার বেশ ধারণ করে তাদের মাঝে হতাশার সৃষ্টি করে। তাদের সাহিত্যগুলো পড়ে সাধারণ মুসলমান এই ধারনা পোষণ করতে থাকে যে, বর্তমান পৃথিবীতে ইসলামী জগতের কোন মূল্য নেই। আর মুসলমানÑ জাতি হিসেবে অযোগ্য, অথর্ব।
০৪. আধুনিকতার নামে মানুষকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে।
০৫. মুসলমানদেরকে তাদের অতীত বিষয়ে লজ্জিত করা, বর্তমান অবস্থার ওপর হতাশ এবং ভবিষ্যত সংক্রান্ত বিষয়ে নিরাশ করা হচ্ছে।
০৬. ইসলামী ব্যক্তিত্বকে মুসলমানদের নিকট দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে এবং যুগে যুগে ইসলামী আন্দোলন এবং এর নেতৃত্ব দানকারীদের ওপর নাশকতা পরিচালনা করা হচ্ছে।

ভাষার ওপর আক্রমণ
০১. মুসলমানদেরকে তাদের ধর্মীয় উৎসÑ কুরআন-সুন্নাহ থেকে দূরে সরানোর জন্য আরবির সাথে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন করে দিচ্ছে। আরবি ভাষার বিশুদ্ধতার ওপর বিভিন্ন প্রশ্ন ও আপত্তি করে তাতে ইউরোপীয় শব্দ অনুপ্রবেশের মাধ্যমে আরবি ভাষার মূল আকৃতি পরিবর্তন করে দিচ্ছে।
০২. আরব রাষ্ট্রগুলোতে আরবির পরিবর্তে সেখানকার পুরাতন পরিত্যক্ত ভাষায় প্রচলন ঘটানো হচ্ছে। আরব জগতের পরিচয় বিলুপ্ত করানোর জন্য সনাতন এবং বিবর্জিত ভাষাগুলো পুনর্জীবিত করা হচ্ছে।
০৩. অমুসলিমদের ভাষা এবং বাজারী কথা-বার্তার উৎসাহ প্রদান করা হচ্ছে। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশের মুসলমানদের ভাষা উর্দু এবং বাংলার পরিবর্তে হিন্দি ভাষায় প্রচার প্রসারের প্রচেষ্টা অত্যন্ত সফলতার সাথে করে যাচ্ছে। এসব রাষ্ট্রে ভারতীয় মিডিয়া দ্বারা বাজারী কথা-বার্তার প্রসার করা হচ্ছে।
০৪. মুসলিম বিশ্বে ইউরোপীয় ভাষার প্রসার করা হচ্ছে। মরক্কোতে স্পেনিশ ভাষা, আলজিরিয়ায় ফ্রান্স ভাষা, লিবিয়ায় ইতালি ভাষা এবং ভারত উপমহাদেশসহ বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রে ইংরেজি ভাষাকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এতে মুসলিম বিশ্বের স্থানীয় ভাষাগুলো মারত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ইসলামী পরিভাষা ও মুসলিম নামের ওপর আক্রমণ
০১. ইসলামী পরিভাষার পরিবর্তন করা হচ্ছে। পাশ্চাত্যের গবেষকদের পরিভাষা বিকৃতির কিছু উদাহরণ হচ্ছে ইসলাম অর্থে Mohammedanism শব্দটির ব্যবহার, আমাদের সম্মানিত গবেষকরা যার অনুবাদ করেন محمدية (মুহাম্মাদিয়া)। বরং অনেক সময় তারা নিজেরাও দীনে ইসলাম অর্থে এই শব্দটি ব্যবহার করেন। কখনো কখনো এই স্থানে তারা الدينالمحمدي (মুহাম্মাদী দীন) শব্দটিও ব্যবহার করে থাকেন। মূলত ইংরেজি Ism শব্দটি ব্যবহার করা হয় কোন তন্ত্র বা মতবাদকে বুঝানোর জন্য। যেমন Nationalism قومية (জাতীয়তাবাদ) Secularism علمانية (ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ) Communism إشتراكية (সমাজতন্ত্র)। এইভাবে ইসলামের ক্ষেত্রে যদি শব্দটি ব্যবহার করা হয় এবং নবী মুহাম্মাদের নামের শেষে ওংস যোগ করে বলা হয় Mohammedanism (মুহাম্মাদীবাদ) তাহলে খুবই সম্ভব যে, ধীরে ধীরে ইসলামের ঐশিত্ব ঘুচে যেতে থাকবে এবং এমন ভুল ধারণা জন্ম নিবে যে, ইসলাম কোন ঐশী ব্যাপার নয়, তা মূলত এক ঐতিহাসিক ব্যক্তির প্রবর্তিত মতবাদ। এই আশঙ্কা নিশ্চয়ই অযৌক্তিক নয়। পাশ্চাত্যের লেখকরা এই শব্দটি ব্যবহার করে মূলত তাই করতে চেয়েছেন এবং তার পরিণতি সম্পর্কে অসচেতন থেকে, অনেক সময় ভাল নিয়তে, আমাদের শিক্ষিত লোকেরা চিন্তানায়কেরা শব্দটি ব্যবহার করেছেন, করছেন।
০২. বিভিন্ন মুসলিম দার্শনিকদের নামের বিকৃতি করা হচ্ছে। ইউরোপের উন্নয়নের পেছনে রয়েছে মুসলিম দার্শনিকগণের অবদান। মুসলিম দার্শনিকদের বিভিন্ন বই-পুস্তক এবং রচনা থেকেই ইউরোপের প-িতরা জ্ঞান-বিজ্ঞান শিখেছে। কিন্তু পরবর্তীতে মুসলমানদের এই অবদানকে অস্বীকার করার জন্য মুসলিম দার্শনিকদের নামকে বিকৃত করে পশ্চিমায়ন করা হয়েছে। যেমনÑ আল বাত্তানীকে পরিবর্তন করে রেথেন, রোয়েথেন, আল বাতেজনিয়াস ইত্যাদি নাম দিয়েছে। ইউসুফ আল ঘুরিকে জোসেফ টি প্রিজড, আল রাজীকে রাজম, আল খাসিবকে আল বুযাথের, আল কায়াবিসকে ক্যাবিটিয়াস, খাওয়ারিজমিকে গরিটাস, গরিজম। ইবনে সিনাকে এভিনিস, ইবনুল হাইসামকে আলোজেন, মারকালীকে মারজাকেল, ইবনে আবির রিজালকে আল বোরাছেন, জাবির ইবনে হাইয়ানকে জিবার, ইবনে বাজ্জাকে এডেমগেন্স, ইবনে রুশদকে এভেরুশ, এভরুন। আল কিন্দিকে কিন্দাস, ফারগানীকে ফাগানেস, হোসাইন ইবনে ইসহাককে জোহাস নিটিউন ইত্যাদি।

ইসলামী শিক্ষার ওপর আক্রমণ
১. পাঠদানের ভাষা এবং লেখার পদ্ধতির পরিবর্তন করা হচ্ছে।
২. বিদেশি ভাষা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। বিশেষভাবে ইংরেজি ভাষাকে সর্বস্তরে বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
৩. ধর্মহীনতার বিষয়বস্তু সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে এবং ধর্মহীন শিক্ষক নিয়োগ করা হচ্ছে। যার কারণে, নাস্তিকতা এবং বস্তুবাদী মানসিকতাসম্পন্ন ছাত্র তৈরি হচ্ছে।
৪. উলামায়ে কিরাম এবং মাদরাসা ছাত্রদেরকে হেয়প্রতিপন্ন করা হচ্ছে এবং মাদরাসা শিক্ষার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
৫. সহশিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মন-মেজাযকে বিগড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকা-ের সূত্রপাত হচ্ছে এর দ্বারা।
৬. দীনের মর্যাদা ক্ষুন্ন এবং দীনি শিক্ষা ও সমসাময়িক শিক্ষার মাঝে ব্যাপক দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। যার ফলে জাগতিক জ্ঞান এবং দীনি ইলম দুটি পৃথক পৃথক হয়ে যাচ্ছে এবং দীনি শিক্ষার প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি হচ্ছে।
৭. সঠিক ইতিহাস থেকে দূরে রেখে ভুল ইতিহাস শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। এতে করেÑ পাশ্চাত্য চিন্তার ধারক-বাহকদের দোষ-ত্রুটি এবং বাড়াবাড়িকে গোপন করা হচ্ছে। অন্যদিকে ইসলামী ব্যক্তিত্বের সামান্য দোষ-ত্রুটিকেও অনেক বড় করে তুলে ধরা হচ্ছে।
৫. ইসলামকে শুধুমাত্র একটি দার্শনিক বিষয় বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। যার কারণে, শিক্ষা, সাহিত্য- সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব পাশ্চাত্যের হাতে চলে গেছে।
৬. বিশ্বব্যাপী ইউনেস্কো এবং ইউনিসেপ-এর মতো শিক্ষা-সংস্কৃতিমূলক সংস্থার প্রতিষ্ঠা করেছে। এ সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্রের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিভিন্ন সাহায্য সহযোগিতা করে সেগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
৭. মুসলিমবিশ্বে পাশ্চাত্য ধারার সংস্থাগুলোর অধীনে শিক্ষক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে। যার কারণে, নতুন প্রজন্ম মেধার দিক দিয়ে পাশ্চাত্যের গোলাম হয়ে যাচ্ছে।
৮. মুসলিমবিশ্বের শিক্ষা মন্ত্রণালয়গুলোর ওপর বিদেশি বিশেষজ্ঞদের হস্তক্ষেপ হচ্ছে এবং মুসলিম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিদেশি শিক্ষক এবং প-িতদের আসা-যাওয়াআশঙ্কাজনকহারে হচ্ছে।
৯. মেধাবী মুসলিম ছাত্রদেরকে স্কলারশীপ প্রদান করে তাদের অনুগত বানাচ্ছে।
১০. মুসলিম ছাত্রদেরকে নামেমাত্র মুসলমান বানিয়ে রাখা হচ্ছে এবং মুসলমানদেরকে তাদের ইলমের উত্তরাধিকারী থেকে একেবারে অপরিচিত করে দেওয়া হচ্ছে।

চিন্তাযুদ্ধের হাতিয়ার
এ যুদ্ধে ইহুদি-খ্রিস্টান চিন্তাবিদরা যে সকল উপকরণ এবং মাধ্যমকে তাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ এখানে দেওয়া হচ্ছে। তাদের হাতিয়ার সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য আমার লিখিত ‘চিন্তাযুদ্ধ’ বইটি অধ্যয়ন করা যেতে পারে। বইতে প্রত্যেকটা বিষেয়ের ওপর নাতিদীর্ঘ আলোচনা করা হয়েছে। মৌলিকভাবে তারা হাতিয়ার হিসেবে যে উপকরণগুলো ব্যবহার করছে তা হলোÑ
১. বই-পুস্তক, ২. অনুবাদ, ৩. রচনা, সাময়িকী, ম্যাগাজিন, পত্রিকা, ৪. কনফারেন্স, সেমিনার, কনভেনশন, ৫. ইনসাইক্লোপিডিয়া,৬. ইলেক্ট্রনিক্র মিডিয়া, যেমন- ইন্টারনেট, রেডিও, টেলিভিশন, সিনেমা ইত্যাদি, ৭. পাশ্চাত্যের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ, ৮. সে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীগণ, ৯. বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ইসলামী বিভাগসমূহ, ১০. মিশন হাসপাতাল, মেডিকেল এবং দাতব্য সেবা, ১১. তথ্যসূত্র, ১২. রাজনৈতিক ক্ষেত্র, ১৩. আইন, ১৪. অর্থনীতি এবং বাণিজ্য, ১৫. সেবামূলক প্রতিষ্ঠান (এনজিও), ১৬. অতি আধুনিক ইসলামী চিন্তাবিদ, ১৭. চারুকলা বা শিল্পকলা, ১৮. সাহিত্য, ১৯. খেলাধুলা এবং বিনোদন, ২০. সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, ২১. আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও সভ্যতা, ২২. জাহেলি ধর্মান্ধতার বিকাশ, ২৩. মুসলমানদের মাঝে ধর্মীয় নেতৃত্বের ব্যাপারে ঘৃণা সৃষ্টি, ২৪. নারী স্বাধীনতা, ইত্যাদি।

চিন্তাযুদ্ধের মোকাবিলায় আমাদের করণীয়
পৃথিবীতে যখন ইসলামের আবির্ভাব হয়েছে ইসলামবিরোধীরাও এর পেছনে লেগেছে। ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য, ইসলামের অগ্রযাত্রাকে ব্যহত করার জন্য সর্বপ্রকার চেষ্টা সাধনা তারা করেছে। সশস্ত্র যুদ্ধের পাশাপাশি চিন্তাযুদ্ধেরও কোন দিক বাকি রাখেনি। তাই তো দেখা যায় মক্কার মুশরিকরা রাসুল সা.-এর বিরোধিতা করার জন্য পরামর্শ পরিষদ গঠন, হকের বাণীতে সংশয় ও সন্দেহ সৃষ্টি, মনগড়া ভ্রান্ত ব্যাখ্যা, মিথ্যা প্রোপাগান্ডা, অপবাদ, বিদ্রুপ, ব্যাঙ্গাত্মক নামের প্রচার, হতাশামূলক বিবৃতি, অযাচিত ও অনর্থক আশ্চর্য বিষয়ের দাবি, মুসলমানদের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন, বংশীয় ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তার, নেতৃত্ব, ধন-সম্পদ ও সুন্দরী নারীর লোভ, সমঝোতার প্রচেষ্টা, সামাজিক বয়কট, দেশান্তর, ষড়যন্ত্র এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ইত্যাদিসব কিছুই করেছে। এ সবই চিন্তাযুদ্ধ। কিন্তু রাসুল সা.-এর আগমনের পর থেকে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ইসলামবিরোধীদের চিন্তাগত আক্রমণ সামগ্রিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তখন মুসলমানদের এতে সফলতা এবং প্রতিরক্ষার মূল কারণ ছিল
১. আল্লাহ, রাসুল সা. এবং কুরআন-সুন্নাহ-এর সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত মজবুত।
২. শত্রুপক্ষ জ্ঞান-বিজ্ঞানে দুর্বল ছিল। অন্যদিকে মুসলমানরা এদিক দিয়ে অনেক গভীরতা অর্জন করেছিল।
৩. রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা মুসলমানদের অধীনে ছিল।
৪. সে যুগে মুসলিম শাসকগণ দীনের অতন্দ্র প্রহরী ছিলেন এবং নিজেদের দীন ও ঈমানের বিষয়ে যথেষ্ট অনুভূতিশীল ছিলেন।
৫. মুসলমানদের নৈতিক চরিত্র ও স্বভাবে প্রভাবিত হয়ে স্বয়ং আক্রমণকারীরা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছে।
তাই বর্তমান যুগেও আমাদেরকে চিন্তাযুদ্ধে বিজয় অর্জন করতে হলে সেসকল গুণ অর্জন এবং কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে হবে।

নিম্নে সে আলোকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ ও করণীয় প্রদত্ত হল।
প্রথমতঃ যে গুণগুলো অর্জন করতে হবে
১. দৃঢ় ঈমান
২. সঠিক নিয়াত
৩. অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকির
৪. হালাল রিজিক
৫. দান খয়রাত
৬. দুনিয়াবিমুখতা ও অল্পেতুষ্টি
৭. অনাড়ম্বর জীবন যাপন
৮. শরীয়তের আদেশ নিষেধ মান্য করা
৯. বান্দার হক আদায় করা
১০. প্রয়োজনীয় দীনি শিক্ষা
১১. উম্মতের ফিকির
১২. যুগ সচেতনতা এবং ইতিহাসের ওপর মোটামুটি ধারনা অর্জন
১৩. দৃঢ়তা
১৪. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জন।

দ্বিতীয়তঃ যে কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে হবে
০১. উলামায়ে কিরাম, ইসলামী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং বিজ্ঞজনদের উচিত- নিজেদের সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের সিলেবাসে “আল গাজভুল ফিকরি” বা চিন্তাযুদ্ধ, খ্রিস্টবাদ, ইয়াহুদিবাদ এবং আধুনিক মতবাদসমূহের পরিচিতি, কার্যক্রম ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করা।
০২. ইহুদি-খ্রিস্টান চিন্তাবিদদের টার্গেটকৃত বিষয়বস্তুর ওপর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কাজ করতে হবে- যাতে তাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। তাদের টার্গেটকৃত বিষয়গুলো হচ্ছে ১) আল্লাহ তা‘আলার সত্তা। ২) রিসালাত ৩) কুরআন মাজিদ ৪) হাদিস সম্ভার ৫) ইসলামী ফিকাহ ৬) আরবি ভাষা ৭) মুহাম্মাদ সা.-এর জীবনী ৮) ইসলামের ইতিহাস ৯) ইসলামী দলসমূহ ১০) ইসলামী রাষ্ট্রসমূহ ১১) এবং বিভিন্ন সময়ে সংগঠিত ইসলামী বিপ্লবসমূহ।
০৩. গবেষণাকর্মের মাধ্যমে চিন্তাবিদদের সকল চক্রান্ত, ভ্রান্ত ব্যাখ্যা এবং অজ্ঞতাসমূহ অকাট্য দলিল দ্বারা স্পষ্ট প্রমাণ করে দিতে হবে।
০৪. নারী এবং শিশুদেরকে পাশ্চাত্য এবং ধর্মহীনতার প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
০৫. পাশ্চাত্য ভাষাসমূহের পরিবর্তে আরবি ভাষাকে প্রাধান্য দিতে হবে।
০৬. বিদেশি ভাষা বিশেষ করে ইংরেজি ভাষার পরিধি সীমাবদ্ধ করতে হবে। প্রয়োজন ব্যতীত এর ব্যবহার করা যাবে না। নিজের ভাষা বিদেশি প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে।
০৭. বিদেশি পণ্য যথাসম্ভব বর্জন করে চলতে হবে।
০৮. মিডিয়ায় জনচাপ বৃদ্ধি করতে হবে। যাতে চরিত্রহীন বিষয়াবলীর লাগামহীন প্রচার প্রসার না হয়।
০৯. খ্রিস্টবাদের মোকাবিলায় পাল্টা সাহিত্য এবং ব্যক্তিত্ব তৈরি করতে হবে।
১০. দীনি মাদরাসাসমূহে খ্রিস্টধর্মের মোকাবিলা করে যাচ্ছে এমন উলামায়ে কিরামকে দাওয়াত দিয়ে ছাত্রদেরকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এ কাজটি স্কুল, কলেজ এবং ইউনিভার্সিটিগুলোতেও করা প্রয়োজন। “ধর্মসমূহের তুলনামূলক পার্থক্য” বিষয়টি সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
১১. দীনি মাদরাসার ছাত্ররা মাসে কমপক্ষে একদিন নিজেদের নিকটবর্তী এলাকায় ইসলামের দাওয়াত প্রচার করবে। অমুসলিমÑ বিশেষ করে খ্রিস্টানপল্লীতে গিয়ে হিকমতের সাথে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিবে।
১২. মুসলিম ডাক্তার এবং চিকিৎসকগণ নিজেদেরকে মিশন হাসপাতালের ডাক্তারদের চেয়ে যোগ্য প্রমাণিত করবে। গরিব এবং দুস্থদের জন্য ফি হ্রাসের ব্যবস্থা রাখবে। চিকিৎসার সাথে সাথে ইসলামের দাওয়াত দানকেও গুরুত্বপূর্ণ কাজ মনে করবে। অসহায়দের জন্য দাতব্য চিকিৎসার ব্যবস্থা চালু করবে।
১৩. ধনী এবং সম্পদশালীরা এমন নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা রাখবে, যেখানে নবমুসলিমরা আশ্রয় নিতে পারে। সেখানে যেন তারা নিজেদের আত্মীয়-স্বজন এবং এনজিওদের অত্যাচার থেকে নিরাপদ থেকে হালাল রুজির সাথে সুখময় জীবন যাপনের সুযোগ পায়।
১৪. মুসলমানরা দেশ, অঞ্চল এবং ভাষাগত স্বার্থ পেছনে ফেলে ঈমান এবং ইসলামের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
১৫. খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে মূল লক্ষবস্তু মনে করে কাজ করে যেতে হবে।
১৬. এমন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করতে হবেÑ যা প্রচলিত রাজনীতিতে গাÑনা ভাসিয়ে জনগণের আস্থা অর্জন করবে।

পরিশেষে বলতে চাইÑবর্তমান সময়ে বস্তু উৎপাদনের মতোই চিন্তা উৎপাদন হচ্ছে। বস্তুর মতো চিন্তারও রঙ-বেরঙের বিভিন্ন প্রকার রয়েছে। কিন্তু চিন্তা উৎপাদনের ক্ষেত্রে এমন কোনো মাপকাঠি নেই যে, এই চিন্তা উপকারী না ক্ষতিকর! অথচ বস্তুর ক্ষেত্রে এই মাপকাঠি ঠিকই রয়েছে।
এই নিত্যনতুন চিন্তা-ফিকিরগুলোর প্রধান এবং একমাত্র লক্ষবস্তু মুসলিম বিশ্ব। যাতে মুসলিম বিশ্ব চিন্তাযুদ্ধের পতাকাবাহীদের অনুগত হয়ে যায় এবং সে সকল ইসলামী চিন্তা-ধারা, বোধ-বিশ্বাসকে ধূলিস্যাত করে দেওয়া যায়, যেগুলোর কারণে মুসলিম বিশ্ব তার স্বাতন্ত্র বজায় রেখেছে। তাই মুসলিম উম্মাহকে তাদের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করতে হবে। তাদের খোয়ানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হবে।ইসলামবিরোধীদের বাহ্যিক সাফল্য এবং জয়জয়কার অবস্থা দেখে বিচলিত হবার কিছুই নেই। হতাশা এবং নিরাশার কোন কারণ নেই।আমাদের শক্তির যে উৎস রয়েছে, তা তাদের নেই। আমাদের শক্তির মূল উৎসÑ আমরা সঠিক এবং সত্য পথে রয়েছি। আল্লাহর সাহায্য আমাদের জন্যই আসবে। তিনি আমাদের সাথে রয়েছেন এই বিশ্বাস আমাদের রয়েছে। আশাজাগানিয়া এবং প্রেরণা সৃষ্টিকারী প্রতিশ্রুতিসমূহ আমাদের জন্যই। ফিতনাসমূহের ভবিষ্যদ্বাণী এবং আসন্ন পরীক্ষাসমূহের আগাম সংবাদ আমাদেরকেই জানানো হয়েছে। মানুষের অন্তর পরিবর্তন করে দেওয়ার মহাআধ্যাত্মিক শক্তি একমাত্র আমাদেরই আছে। আমাদের শরীয়ত সংরক্ষিত। আমাদের ভৌগলিক অবস্থান সুরক্ষিত।ক্ষণিজ সম্পদ, সংখ্যাগত শক্তি আমাদের রয়েছে। সর্বোপরী ঐশী সাহায্য একমাত্র আমাদের জন্যই আসবে। তাই ভয়ের কোন কারণ নেই।একটি ক্ষুধার্ত আহত নেকড়ে। অসংখ্য বিড়াল চতুর্দিক থেকে তাকে ঘিরে রেখেছে। বিড়ালদের নখের আঁচড়ে সে রক্তাক্ত।এই ক্ষুধার্ত ও আহত নেকড়ে যদি একবার হুংকার দিয়ে ওঠতে পারে, তাহলে বিড়ালদের আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। দিগি¦দিক তারা জ্ঞানশূন্য হয়ে পালিয়ে যাবে। মুসলিম উম্মাহও আজ ক্ষুধার্ত আহত নেকড়ের ন্যায়। ঈমানী চেতনার ক্ষুধায় তারা ক্ষুধার্ত। মুসলিম উম্মাহ যদি ঈমানী বলে বলিয়ান হয়ে একবার হুংকার দিতে পারে, তাহলে ইহুদি-খ্রিস্টানরা পালানোর পথ খুঁজে পাবে না।মুসলিম উম্মাহর সেই হুংকারের অপেক্ষার প্রহর গুণছে সবাই।