আরব বসন্ত ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বিশ্লেষণ; কামরুল হাছান (ইতালী থেকে)

0
13

আরব বসন্ত একনজর
২০১০ সালের শুরু থেকে আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বয়ে যাওয়া গণবিপ্লবের ঝড়কে পশ্চিমা সাংবাদিকরা আরব বসন্ত হিসাবে আখ্যায়িত করেছে। গণবিক্ষোভের শুরু মিশরে; এরপর তা লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন সহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে যায়। প্রথমে মিশরে প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারকের পতন হয়। পরে লিবিয়ায় মুয়াম্মর আল-গাদ্দাফি জামানার অবসান হয়। আরব বিশ্বের এই গন-অভ্যূত্থানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং এর ইউরোপীয় ন্যাটোভুক্ত সহচর রাষ্ট্রগুলো অস্ত্র সরবরাহ করে এবং সরাসরি আঘাত হেনে ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রনায়কের পতন ঘটায়। এক হিসাবে বলা হয় আরব বসন্তের ফলে মাত্র পৌনে দুই বছরে লিবিয়া, সিরিয়া, মিশর, তিউনিসিয়া, বাহরাইন ও ইয়েমেনের গণ-আন্দোলনের ফলে মোট দেশজ উৎপাদনের ক্ষতি হয়েছে দুই হাজার ৫৬ কোটি ডলার।
ডিসেম্বর ২০১০ থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় যে গণ-বিদ্রোহ ও বিক্ষোভ প্রদর্শন হয়েছে তা ইতিহাসে নজিরবিহীন। এ পর্যন্ত আলজেরিয়া, ইয়েমেন, বাহরাইন, মিশর, ইরান, জর্ডান, লিবিয়া, মরক্কো, তিউনিসিয়ায় বড় ধরণের বিদ্রোহ হয়েছে এবং ইরাক, কুয়েত, মৌরিতানিয়া, ওমান, সৌদি-আরব, সোমালিয়া, সুদান, সিরিয়াতে ছোট আকারের ঘটনা ঘটেছে। এসব বিদ্রোহে প্রতিবাদের ভাষারূপে গণবিদ্রোহের অংশ হিসেবে হরতাল, বিক্ষোভ প্রদর্শন, জনসভা, র‌্যালী প্রভৃতি কর্মসূচী নেয়া হয়। দেশব্যাপী সাংগঠনিক কাজ, যোগাযোগ এবং রাষ্ট্রীয় প্রচারণার থেকে জনগণের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তুলতে ফেসবুক, টুইটারের মত সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ব্যবহৃত হয়। এরই মধ্যে তিউনিসিয়া, মিশরে বিদ্রোহের ফলে শাসকের পতন হয়েছে বলে এখানে তা বিপ্লব বলে অভিহিত করা হচ্ছে। বিভিন্ন কারণে এমন বিদ্রোহের সূচনা হয়; যার মধ্যে সরকারি দুর্নীতি, স্বৈরতন্ত্র, মানবাধিকার লঙ্ঘন, বেকারত্ব এবং চরম দারিদ্র্যের অভিযোগের পাশাপাশি বিশাল যুবসমাজের অংশগ্রহণও অনুঘটকরূপে কাজ করেছে। এর পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি এবং খরার প্রকোপও ছিল বড় কারণ। ১৮ ডিসেম্বর তিউনিসিয়ায় মোহাম্মদ বোয়াজিজির পুলিশে দুর্নীতি ও দুর্ব্যবহারে প্রতিবাদে আত্মাহুতির মাধ্যমে বিদ্রোহ শুরু হয়। তিউনিসিয়ার বিপ্লব সফল হওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য দেশেও আত্মাহুতির কারণে অস্থিরতা শুরু হয়; যার ফলে আলজেরিয়া, জর্ডান, মিশর ও ইয়েমেনে বিদ্রোহ শুরু হয়।

তিউনিসিয়ায় জেসমিন বিপ্লবের ফলে ১৪ জানুয়ারি শাসক জায়নাল আবেদিন বেন আলির পতন ঘটে এবং তিনি সৌদি আরবে পালিয়ে যান। ২৫ জানুয়ারি থেকে মিশরে বিদ্রোহ শুরু হয় এবং ১৮ দিনব্যাপী বিদ্রোহের পরে ৩০ বছর ধরে শাসন করা প্রেসিডেন্ট মুবারক ১১ ফেব্রুয়ারি পদত্যাগ করেন। একই সাথে জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহ নতুন প্রধানমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করেন; ইয়েমেনের রাষ্ট্রপতি আলি আবদুল্লাহ সালেহ ঘোষণা দেন যে, তিনি ২০১৩ সালের পর আর রাষ্ট্রপতি থাকবেন না (যা তখন ৩৫ বছরের শাসন হবে)। তারপর লিবিয়ার শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে পতনের চেষ্টা হয়েছে এবং সুদানের রাষ্ট্রপতি আলি আবদুল্লাহ সালেহ ঘোষণা দিয়েছেন তিনি ২০১৫ এর পর নির্বাচনে অংশ নেবেন না। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘ওয়াল স্ট্রিট দখল করো’ আন্দোলন শুরু হয়। নিউইয়র্ক শহরে শুরু হয়ে এই আন্দোলন শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শতাধিক শহরেই নয়, ইউরোপের বিভিন্ন রাজধানী ও গুরুত্বপূর্ণ শহর এবং বিশ্বের অন্যত্রও ছড়িয়ে পড়েছে। এই আন্দোলনের আওয়াজ হল, ‘আমরাই ৯৯%’, ‘পুঁজিবাদ ধ্বংস হোক’। নিউ ইয়র্কের এই ‘ওয়াল স্ট্রিট দখল করো’ গণআন্দোলনকে নিউ ইয়র্কের আরব বসন্ত হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এরূপ স্বতস্ফূর্ত গণবিক্ষোভ এবং এসব দেশের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে তা আজ গোটা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণের কারণ।

প্রেক্ষাপট
২০১০ ডিসেম্বর এর ১৭ তারিখ। তিউনিসিয়ার লোকাল পুলিশ ভ্রাম্যমাণ ফল বিক্রেতা যুবক মুহাম্মাদ বৌজিজির মালামাল আটক করে নিয়ে গেলে সে নিজের গায়ে আগুন দেয়। এই ঘটনাটি ঘটে তিউনিসিয়ার দরিদ্রতম অঞ্চলগুলোর একটি সিডি বৌজীদ শহরে। যেখানে যুব বেকারত্বের হার ৪০ভাগ। তারপর দ্রুত একটি গণআন্দোলনের দাবানল জলে ওঠে। যে আন্দোলনে সমাজের বেশীর ভাগ ছাত্র, যুবক, পেশীজীবী, শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকজন অংশগ্রহণ করে। যদিও অর্থনৈতিক কারণে এই আন্দোলনের জন্ম হয় তিউনিসিয়ায়, কিন্তু দ্রুত মুসলিম দেশসমূহে উম্মাহর সাথে বিশ্বাসঘাতকতাকারী এবং দালাল শাসকগোষ্ঠির সকল শোষণ, বঞ্চনা এবং সম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদীদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ক্ষোভের গণবিস্ফোরণ ঘটে।

দালাল শাসক ও কুফরি শাসনের অধীনে একজন নাগরিক বৌজীজীর ইতিহাস
আফ্রিকার উত্তর প্রান্তের দেশ তিউনিসিয়ার একটি গঞ্জ-শহর সিদি বৌজিদ-এর যুবক বোয়াজিজি’র বাবা ছিলেন পাশের দেশ লিবিয়াতে কর্মরত এক নির্মাণকর্মী। বাবা যখন মারা যান, তখন বোয়াজিজি-র বয়স তিন। দশ বছর বয়স থেকেই সে অভাবের সংসারের হাল ধরে, পড়াশুনার পাশাপাশি ফল এবং শাকসব্জি বিক্রি করত রাস্তায়।ছয়ভাইবোনদের পড়াশুনার খরচও চালাত সে। এক কোটি মানুষের বসতি তিউনিসিয়া দেশটি মুসলিম প্রধান। কিন্তু পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাব আছে এদেশে। ১৯৫৬ সালে ফরাসি উপনিবেশ থেকে মুক্তির পর ১৯৮৭ সাল থেকে এই দেশের রাষ্ট্রপতি বেন আলি। প্রতিবার ভোটে এই লোকটিই জেতে প্রচুর ব্যবধানে। এই বেন আলির নেতৃত্বাধীন তিউনিসিয়া মার্কিন-ব্রিটিশ বাহিনীর আফগানিস্তান-ইরাক আগ্রাসনের অন্যতম শরিক।

২৬ বছর বয়সী মোহামেদ বোয়াজিজি ছিলেন মফস্বল শহরের রাস্তার ধারের এক গরিব সবজিওয়ালা। বোয়াজিজির সঙ্গে সিদি বৌজিজ শহরের পুলিশ-প্রশাসনের সম্পর্ক কোনদিনই ভালো ছিল না। পুলিশকে ঘুষ না দিলে রাস্তার হকারদের জীবন দুর্বিষহ করে ফেলত পুলিশ। বোয়াজিজি ঘুষ দিতে চাইত না। ১৭ ডিসেম্বর ২০১০ সকাল বেলা ধার করে কেনা ফল-সব্জি ঠেলাগাড়িতে চাপিয়েরাস্তায়বিক্রি করতে বসলে স্থানীয়পুলিশ পারমিট না থাকার জন্য তার ঠেলা ও মাল আটকে দেয়। শহর প্রশাসনের এক মহিলা অফিসার তাকে প্রকাশ্যে চড়মারেন।প্রতিবাদ করলে তাঁর মা-বাপ তুলে গালিও দেয়। এর আগেও পুলিশ তাঁর সঙ্গে এমন ব্যবহার করেছিল। তখন বোয়াজিজি বিচার চাইতে যান গভর্নরের অফিসে। গভর্নর তার সাথে দেখাই করেনি;বরং সেখানে সবাই তাঁকে দূর-দূর করে তাড়িয়ে দিল। তিনি রাস্তায় নেমে আসেন,এবং জনসম্মখে চিৎকার করে বলেন, “তোমরাই বল, কীভাবে উপার্জন করে আমার ও পরিবার সদস্যদের জীবন রক্ষা করবো?” তখন স্থানীয়পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে সংঘর্ষের এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে দুপুরের কম সময়ের আগে তিনি একটি ম্যাচ দিয়েনিজেকে পুড়িয়েদেন। তখন সে এক টিন গ্যাসোলিন জোগাড়করে নিজের গায়েআগুন ধরিয়েদেয়ওই গভর্নরের অফিসের সামনেই। তড়িঘড়িতাকে হাসপাতালে নিয়েযাওয়া হলে আঠারো দিন পর সে মারা যায়।

বৌজিজির মানষিক বিশ্লেষণ
শিক্ষিত বেকার বৌজীজী দশ বছর বয়স থেকে জীবন সংগ্রামে লিপ্ত, ছয় ভাইবোনের খরচ চালানোর জন্য সে চুরি-ছিন্তাই না করে একটি ছোট জিপে ভ্রাম্যমাণ সবজী বিক্রি করে।
মাসোয়ারা না দেওয়াতে পুলিশ তার বিক্রির লাইসেন্স না থাকার অজুহাতে উত্যক্ত, টর্চার এবং মালামাল জব্দ করে
বিচার ও নিজের সবকিছু ঠিক করে মালামাল ফেরত আনতে গেলে জনপ্রতিনিধি তাকে দূর-দূর করে তাড়িয়ে দেয়।
পুলিশের সাথে সংঘর্ষের পর নিজের চোখের সামনে ফুটে ওঠে অসহায় পরিবারের দুঃখ কষ্ট।তাই অপশাসনের বিরুদ্ধে জনগণকে সাহস জোগানোর নিমিত্তে নিজেকে আত্মাহুতি দেয় সে।
প্রশ্ন- কারা তাকে এই পথে যেতে বাঁধ্য করেছে? অথর্ব,অযোগ্য ও তাগুতি দালাল শাসকের কর্মকর্তাবৃন্দ নয় কি?
বৌজিজি আমাদের দেশসহ মুসলিম দেশসমূহের কাঁধে জগদ্দল পাথরের মত চেপে থাকা কুফরি,তাগুতি ও দালাল শাসকদের অধিনে অতিষ্ঠ ও নির্যাতিত জনতার প্রতিচ্ছবি।

খিলাফত ধ্বংস ও বিশ্বাসঘাতক শাসকের আবির্ভাব
উম্মাহ হিসেবে আমরা যখন আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের ব্যাপারে গাফলতি করেছি, তখন কুফ্ফার মুশরিক, মুনাফিকরা খিলাফতের গোঁড়া থেকে চক্রান্ত ষড়যন্ত্র করে আসছিল। ১৯২৪ সালে খলিফা আব্দুল মজিদ রহ. কে নির্বাসনে পাঠিয়ে খধঁংধহহব ঞৎবধঃু এর ইমপ্লিমেন্টেশন এবং তাদের অনুগত এই উম্মার সাথে বিশ্বাসঘাতকতাকারী কামাল আতা-তুরককে এই উম্মার ঘাঁড়ে বসিয়ে তাদের উদ্দেশ্য সফল করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেন এবং তার মিত্ররা সকল সৈন্য সরিয়ে নিচ্ছিল; তখন ব্রিটেনের হাউজ অব কমন্সে প্রতিবাদ হচ্ছিল। তার উত্তরে প্রবাস বিষয়ক সম্পাদক লর্ড কার্জন তার প্রতি উত্তরে বলেছিল, বর্তমান অবস্থা হল তুর্কি মৃত এবং কখনো এর উত্থান ঘটবেনা। কারণ, আমরা এর নৈতিক শক্তিকে ধ্বংস করে দিয়েছি।
[Turkez’s independence was officiall recognised with the implementation of the Lausanne Treatz signed the zear before on 24 Julz 1923. Britain and its allies withdrew all their troops that had occupied Turkez since the end of the First World War. In response to this, protests were made in the House of Commons to the British Foreign Secretarz Lord Curzon, for recognising Turkez’s independence. Lord Curzon replied, The situation now is that Turkez is dead and will never rise again, because we have destrozed its moral strength, the Caliphate and Islam.]

ব্রিটেন এবং ফ্রান্স `Szkes-Picot Agreement’ নামক গোপন চুক্তির মাধ্যমে খিলাফতবিহীন মুসলিম উম্মাহকে ভেঙ্গে তাদের অনুগত শাসক দিয়ে নানা দেশে সংকটের জন্ম দেয়। পাকিস্তানের পারভেজ মোশারফ, গিলানি, আফগাস্তানের হামিদ কারজাই, মিশরের সিইসি, হোসনি মোবারক, তিউনেসিয়ার বেনআলি। ধীরে ধীরে এই দেশসমূহ উপনিবেশিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়। মুসলিম দেশসমহে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি নানা মতবাদ-ধর্ম আমদানি করে এই উম্মাহর সন্তানদেরকে বিভ্রান্ত করে রাখা হয়।

মুসলমান শাসকদের কেউ এখন রাজতন্ত্রী, সমাজতন্ত্রী, কেউ ধর্মনিরপেক্ষ, জাতীয়তাবাদী ও আবার কেউ একনায়কতন্ত্রী হিসেবে পরিচিত। মধ্যপ্রাচ্যের কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, মরক্কোসহ অনেক দেশেই জনগণের পছন্দমত শাসক নির্বাচন করা যায়না। সেখানে কায়েম রয়েছে রাজতান্ত্রিক সরকার। তারা কোরআন নির্দেশিত আইন বাদ দিয়ে নিজেদের মনগড়া পন্থায় মুসলিম জনগণকে শাসন করছে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে কায়েম রয়েছে জাতীয়তাবাদী ধর্মনিরপেক্ষ সরকার। আবার আলবেনিয়া, আলজেরিয়া প্রভৃতি দেশে প্রতিষ্ঠিত আছে কমিউনিস্ট ও সমাজতন্ত্রী সরকার। একবিংশ শতাব্দির এই সময়ে (আলহামদুলিল্লাহ) পৃথিবীর দেশে দেশে উম্মার কিছু নিষ্ঠাবান সন্তান এই উম্মাহকে জাগানোর জন্য নিরলস কাজ করে গেছেন এবং যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে মিশরের হাসানুল বান্নাহ ও সাইয়েদ কুতুব রহ, শাইখ তাকি উদ্দিন আন নাবহানী অন্যতম।

আমরা যদি আবার আল্লাহর দেওয়া শাসন ব্যাবস্থার জন্য ঐক্যবদ্ধ হতে পারি, তাহলে আল্লাহ তা’আলা ওয়াদা দিচ্ছেন, “আর যদি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং পরহেযগারী অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের প্রতি আসমানী ও পার্থিব নেয়ামতসমূহ উম্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে পাকড়াও করেছি তাদের কৃতকর্মের জন্য। (সূরা আ‘রাফ-৯৬)

জাতীয়তাবাদী আরব লীগ
তিউনিশিয়া থেকে শুরু হওয়া স্পুলিঙ্গ দ্রুত আন্দোলনের দাবানল হয়ে ছড়িয়ে পড়ে মিশর, লিবিয়া, বাহরাইন, ইয়েমেন, মরক্কো, আলজেরিয়া, জর্ডান এবং সিরিয়াসহ আরবলীগের অন্তর্ভুক্ত অধিকাংশ দেশসসমুহে। এইজন্য আমাদেরকে প্রথমে এই জাতীয়তাবাদী সংগঠনের জন্মের ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে আরব দেশগুলির কিছু অংশ ছিল তুর্কি খেলাফতের অধিনে, আর অন্যগুলো ছিল ইউরিপিয় শক্তির অধীন।
১৯১৪ সালের ২৮ জুন বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভো শহরে অস্ট্রিয়ার যুবরাজ আর্চডিউক ফ্রানস ফার্ডিনান্ড এক সার্বিয়াবাসীর গুলিতে নিহত হন। অস্ট্রিয়া এ হত্যাকা-ের জন্য সার্বিয়াকে দায়ী করে এবং ওই বছরের ২৮ জুন সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এ যুদ্ধে দুই দেশের বন্ধু রাষ্ট্রগুলো ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ে। এতে যোগ দিয়েছিল সে সময়ের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী সকল দেশ। এভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) সূচনা হয়। তবে অস্ট্রিয়ার যুবরাজ হত্যাকা-ই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একমাত্র কারণ ছিল না। উনিশ শতকে শিল্পে বিপ্লবের কারণে সহজে কাঁচামাল সংগ্রহ এবং তৈরি পণ্য বিক্রির জন্য উপনিবেশ স্থাপনে প্রতিযোগিতা এবং আগের দ্বন্ধ-সংঘাত ইত্যাদিও প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের কারণ।

কেন্দ্রীয় শক্তি : প্রথম বিশ্বযুদ্ধে একপক্ষে ছিল ওসমানীয় সা¤্রাজ্য, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, জার্মানি ও বুলগেরিয়া। যাদের বলা হতো কেন্দ্রীয় শক্তি। মিত্রশক্তি : আর অপরপক্ষে ছিল সার্বিয়া, রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জাপান, ইতালি, রোমানিয়া ও আমেরিকা। যাদের বলা হতো মিত্রশক্তি।
তারপর চারটি সা¤্রাজ্যের পতন ঘটে। রোমান সা¤্রাজ্য বা রুশ সা¤্রাজ্য ১৯১৭ সালে, জার্মান ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সা¤্রাজ্য ১৯১৮ সালে এবং অটোমান সা¤্রাজ্য ১৯২২ সালে। অস্ট্রিয়া, চেকোস্কোভাকিয়া, এস্তোনিয়া, হাঙ্গেরি, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া এবং তুরস্ক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠে। অটোমান সা¤্রাজ্যের অধীনে থাকা অধিকাংশ আরব এলাকা ব্রিটিশ ও ফরাসি সা¤্রাজ্যের অধীনে আসে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রশক্তি মুসলিমদের ঢাল খিলাফত ব্যবস্থা ধ্বংস করার জন্য ২ টি কাজ করে।
১. তুরস্কের অভ্যন্তরে পশ্চিমা ভাবধারায় উজ্জীবিত গোপন জাতীয়তাবাদী আন্দোলন যুবতুর্কী আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদী এবং ধর্মনিরপেক্ষ ও সামরিক জেনারেল কামাল আতাতুর্ককে সহযোগিতা করে। যুবতুর্কী ক্ষমতায় এসেই খিলাফতের অধীন অন্যান্য মুসলিম দেশের নাগরিকদের বৈষম্যমূলক আচরণ শুরু করে এবং খিলাফতের অধীনে শান্তিতে বসবাসকারী আর্মেনীয়দের হত্যা করে। যা আরব জাতীয়তাবাদী চেতনার আন্দোলনকারীদের যুক্তিকে আরো দৃঢ় করে। পরবর্তীতে কামাল আতাতুর্ক ক্ষমতায় এসেই ১৯২৪ সালে খলীফা আবদুল মজিদকে নির্বাসনে পাঠিয়ে অফিশিয়ালি খিলাফত বিলুপ্ত ঘোষণা করে। পরাশক্তি অটোম্যান সমরাজ্য ভেঙ্গে ৫০ অধিক জাতীয়তাবাদী চেতনার রাষ্ট্র জন্ম লাভ করে, আর প্রায় প্রতিটি শাসক ছিল তাদের অনুগত।
২. অটোম্যান খিলাফত অধীন আরবদেশমূহের মধ্যে তাদের অনুগত খধ গবপপধ ধষ-ঐঁংধরহ রনহ অষর-এর নেত্রিত্বে এক ধরণের আরব জাতীয়তাবাদী চেতনার জন্ম দেয়, পরবর্তীতে আন্দোলনে রূপান্তরিত হয় যা আরব বিদ্রোহ (আরবি ভাষায় : الثورة العربية) ১৯১৬ এবং ১৯১৮ নামে পরিচিত। যা পরবর্তীতে আরবলীগের জন্ম দেয়।

THE McMahon LETTER TO La Mecca al-Husain bin Ali
October 24, 1915.
I have received your letter of the 29th Shawl, 1333, with much pleasure and your expression of friendliness and sincerity have given me the greatest satisfaction. I regret that you should have received from my last letter the impression that I regarded the question of limits and boundaries with coldness and hesitation; such was not the case, but it appeared to me that the time had not yet come when that question could be discussed in a conclusive manner. I have realized, however, from your last letter that you regard this question as one of vital and urgent importance. I have, therefore, lost no time in informing the Government of Great Britain of the contents of your letter, and it is with great pleasure that I communicate to you on their behalf the following statement, which I am confident you will receive with satisfaction. The two districts of Mersin a and Alexandretta and portions of Syria lying to the west of the districts of Damascus, Homs, Hama and Aleppo cannot be said to be purely Arab, and should be excluded from the limits demanded. With the above modification, and without prejudice to our existing treaties with Arab chiefs, we accept those limits. As for those regions lying within those frontiers wherein Great Britain is free to act without detriment to the interests of her ally, France, I am empowered in the name of the Government of Great Britain to give the following assurances and make the following assurances and make the following reply to your letter: (1) Subject to the above modifications, Great Britain is prepared to recognize and support the independence of the Arabs in all the regions within the limits demanded by the Sharif of Mecca. (2) Great Britain will guarantee the Holy Places against all external aggression and will recognize their inviolability. (3) When the situation admits, Great Britain will give to the Arabs her advice and will assist them to establish what may appear to be the most suitable forms of government those various territories. (4) On the other hand, it is understood that the Arabs have decided to seek the advice and guidance of Great Britain only, and that such European advisers and officials as may be required for the formation of a sound form of administration will be British. (5) With regard to the villages of Bagdad and Basra, the Arabs will recognize that the established position and interests of Great Britain necessitate special administrative arrangements in order to secure these territories from foreign aggression to promote the welfare of the local populations and to safeguard our mutual economic interests. I am convinced that this declaration will assure you beyond all possible doubt of the sympathy of Great Britain towards the aspirations of her friends the Arabs and will result in a firm and lasting alliance, the immediate results of which will be the expulsion of the Turks from the Arab countries and the freeing of the Arab peoples from the Turkish yoke, which for so many years has pressed heavily upon them. I have confined myself in this letter to the more vital and important questions, and if there are any other matters dealt with in your letters which I have omitted to mention, we may discuss them at some convenient date in the future. It was with very great relief and satisfaction that I heard of the safe arrival of the Holy Carpet and the accompanying offerings which, thanks to the clearness of your directions and the excellence of your arrangements, were landed without trouble or mishap in spite of the dangers and difficulties occasioned by the present sad war. May God soon bring a lasting peace and freedom of all peoples. I am sending this letter by the hand of your trusted and excellent messenger, Sheikh Mohammed bin Arif ibn Uraifan, and he will inform you of the various matters of interest, but of less vital importance, which I have not mentioned in this letter.
(Compliments).
(Signed): A. HENRY MCMAHON

https://web.archive.org/web/20060704235654/

ম্যাকমাহন চিঠি লা-মক্কা আল-হুসাইন ইবনে আলী’র প্রতি
(২৯ শাওয়াল, ১৩৩৩-এ আমি আপনার চিঠি খুব আনন্দের সহিত পেয়েছি। আপনার নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা আমাকে সর্বাধিক সন্তুষ্টি দিয়েছে। আমি দুঃখিত যে, আপনি আমার শেষ চিঠি থেকে খারাপ ধারণা পেয়েছিলেন যে সীমা ও সীমানা বিষয় প্রশ্নটি আন্তরিকতাহীন ও অগুরুত্বপূর্ণ হিসেবে নিয়েছি। আসলে বিষয়টি তেমন ছিল না, কিন্তু এটি আমার কাছে মনে হয়েছিল যে, তখনও সময় আসেনি যখন এই প্রশ্নটি একটি নিরপেক্ষ পদ্ধতিতে আলোচনা করা যেতে পারে। তবে আপনার শেষ চিঠি থেকে আমি বুঝতে পেরেছি যে, আপনি এই প্রশ্নটি অত্যাবশ্যক এবং জরুরী গুরুত্ব হিসেবে বিবেচনা করছেন। অতএব, আপনার চিঠির বিষয়বস্তু নিয়ে গ্রেট ব্রিটেনের সরকারকে তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আমি কোন সময় অপচয়য় করিনাই, এবং এটা খুবই আনন্দদায়ক যে আমি তাদের পক্ষ থেকে নিম্নলিখিত বিবৃতিতে আপনাকে জানাচ্ছি, যা আমি নিশ্চিত যে, আপনি সন্তুষ্টি হবেন। দুটি জেলা মেসিনা এবং আলেকজান্ড্রেটা এবং সিরিয়ার অংশ দামাস্কাস, হোমস, হামা এবং আলেপ্পো জেলার পশ্চিমে অবস্থিত, এই অঞ্চল বিশুদ্ধ আরব বলে বলা যায় না এবং এদেরকে দাবি করা সীমানা থেকে বাদ দেওয়া উচিত। উপরোক্ত সংশোধনের সঙ্গে এবং আরব নেতাদের সঙ্গে আমাদের বিদ্যমান চুক্তি সংস্কার ছাড়াই, আমরা দাবীকৃত সীমানা মেনে নিতে প্রস্তুত। উপরোক্ত অঞ্চল সমূহ যেখানে গ্রেট ব্রিটেন তার সহযোগী ফ্রান্সের স্বার্থের কেএইচওটি ছাড়া কাজ করতে পারে। আমি গ্রান্ট ব্রিটেন সরকারের নামে নিম্নোক্ত নিশ্চয়তা প্রদানের জন্য এবং নিম্নলিখিত নিশ্চয়তাগুলি প্রদান এবং ক্ষমতা হিসেবে আপনার চিঠি নিম্নলিখিত উত্তর দিচ্ছি : (১) উপরোক্ত পরিবর্তন সাপেক্ষে গ্রেট ব্রিটেন মক্কা শেরিফ দ্বারা দাবীকৃত সীমানার সব অঞ্চলে আরবের স্বাধীনতা স্বীকার। (২) গ্রেট ব্রিটেন সমস্ত বহিরাগত আগ্রাসনের থেকে পবিত্রস্থানের সুরক্ষার গ্যারান্টি হবে এবং তাদের অবস্থানকে নিশ্চিত করবে। (৩) যখন সঠিক সময় আসবে, তখন গ্রেট ব্রিটেন আরবদের পরামর্শ দেবে, আর তাদের সাহায্য করবে তাদের পক্ষে সবচেয়ে উপযুক্ত সরকার পদ্ধতি কি হতে পারে সে সম্পর্কে (৪) অন্যদিকে এটা বোঝা যায় যে আরবরা শুধুমাত্র গ্রেট ব্রিটেনের পরামর্শ ও নির্দেশনা খোঁজার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং ব্রিটিশ সিস্টেমে সুষ্ঠু আকারের প্রশাসন গঠনের কাজে ইউরোপীয় পরামর্শদাতা ও কর্মকর্তাদের প্রয়োজন হবে। (৫) আমাদের পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্বার্থে স্থানীয় লোকজনের কল্যাণে এবং বিদেশী আগ্রাসন সুরক্ষার নিমিত্তে বাগদাদ ও বসরায় প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপন বিশেষ প্রয়োজন।
আমি দৃঢ় বিশ্বাস করি যে এই ঘোষণার মাধ্যমে আমাদের আরব বন্ধুদের আকাক্সক্ষার বিষয়ে গ্রেট ব্রিটেনের সহানুভূতি ও আশ্বাস বিষয়ে আর কোন সন্দেহ থাকবেনা। ফলে একটি দৃঢ় ও দীর্ঘস্থায়ী জোট গঠিত হবে যার তাৎক্ষণিক ফলাফল হবে আরব থেকে তুর্কিদের বহিষ্কার করা এবং তুর্কি জোয়াল থেকে আরবদের মুক্ত করা

সংক্ষিপ্তভাবে ইতিহাসের আলোকপাত দ্বারা এই কথা সুস্পষ্টভাবে প্রমানিত হয় খিলাফত ধ্বংস ছিল সুপরিকল্পিত ও দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ফসল। কুফফারদের জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক, কারণ ইতিহাসে এই প্রথম সমগ্র মুসলিম বিশ্বজুড়ে তারা নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে সমর্থ হয়। ইউরোপীয় শক্তিসমূহ মুসলিম দেশ সমূহে উপনিবেশ স্থাপন করে এবং মুসলিম ভূমি সমূহকে বিভক্তি ও আধিপত্য বিস্তারকরন কৌশলের আওতায় বিভক্ত করে নেয়।
খিলাফত ধ্বংসের পর ব্রিটেন ও ফ্রান্স সাইকস-পিকোট চুক্তির মাধ্যমে মুসলিম ভূমিসমূহ নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগী করে নেয়। যেমন, ব্রিটিশরা অটোমান প্রদেশের মেসোপটেমিয়া (ইরাক) এবং সিরিয়া প্রদেশের দক্ষিণাঞ্চল (প্যালেস্টাইন ও জর্দান)। ফরাসিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল বাকি অটোমান সিরিয়া (আধুনিক সিরিয়া, লেবানন এবং বর্তমানে তুরস্কের হাটায় প্রদেশ) আল শামকে অর্থাৎ বৃহত্তর সিরিয়াকে খ- বিখ- করে জাতীয়তাবাদী নতুন জাতিরাষ্ট্রের পৃথক সীমান্ত রেখা সমূহ তৈরি করে।
এই সময়টি ছিল একটি যুগের শেষ ও অন্য যুগের শুরু। এই নতুন যুগকে ধরে রাখার জন্য পশ্চিমারা নিম্নোক্ত কৌশল অবলম্বন করে।
১। শাসন ব্যাবস্থা থেকে শরিয়ার অপসারণ এবং সাধারণভাবে মুসলিমদের উপর পশ্চিমা জীবন ব্যাবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষ আইনের প্রয়োগ।
২। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একধরণের পরোক্ষ উপনিবেশ জারি রাখা। এটা করে তারা দালাল শাসকদের মাধ্যমে অথবা নতুন বিশ্বব্যাবস্থার ধারক প্রতিষ্ঠানসমূহ যেমন, বিশ্বব্যাংক, জাতিসঙ্গ ইত্যাদির মাধ্যমে আমেরিকার থিংক ট্যাঙ্ক Rand ইসলাম বা মুসলিমদের সর্বোত্তম পন্থায় দমন করার জন্য ৪ভাগে বিভক্ত করেছে।
১. ঐতিহ্যবাদি বা Traditionalist বিভিন্ন পীর, তাবলীগ ও তাদের ভক্তবৃন্দ ও রাজতন্ত্র সমর্থন কারিরা।
২. চরমপন্থি বা Extremist যারা ইসলামকে পরিপূর্ণ জীবনব্যাবস্থা হিসেবে মানে এবং ব্যাক্তি, সমাজ, রাষ্ট্রে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং বিশ্বময় খেলাফত নিয়ে আসতে চায়।
৩. ধর্মনিরপেক্ষবাদি বা Secularist শরীয়া আইন চায়না, গনতন্ত্র চায়।
৪. আধুনিকতাবাদি বা Modernist পশ্চিমা ইহুদি-খ্রিস্টানদের রীতি-নীতি পছন্দ করে এবং ইসলাম নিয়ে একটুও মাথা ঘামায় না।
তবে Rand এর গবেষকরা Extremist বা চরমপন্থিদেরকেই হুমকি মনে করে। তবে মুসলিমদের কাউকেই তারা নিরাপদ মনে করে না। সকলকেই সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে।
এই ৪শ্রেণির মুসলিমদের কে কিভাবে একে অন্যের প্রতিপক্ষ করা যায় এবং যারা সত্যিকার মুসলিম (তাদের ভাষায় চরমপন্থি) তাদের থেকে বাকী ৩ শ্রেণীকে দূরে রাখা যায় এবং কিভাবে স্যেকুলার ও আধুনিকতাবাদিদের মাধ্যমে দালাল শাসক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ইত্যাদি তৈরি করা যায় সে সম্পর্কে মডারেট মুসলিম বিল্ডিং নেটওয়ার্ক নামে একটি গবেষণা পত্র তৈরি করেছে।

খিলাফা পরবর্তী উত্তর আফ্রিকার দেশগুলির সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক দিক

আলজেরিয়া
৫ জুলাই ১৯৬২ সালে ফ্রান্স থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৯৯ সালে সেনাবাহিনীর সমর্থনে আব্দেলাজজ বোটিফ্লিকা, তার বিরোধীদের নির্বাচন প্রত্যাখ্যানের পর একক প্রার্থী হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০০৪ এবং ২০০৯ সালে পুনরায় নির্বাচিত হন। ২০১১ সালে রুটি মূল্যে বৃদ্ধি এবং উচ্চ বেকারত্বের জন্য কঠোর প্রতিবাদ শুরু হয়। রাষ্ট্রপতি ১৯ বছর ধরে চলে আসা জরুরী অবস্থার বিলুপ্ত ঘোষণা করতে বাধ্য হয়

মিশর
২২ ফেব্রুয়ারি ১৯২২ যুক্তরাজ্যের দখলদারিত্ব থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। ০১ নভেম্বর ১৯৫২ সালের বিপ্লবের মাধ্যমে ব্রিটিশ সৈন্যদের খেঁদিয়ে এবং তাদের সমর্থনপুষ্ট রাজতান্ত্রিক ব্যাবস্থা বিলুপ্ত করে ১৮ জুন ১৯৫৩ সালে প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ঘোষণা করে। হোসনী মোবারক ১৯৮১ সালে ক্ষমতায় এসেছিলেন। তাহির স্কয়ারে বিক্ষোভের দিন ২০১১ সালে পদত্যাগ করে। নভেম্বর ২০১১ সালে, একটি প্রচলিত প্রচলন দ্বারা চিহ্নিত জলবায়ু যে কঠোরভাবে সামরিক দ্বারা দমন, ভোটের অপারেশন শুরু। পিপলস অ্যাসেম্বলি (মজলিস আল-শাব) নির্বাচিত ৫০৮ জন ডেপুটিকে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করার অভিযোগে একটি কমিশন মনোনীত করতে হবে। মুবারক পতনের পর দেশের নেতৃত্ব গ্রহণ করে সেনাবাহিনী, ২০১২ সালের জুন মাসের জন্য নির্ধারিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর বেসামরিক নাগরিকদের ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

লিবিয়া
২০শ শতকের প্রথমভাগে ইতালীয়রা দেশটিকে একটি উপনিবেশে পরিণত করে। ১৯৫১ সালে দেশটি একটি স্বাধীন রাজতন্ত্রে পরিণত হয় এবং ১৯৬৯ সালে তরুণ সামরিক অফিসার মুয়াম্মার আল-গাদ্দাফি ক্ষমতা দখল করেন। গাদ্দাফি তাঁর সমাজতন্ত্র ও আরব জাতীয়তাবাদের তত্ত্ব অনুযায়ী এক নতুন লিবিয়া গঠন করেন। তিনি লিবিয়াকে একটি সমাজতান্ত্রিক আরব গণপ্রজাতন্ত্র আখ্যা দেন। তবে লিবিয়ার বাইরের লোকদের কাছে দেশটি একটি সামরিক একনায়কতন্ত্র হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিল।
১৯৬৯ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন, রাজতন্ত্র উৎখাত করে আরব প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেন। ২০১১ সালে বেনগাজিতে সরকার বিরোধী বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ১৯৭৩ সালের প্রস্তাবটি গ্রহণ করে। লিবিয়ার ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের জন্ম হয়। ৮ মাস গৃহযুদ্ধের পর, ২০১২ সালের ২০ অক্টোবর, সির্তে গাদ্দাফি নিহত হয়।

মরক্কো
০২ মার্চ ১৯৫৬ সালে ফ্রান্স থেকে রাজা মুহম্মদ ষষ্ট তার বাবা হাসানের মৃত্যুর পর ১৯৯৯ সালে ক্ষমতায় আসেন। ২০১১ সালে, হাজার হাজার লোক রাজনৈতিক সংস্কারের আহ্বান জানায় এবং রাজার ক্ষমতাকে সীমিত করে দেয়।

তিউনিসিয়া
২০ মার্চ ১৯৫৬ ফ্রান্স থেকে ১৯৮৭ সালে জিন এল-আবিদি বেন আলী রাষ্ট্রপতি হাবিব বোরঘিবাকে হটিয়ে ক্ষমতায় আসেন। ব্যাপক বিক্ষোভের পর ১৪ জানুয়ারী ২০১১ তারিখে বেন আলী দেশ ছেড়ে সৌদি আরবে আশ্রয় নেয়। দেশ পরিচালনার জন্য সাময়িক সরকার গঠিত হয়। অক্টোবর ২০১১ সালে সাংবিধানিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে মধ্যপন্থী ইসলামী দল একটি নাহদা (পুনর্জন্ম) দ্বারা জিতে।

তথ্যসূত্র : সিআইএ, দ্য ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক, নভেম্বর ২০১১; মেজরান, কলম্বো, ভেন জেনুটেন, ভূমধ্যসাগরীয় আফ্রিকা; ইন্টেসা সান পাওলো ও মেনা ।

চলবে…