সরকারের ভেতরে এক চেহারা বাইরে আরেক : মির্জা ফখরুল

0
55

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যমে সরকার গত দশ বছরে একটি ভয়ঙ্কর ভীতির পরিবেশ তৈরি করেছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে, সংসদ ভেঙ্গে দিতে হবে। এরপর নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করে জাতীয় নির্বাচন হতে হবে। একইসাথে বিএনপির চেয়ারপারসন কারাবন্দী বেগম খালেদা জিয়াকেও অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে সঙ্কটের সমাধান ও সব গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কথা বলেন তিনি। ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে’ এই সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন।

প্রধান অতিথির বক্তৃতায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, গণতন্ত্রের রক্ষা কবচ হলো মুক্ত গণমাধ্যম। এটা মুক্ত না থাকলে গণতন্ত্র থাকে না। পাকিস্তান আমল থেকে সাংবাদিক ভাইদেরকে সংগ্রাম করতে হয়েছে। কিন্তু যে লক্ষ্য নিয়ে আমাদের স্বাধীনতা। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মুক্ত চিন্তার জন্যই আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। আজকে কি সেই বাংলাদেশ? আমরা লড়াই করেছিলাম যে আমরা ভিন্ন চিন্তা করতে পারব। কিন্তু এখানে লিখলে গুম হতে হয়, জেলে যেতে হয়। প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছাড়তে হয়েছে সাংবাদিকদেরকে। বহু সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। অনেককে হুমকি দেয়া হয় যে আপনার স্ত্রী বা সন্তানকে তুলে নিয়ে যাবো।

বিএফইউজে এর সভাপতি রুহুল আমিন গাজীর সভাপতিত্বে ও ডিইউজের সহসভাপতি শাহীন হাসনাতের সঞ্চালনায় সভায় বর্তমান সরকারের ৯ বছর শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএফইউজের মহাসচিব এম আব্দুল্লাহ। আরো বক্তব্য দেন আমাদের দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, বিএফইউজে’র সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ, ডিইউজের সভাপতি কাদের গনি চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম, জাতীয় প্রেসক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান প্রমুখ।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আসলে দেশে ফ্যাসিবাদ যখন প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। তখন সর্বত্র ভয় তৈরি হয়। গণমাধ্যমে নির্দেশনা দেয়া হয়। এ ধরনের গণমাধ্যম আমরা তৈরি করেছি। সরকার মুখে বলছে মুক্ত গণমাধ্যম। অথচ ভিন্ন ধরনের সেন্সরশিপ আরোপ করছে। পত্রিকায় কোন নিউজ যাবে আর কোন নিউজ যাবে না তা সরকারের লোকজন নির্ধারণ করে দিচ্ছে।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, জাতির সাথে জঘন্য প্রতারণা ও ডাবল স্ট্যান্ডার্ড করা হচ্ছে। সরকার মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে কিন্তু বাস্তবে কাজের মধ্যে ভয়ঙ্কর ফ্যাসিবাদী। ভেতরে এক চেহারা আর বাইরে আরেক চেহারা। মুখে বলে ভালো করছে। আসলে গত দশ বছরে ভীতির সমাজ তৈরি করেছে। যে সমাজে কথা বলতে ভয়। লিখতে ভয়। এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড আমাদেরকে শেষ করতে হবে।

মির্জা ফখরুল বলেন, বর্তমান অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে যারা গণতন্ত্রের পক্ষে আছেন তাদের জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। একটি বিষয়কে সামনে নিয়ে কাজ করতে হবে। সেটা হল গণতন্ত্রকে মুক্ত করা। আমাদের স্পষ্ট কথা পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে হবে নির্বাচনের আগে। প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। সেনাবাহিনী মোতায়েন করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে হবে।
‘কাউকে নির্বাচন না করলে তো আর জেলে দেব বলতে পারব না’- গতকাল সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর এমন মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি মহাসচিব বলেন, আপনি নির্বাচনে আনবেন কেমনে?
নির্বাচনের আগেই তো সবাইকে জেল দিচ্ছেন। বর্তমান নির্বাচন কমিশন মেরুদ- বিহীন। যখন তাদেরকে ফোনে বলি তারা বলে সবই ঠিক আছে। খুলনার ক্যান্ডিডেট বাধ্য হয়ে প্রচারণা থেকে সরে এসেছে। গাজীপুরের এসপি আওয়ামী লীগের দলীয় ক্যাডার। যেই এসপি হুইপকে মেরেছিল। এটা সবার জানা। আমরা প্রতিনিধিকে পাঠিয়ে নির্বাচন কমিশনকে বলেছি। কিন্তু আমরা প্রথমদিনই বলেছি গাজীপুরের এসপিকে সরাতে হবে। কারণ সে চিহ্নিত আওয়ামী লীগার। সে প্রথম দিনই জামায়াতের ৪৫ জন নেতাকে গ্রেফতার করেছে। নির্বাচন কমিশনের কোন আইনে এসব আছে যে গ্রেফতার করতে হবে? পুলিশ গ্রেফতার করছে কোন আইনে? তাহলে এখন কোথায় নির্বাচন? কিসের নির্বাচন? গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার কি আছে? এভাবে তো হবেনা। কিন্তু আমরা বলতে চাই কতজনকে সরাবেন? গুম করবেন করতে পারেন। তবে এই ধরনের নির্বাচন এবার মানুষ আর মেনে নেবে না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন দেশের মানুষ আর হতে দেবে না।

মির্জা ফখরুল বলেন, দেশে আইনের শাসন নেই। যা আছে তা তাদের আইন। নিজেরা আইন বানিয়েছে। সংবিধানকে কেটে ছিঁড়ে টুকরা টুকরা করেছে। সেটা কিসের সংবিধান? আমরা বলব আসুন, বসুন আলোচনা করুন। কথা বলে সঙ্কটের সমাধান করুন। আজকে সব গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তবে বিজয়ী হবো।

তিনি সবার উদ্দেশে বলেন, এ লড়াই কঠিন লড়াই। অস্তিত্বের লড়াই। শহীদ জিয়া বাকশাল বিলুপ্ত করে বহুদলীয় গণতন্ত্র দিয়েছিলেন। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দিয়েছেন। জনগণের কথা বলা লেখার স্বাধীনতা দিয়েছেন। মাত্র ৬ দিন প্রকাশনা বন্ধ রেখে সাংবাদিকেরা যেভাবে এরশাদের পতন ঘটিয়েছিল আজো সাংবাদিকেরা ঐক্যবদ্ধ হলে এই সরকার পড়ে যাবে। এই সরকার হলো গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় শত্রু। এই আওয়ামী লীগ ১/১১’র সরকারের প্রতিনিধিত্ব করে চলছে। সম্পূর্ণ মিথ্যা অপরাধে খালেদা জিয়াকে জেলে আটক রাখা হয়েছে। লুট করে করে খালি করে ফেলেছে ব্যাংকগুলো। সব টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। কিন্তু অর্থমন্ত্রী বলেছেন- ব্যাংকিং খাত নাকি এখনো ততটা খারাপ হয়নি। তাহলে কি বাংলাদেশ ব্যাংক তুলে নিয়ে গেলে খারাপ হয়েছে বলবেন?

দেশে গণমাধ্যম দুই ভাগে বিভক্ত মন্তব্য করে মাহমুদুর রহমান বলেন, একটি হলো স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপ গ্রুপ আরেকটি দালাল গ্রুপ। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারে বাধা দেয়া মানে সংবিধান ও স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া। তিনি তো দেশের নাগরিক। আদালত এধরনের রায় দিয়ে নাগরিকের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বাক স্বাধীনতা হরণ করলেন।
খালেদা জিয়ার জামিন শুনানি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নিয়ম হচ্ছে আপিল গৃহীত হওয়ার পর জামিন না চাইলেও জামিন হয়ে যাবে। জামিন শুনানির জন্য তিন মাস পর ডেট দেয় এটা পৃথিবীর ইতিহাসে নেই। ১/১১’র মতো ভারত-শাসিত সেনা শাসন চলছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

মাহমুদুর রহমান বলেন, এরশাদ ছিল জাতীয় বেহায়া স্বৈরাচার, আর এখন শাসন করছে বিশ্ব স্বীকৃত স্বৈরাচার। আসুন মোদির দুই দালাল স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করি। আসুন জাতীয় প্রেসকক্লাবের সামনে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার মঞ্চ করি। সেখানে প্রয়োজনে গুলি করে মেরে ফেলুক আমাদের। আমি সেখানে সবার আগে যেতে প্রস্তুত।

শওকত মাহমুদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে গণমাধ্যমে সেন্সরশিপ হচ্ছে। আজকে গোয়েন্দা সেন্সরশিপের পাল্লায় পড়েছে মিডিয়া। বর্তমান স্বৈরাচার সরকার অতীতে আমরা দেখিনি। তবে বাংলাদেশে একসময় গণমাধ্যমের সুবাতাস বইবে। সুষ্ঠু নির্বাচন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সব কালাকানুনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। রুহুল আমিন গাজী বলেন, দেশে কার্যত বাকশালী শাসন চলছে। মিডিয়ার স্বাধীনতা নেই। তিনি অবিলম্বে বন্ধ মিডিয়া খুলে দেয়া ও সাংবাদিকদের মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান।

কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারার মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে সাংবাদিকদের হাতকড়া ও বেড়ি পরানো হয়েছে। সাংবাদিক মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখতে সবাইকে এগিয়ে আসার কথা বলেন তিনি।

শহিদুল ইসলাম বলেন, দেশে গণতন্ত্র ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নেই। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ফেরাতে গণতন্ত্র ফেরাতে হবে। এ জন্য আন্দোলন করতে হবে। ইলিয়াস খান বলেন, আজকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বলতে কিছু নেই। তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নের সাথে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি জড়িত। তিনি অবিলম্বে বেগম জিয়ার মুক্তি দাবি করেন।

 সূত্র : নয়াদিগন্ত
পরীক্ষামূলক সম্প্রচার