আইসিটি আইন ও ৫৭ধারা বিশ্লেষণ; এডভোকেট এম. হাছিবুল ইসলাম

0
11

২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে তৎকালীন সরকারের মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসে ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ নামে একটি আইন করা হয়েছিল। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার শুরুর দিকে ২০০৯ ও ২০১৩ সালের শেষ দিকে এসে ধারাটিকে সংশোধনের নামে আরো কঠিন করে ফেলে। আমাদের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা, বিবেক ও ভাষণের স্বাধীনতা নামে মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। আইসিটি আইনের অধীনে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতাকে খর্ব করা হয়েছে।

আইসিটি আইন ২০০৬-এর ৫৭ (১) ধারায় বলা আছে কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোন ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্ভুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করতে পারে বা এ ধরণের তথ্যাদির মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানী প্রদান করা হয়, তাহা হইলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ। আমলযোগ্য, অ-জামিনযোগ্য এবং শাস্তির সর্বনিম্নসীমা ৭বছর জেলের কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু আইসিটি আইনের ৫৭ (১) অনুচ্ছেদে অপরাধের যে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে তা স্পষ্ট নয় এবং অভিযুক্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কোন লেখকের পক্ষেই বোঝা সম্ভব নয় যে কী লিখলে তা অপরাধ বলে গণ্য হতে পারে। একইভাবে কোন ধরণের মন্তব্যকে ‘কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানী প্রদান’ বলে চিহ্নিত করা হবে, তারও কোন সীমা-রেখা টানা নেই। আদৌ কারো অনুভূতিতে আঘাত লাগলো কিনা, অথবা কারো অনুভূতিতে আঘাত করার আদৌ কোন উদ্দেশ্য লেখকের ছিল কিনা, তাও যাচাই করার সুযোগ রাখা হয়নি। কেউ যদি মনে করে যে, আপনার অনলাইনে মন্তব্য কারো ‘অনুভূতিতে আঘাত করতে পারে’ সে ক্ষেত্রে পুলিশ আপনাকে বিনা ওয়ারেন্টেই গ্রেফতার করতে পারবে এবং কাউকে অ-জামিনযোগ্যভাবে আটক করে রাখা সম্ভব।

লঘু পাপে গুরুদণ্ড
ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে তথ্য প্রকাশের কারণে কারো কতটুকু মানহানি ঘটলো, বা আইন শৃঙ্খলার কতটুকু অবনতি ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হলো, তার মাত্রা পরিমাপের সুযোগ বিজ্ঞ আদালতকে না দিয়ে, এই আইনের ন্যূনতম সাজা সাত বৎসর রাখা হয়েছে, যা লঘু পাপে প্রচ-কমের গুরুদ-ের সামিল। কয়েকটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে-
১. বাংলাদেশে আপনি যদি মদ খেয়ে মাতাল হয়ে কারো বাড়িতে প্রবেশ করে (ঃৎবংঢ়ধংং) কাউকে বিরক্ত বা উত্যক্ত করেন, তাহলে পেনাল কোডের ৫১০ধারা অনুযায়ী আপনার শাস্তি হবে সর্বোচ্চ ২৪ঘন্টার জেল বা ১০টাকা জরিমানা বা উভয়দ-।
২. আপনি যদি কোন দাঙ্গা বা রায়টে যোগ দিয়ে সরাসরি কোন সহিংসতায় অংশগ্রহণ করেন, তাহলে পেনাল কোডের ১৪৭ধারা অনুসারে আপনার সর্বোচ্চ শাস্তি হবে ২বছরের জেল। এই দাঙ্গায় আপনি যদি এমন কোন মরণাস্ত্র নিয়ে বের হন যা দ্বারা কাউকে হত্যা করা সম্ভব, তাহলে পেনাল কোডের ১৪৮ধারা অনুসারে আপনার সর্বোচ্চ শাস্তি হবে ৩বছরের জেল।
৩. কেউ কোনভাবে কাউকে চিঠি লিখে বা ফোন করে বা সরাসরি হত্যা করার বা ব্যাপক ক্ষতিসাধন করার হুমকী প্রদান করেন, তাহলে পেনাল কোডের ৫০৬ধারা অনুসারে তার শাস্তি সর্বোচ্চ ২বছর, আর যদি এই হুমকী বেনামে করে থাকেন, তাহলে পেনাল কোডের ৫০৭ধারা অনুসারে শাস্তি সর্বোচ্চ আরো ২বছর।
৪. কোন ব্যক্তি যদি মুদ্রিত কোন মাধ্যমে কিছু প্রকাশ করে বা অন্য যে কোন উপায়ে কারো মানহানি করে বা কুৎসা রটনা করে, তাহলে পেনাল কোডের ৫০০ধারা অনুসারে সর্বোচ্চ শাস্তি হবে ২বছরের জেল। কিন্তু অনলাইনে আপনার কোন লেখায় কেউ যদি প্রমাণ করে যে তার মানহানি ঘটেছে, তাহলে সংশোধিত আইসিটি আইন অনুসারে আপনার শাস্তি হবে সর্বনি¤œ ৭বছর থেকে সর্বোচ্চ ১৪বছরের জেল এবং অনধিক এক কোটি টাকা জরিমানা! শুধু তাই নয়, সর্বনি¤œ শাস্তি নির্ধারণে বিজ্ঞ আদালতের ক্ষমতা সীমিতও করা হয়েছে। এছাড়া গ্রেফতারের অনুমতি ও জামিন দেয়ার ক্ষমতা রহিত করে আদালতের ক্ষমতা ব্যাপকভাবে খর্ব করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এক পরিসংখ্যানের সূত্রে দেখা যায়, গত ছয় মাসে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ৩৯১টি মামলা হয়। এর বেশির ভাগ ৫৭ ধারায়। তাতে আসামি ৭৮৫ জন, গ্রেপ্তার ৩১৩ জন। সম্প্রতি আইসিটি আইনের ৫৭ধারায় মামলা দায়েরের সংখ্যা বাড়ছে। এ বছরের প্রথম ছয় মাসেই এই ধারায় দেশের বিভিন্ন জেলায় ২০টির বেশি মামলা হয়েছে।

অপরাধের সংজ্ঞা :
বাংলাদেশের পেনাল কোডে অপরাধের সংজ্ঞা এমনভাবে দেয়া হয় যেন অপরাধ করার আগেই একজন মানুষ বুঝতে পারে কী কী করলে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে। উদাহরণ স্বরূপ পেনাল কোডের ১৭৭ধারার কথা বলা যেতে পারে। যেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দেয়া বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্ট করে বলা হয়। উদাহরণ স্বরূপ যদি প্রমাণিত হয় যে ‘ক’ কোন একটি লেখা সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে লেখার পর ‘খ’ তার পত্রিকায় এটিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে জনরোষ সৃষ্টির চেষ্টা করে, তাহলে উদ্দেশ্য বিচারে এখানে ‘ক’ কে নির্দোষ ও ‘খ’ কে দোষী সাব্যস্ত করার বিধান আছে। কিন্তু আইসিটি আইনের ৫৭ধারায় পুরো দায় ‘ক’ এর উপর চাপানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, সাধারণতঃ কোন ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণ হবার আগ পর্যন্ত তাকে নির্দোষ বিবেচনা করার রীতি আছে এবং কাউকে তাকে অপরাধী প্রমাণ করা না গেলে সাধারণতঃ তার দায় অভিযোগকারীর উপরেই বর্তায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির নামে যে কোন মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করে তাকে হয়রানি করা সম্ভব।

ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট ২০১৮
গত কিছুদিন পূর্বে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট-২০১৮ নামে নতুন একটি আইন মন্ত্রীসভায় পাশ হয়েছে।
১. আইসিটি আইনের ধারা ৫৭ অপরাধমূলক ‘ইলেকট্রনিক আকারে জাল, অশ্লীলতা বা প্রতিলিপি তথ্য প্রকাশ’ আইনের এই বিধান অধীন একটি অপরাধ অন্তত সাত বছর সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদন্ডে দ-নীয়। জরিমানাহিসাবে ১০ মিলিয়ন টাকা হিসাবে উচ্চ হতে পারে।
২. বাকস্বাধীনতা এবং অভিব্যক্তি স্বাধীনভাবে বিবাদ করার জন্য এটি সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিকরা এটিকে ‘ড্রেক্যানিয়ান’ বলে উল্লেখ করে বলেছেন আইন-প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি এটির অপব্যবহার করতে পারে।
৩. আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সাংবাদিকরা ৫৭ধারায় ‘ড্রেক্যানিয়ান’ বলেছে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি তাদের অপব্যবহার করছে বলে বলছে। ফাইল ছবির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সাংবাদিকরা ৫৭ধারায় ‘ড্রেক্যানিয়ান’ বলেছে, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলি তাদের অপব্যবহার করছে বলে বলছে। ফাইলছবির আইসিটি আইন ২০০৬ সালে তৈরি করা হয়েছিল এবং ২০০৯ এবং ২০১৩ সালে দুবার সংশোধিত হয়েছে। সর্বশেষ সংশোধন ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদ- এবং ধারা ৫৭-এর অধীন দাবি ত্যাগ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট, যদিও, চার্জগুলির মাধ্যাকর্ষণের উপর নির্ভর করে জামিনযোগ্য এবং অ-জামিনযোগ্য উভয়দ-ের বিধান রাখা হয়েছে। অপরাধ এবং শাস্তি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতে অননুমোদিত অ্যাক্সেস বা হ্যাকিং ৭ বছর পর্যন্ত জেল বা জরিমানা বা উভয় ২.৫ মিলিয়ন টাকা; হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ডাটা অবকাঠামো ধ্বংস করা বা চুরি করা ১৪ বছরের জেল পর্যন্ত বা ১০ মিলিয়ন পাউন্ড জরিমানা বা উভয়ই;
কম্পিউটার বা ডিজিটাল ডিভাইসের অননুমোদিত অ্যাক্সেস-১ বছর পর্যন্ত জেল বা ৩০০,০০০ টাকা জরিমানা বা উভয়ই; কম্পিউটার বা ডিজিটাল ডিভাইসগুলিতে বেআইনিভাবে অ্যাক্সেস করার বা প্রচারের জন্য ৩ বছর পর্যন্ত জেল বা ১ মিলিয়ন টাকা জরিমানা বা উভয়ের জন্য; কম্পিউটার বা কম্পিউটার সিস্টেম থেকে অবৈধভাবে অনুলিপি করা, অনুলিপি করা বা স্থানান্তর করা ৭ বছর পর্যন্ত জেল বা ১ মিলিয়ন টাকা জরিমানা বা উভয়ই; সোর্সকোড ধ্বংস বা পরিবর্তন করা হচ্ছে- ৩বছর পর্যন্ত জেল বা ৩০০,০০০টাকা জরিমানা বা উভয়ই; ইন্টারনেটে পোস্টিং বা ডিজিটাল প্রজেক্টে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা আঘাত করে-১০ বছর জেল বা জরিমানা বা উভয় পর্যন্ত ২মিলিয়ন টাকা; ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বা ইলেকট্রনিক ফর্মের মাধ্যমে দ-বিধির সাথে লেনদেনের অপরাধগুলি- ৩বছর পর্যন্ত জেল বা জরিমানা বা উভয় ক্ষেত্রে ০.৫মিলিয়ন টাকা; ইন্টারনেটে পোস্টিং বা ডিজিটাল আকারে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা ঘৃণা তৈরি বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বা অস্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য ১০ বছরের জেল বা জরিমানা বা উভয় পর্যন্ত ২মিলিয়ন টাকা ব্যয়ে প্রচার করা; ব্যাংক, বীমা বা অন্য কোন আর্থিক পরিষেবা প্রদানকারীর থেকে অননুমোদিত অনলাইন লেনদেন- ৫বছর পর্যন্ত জেল বা জরিমানা বা উভয় পর্যন্ত ০.৫মিলিয়ন টাকা; সামগ্রী পাঠানো ওয়েবসাইট বা ইলেকট্রনিক আকারে আক্রমণ বা হুমকির মুখে ৩বছর পর্যন্ত জেল বা ৩০০,০০০টাকা জরিমানা বা উভয়ই; কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোন ইলেকট্রনিক ফর্মের পাশাপাশি এই ধরনের প্রচেষ্টার সহায়তা ও প্রচারে সরকার, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলির গোপনীয় ও গোপনীয় তথ্য সংরক্ষণ এবং স্থানান্তর করা এবং গুপ্তচরবৃত্তি হিসাবে বিবেচিত হবে ১৪ বছর জেল বাজরিমানা ২.৫ মিলিয়ন বা উভয়ই। বাইনারি প্রযুক্তি ব্যবহার করে যে কোনো এবং সবকিছুই ‘ডিজিটাল’ হিসেবে বিবেচিত হবে, বৈদ্যুতিক, ডিজিটাল, চুম্বকীয়, অপটিক্যাল, বায়োমেট্রিক, ইলেক্ট্রেকমিকাল, ইলেক্ট্রো মেকনিক্যাল, বেতার এবং ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক টেকনোলজিসহ।

তথ্য-প্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭ধারার বিলুপ্তি ঘটিয়ে নতুন করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়নে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এ আইন মানুষের বাকস্বাধীনতা হরণ করবে। মানুষ ভীত হয়ে পড়বে। তারা কথা বলতে ভয় পাবে। ৫৭ধারার যে অপপ্রয়োগ হচ্ছিল নতুন আইন অন্যভাবে প্রকাশ পাবে। আইনের ৩২ধারা সরকারি-আধাসরকারি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কেউ যদি বেআইনিভাবে প্রবেশ করেন এবং কোনো ধরনের তথ্য উপাত্ত যে কোনো ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে গোপনে রেকর্ড করেন তা গুপ্তচরবৃত্তি হিসেবে গণ্য হবে। এজন্য ১৪বছরের জেল এবং ২০লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এ ধারার অপরাধ কে জামিনঅযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আইনের ২৯ধারায় বলা হয়েছে, কেউ মানহানিকর তথ্য দিলে তার বিরুদ্ধে তিন বছরের জেল ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ৩১ধারায় ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে অরাজকতা সৃষ্টির জন্য সাত বছরের জেল ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের এসব ধারা সমাজে আতঙ্ক তৈরি করবে। ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহসী হবেননা। বিশেষকরে গণমাধ্যমের সাথে জড়িতরা হয়রানির শিকার হবেন। এ প্রসঙ্গে প্রবীণ সাংবাদিক ও বিশ্লেষক মাহফুজ উল্লাহ বলেন, নতুন এ আইনের উদ্দেশ্য হচ্ছে স্বাধীন চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করা। ক্ষমতাসীনদের অপরাধের ঢাকনা বন্ধ করা। এ আইন লঙ্ঘন করলে ১৪বছরের কারাদ- বা এককোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার যে বিধান রাখা হয়েছে তা আমাদের এই দেশে অকল্পনীয়। তিনি বলেন, এ আইনে নতুন যে অপরাধের কথা বলা হয়েছে এটা ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কোনো আলোচনা করা যাবেনা, মুক্তভাবে কোনো কথা বলা যাবেনা, এর ফলে হয়তো মানুষ সতর্ক হবে। তবে দেশে যে মুক্তবুদ্ধি চর্চা হতো তার পথ রুদ্ধ হবে। মুক্তচিন্তার জগতটা একটি বদ্ধ জলাশয়ে পরিণত হবে। মাহফুজ উল্লাহ বলেন, এই আইনের মাধ্যমে সরকার প্রতিপক্ষকে আঘাত করবে। তবে বিরোধী দল দমন হবে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। এ আইন পাস হলে আওয়ামী লীগই প্রথম এর শিকার হবে, এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, নতুন যে আইনটি করা হয়েছে তা আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ধারার চেয়েও খারাপ একটা আইন। কারণ এখানে আরো নতুন ধরনের অপরাধ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখন ৫৭ধারার অপরাধগুলোর সংজ্ঞায় যে অস্পষ্টতা ছিল সেটাও অব্যাহত রাখা হয়েছে এবং এ আইনের বিষয়ে বিশদ যে অপরাধের বর্ণনা দেয়া হয়েছে তাতে এ আইনের দ্বারা বাংলাদেশে ভিন্নমত চর্চা করা, বিরোধী রাজনীতি করা, সরকারের কোনো এমপি-মন্ত্রী বা সমাজের যে কোনো পাওয়ারফুল লোকের বিরুদ্ধে সৎসাংবাদিকতা করা, তার বিরুদ্ধে কোনো শব্দ উচ্চারণ করা, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। এ আইন করার মধ্য দিয়ে সরকারের পাওয়ারফুল সেকশন তাদের অন্যায়-অবিচার, জুলুম যেটার বিরুদ্ধে সৎসাংবাদিকতা করা, এটার বিরুদ্ধে কথা বলার সুযোগ বন্ধ করতে চাচ্ছে। তিনি বলেন, আমি মনে করি বিরোধী রাজনীতিক নয়, সমাজের যে কোনো শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ, বিশেষ করে রাজনীতিবীধ ও সাংবাদিক এ আইনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো উচিত। এ আইন যদি বাস্তবায়ন হয় তাহলে বাংলাদেশে সৎ সাংবাদিকতা করা, স্বাধীন কণ্ঠে কোনো বিষয়ে সমালোচনা করা, বিরোধী রাজনীতি করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-আগে এ ধরনের আইন করার বিশেষ উদ্দেশ্য আছে বলে আমি মনে করি।
এ প্রসঙ্গে সিনিয়র সাংবাদিক ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজে’র সভাপতি শওকত মাহমুদ বলেন, নতুন যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন হচ্ছে এ আইনে সম্পূর্ণভাবে মুক্তমত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছে। বাক-স্বাধীনতা রুদ্ধ ও মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষুণœ করা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে বলা যায়, এ আইন বাস্তবায়ন হলে মানবাধিকার লঙ্ঘন হবে। সরকারের কোনো অফিসের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করলে তারা বলবে আমাদের অনুমতি নেয়া হয়নি। এটাতো হতে পারেনা। এ আইনের ফলে গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকা হলো।