বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত : অর্থ লুটের খতিয়ান -আল আমিন খান

0
307

আধুনিক পুজিঁবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ব্যাংক একটি দেশের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকা শক্তি। এই ব্যাংক পুজিঁবাদের নিয়ামক শক্তিও বটে। এই আর্থিক প্রতিষ্ঠান; যা সাধারণ মানুষের সঞ্চয় সংগ্রহ করে পুঁজি গড়ে তোলে এবং সেই পুঁজি উদ্যোক্তাদের ঋণ দিয়ে বিনিয়োগে সাহায্য করে। দেশ-বিদেশের অর্থনৈতিক কর্মকা-কে সচল ও কার্যকর রাখতে এর ভূমিকা অপরিসীম। ব্যক্তি কিংবা রাষ্ট্রীয় সঞ্চয়, লেন-দেন ইত্যাদির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে থাকে এ প্রতিষ্ঠানটি।

ব্যাংক ব্যক্তি কর্তৃক প্রদেয় সঞ্চিত অর্থ জমা রাখে এবং ঐ অর্থ ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানে ঋণ দিয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। নির্দিষ্ট সময় বা মেয়াদান্তে গ্রাহকের জমাকৃত অর্থের উপর সুদ বা মুনাফা প্রদান করে। । বলতে গেলে ব্যক্তি,প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্রীয় সঞ্চয়ের সিংহভাগ সঞ্চয় ই ব্যাংকে সঞ্চিত। ভিন্ন ভাবে বললে জাতির প্রায় সিংহভাগ সম্পদ ব্যাংকগুলোতে সঞ্চিত। এই সঞ্চিত বা আমানতকৃত অর্থ থেকে যে ঋন (ব্যাংকের ভাষায় ঈড়হাবহঃরড়হধষ) এবং বিনিয়োগ প্রদান করা হয় তা থেকে ব্যাংক যে মুনাফা লাভ করে এটিই ব্যাংকের আয়ের বড় উৎস ।

বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর বর্তমান অবস্থা
স্বাধীনতার ৪৭ বছরে আমাদের দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতও অনেক দূর এগিয়েছে। বিশ্বব্যাপী উন্নয়নের ধারায় আমরাও এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের এই উন্নয়নশীল অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তিও এই ব্যাংক। বর্তমানে আমাদের দেশে সর্বমোট ৬৪ টি ব্যাংক রয়েছে এর মধ্যে ১৪ টি সরকারি এবং ৫০ টি বেসরকারি। এই ব্যাংকগুলোতে সঞ্চিত রয়েছে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের বিপুল পরিমান অর্থ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে গতবছর ২০১৭ শেষে ব্যাংকগুলোতে আমানত জমা হয়েছে ১০ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। দেখা যাচ্ছে দেশের জিডিপির প্রায় অর্ধেকের বেশি পরিমান অর্থ ব্যাংকে আমানত হিসেবে জমা আছে। কারণ গত অর্থবছর চূড়ান্ত হিসাবে বাংলাদেশের মোট জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৯৮৬ কোটি ডলার বা ২০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে বিতরণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৯৮ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা।

এই বিপুল পরিমান অর্থের জমা গ্রহণ এবং ঋণ প্রদানের মাধ্যমে অর্থের যে ব্যাপক সঞ্চালন (গড়হবু ঈরৎপঁষধঃরড়হ) হয় তার মাধ্যমে আমাদের দেশের অর্থনীতির চাকাও সঞ্চালিত হয়। কিন্তু জাতির কাংঙ্খিত উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সাম্য এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির উন্নয়ন পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এই কাংঙ্খিত বিষয়গুলো বাস্তবায়ন না হওয়ার পিছনে অনেক সমস্যা বিদ্যমান। সবচেয়ে বড় সমস্যাটি হল গত এক যুগ ধরে আমাদের ব্যাংকগুলোর চরম দুরাবস্থা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন এটি শুধু দুরাবস্থা নয় ইতিমধ্যে কর্কট রোগে (ক্যান্সার) পরিনত হয়েছে। কারণ গত প্রায় এক যুগ ধরে ব্যাংকগুলোতে চলছে ঋণের নামে অর্থ লুটপাট ও বিদেশে অর্থ পাচারের মহড়া। গত ২০১৭ সালকে তো অর্থ লুুটপাট এবং ঋণ কেলেঙ্কারির বছর হিসেবেই আখ্যায়িত করা হচ্ছে।

অনিয়ম-দুর্নীতি ও জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা চলে গেছে লুটেরাদের পকেটে। দেশের ব্যাংকিং খাতকে দেউলিয়া করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে ঋণ খেলাপকারীরা। ভুয়া এফডিআরের কাগজপত্র জমা দিয়ে, এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা হয়ে এমনকি জাল দলিলেও অনুমোদন হয়েছে মোটা অঙ্কের ঋণ। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে তারা লোপাট করে চলেছে হাজার হাজার কোটি টাকা। এ টাকা আদায়ে ব্যাংকগুলো দৃশ্যত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলেও তা নিছক লোক দেখানো বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ একটি কেলেঙ্কারিরও বিচার হয়নি। সাজা পাননি অভিযুক্তদের কেউ। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছাড় দেয়া হয়েছে। দুর্নীতির খবর প্রকাশের পর প্রাথমিক তদন্ত হয়েছে। বছরের পর বছর মামলা চলছে। কিন্তু সুরাহা হচ্ছে না কোনো ঘটনার। টাকাও ফেরত আসেনি।

বিচার না হওয়ায় নামে-বেনামে ঋণ যেমন বেড়েছে; তেমনি বেড়েছে ঋণ নিয়ে ফেরত না দেয়ার প্রবণতা। গত কয়েক বছরে ব্যাংক খাত থেকেই ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা বেরিয়ে গেছে, যার প্রায় ৯০ ভাগই ফিরে না আসার অবস্থায় রয়েছে। বাধ্য হয়ে ব্যাংকগুলো এসব ঋণকে খেলাপি ঘোষণা করছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফরাস উদ্দিন আহমেদ একটি হিসাবের ভিত্তিতে বলেন, ১১ বছরে (২০০৪-১৪) সাড়ে ৬ হাজার কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্তমান আওয়ামী সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার সময় দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। নয় বছর পর সেই খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদে খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে ৩ গুণ। এর বাইরে আরো ৪৫ হাজার কোটি টাকার খারাপ ঋণ অবলোপন (জরমযঃ ঙভভ) করা হয়েছে। লুকিয়ে রাখা এই বিশাল অঙ্ক খেলাপি ঋণ হিসাবের বাইরে রয়েছে অর্থাৎ ঋণ হিসাব অবলোপন করা হয় ব্যাংকের লেজারকে ক্লিন দেখানোর জন্য। কোনো ঋণ হিসাব খেলাপি হয়ে পড়লে নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর কিছু শর্তসাপেক্ষে সেই ঋণ হিসাবকে অবলোপন করা হয়। সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণ এখন ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। যা ব্যাংক খাতের জন্য অশনি সংকেত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

ব্যাংকিং খাতে অর্থ লুটের খতিয়ান
গত ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ সুইফট ম্যাসেজিং সিস্টেমে হ্যাংকিংয়ের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে সংরক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে প্রায় ৮০০কোটি টাকার সমপরিমাণ ডলার চুরির ঘটনা। ফিলিপাইনের একটি ব্যাংকের মাধ্যমে এ অর্থ নগদায়ন হয়। এ পর্যন্ত দেড় কোটি ডলার উদ্ধার হয়েছে। বাকি অর্থ ফেরতের চেষ্টা চালাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বেসিক ব্যাংক, হলমার্ক ও বিসমিল্লাহ গ্রুপ কেলেংকারী
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বেসিক ব্যাংক থেকে ২০১২-১৩ অর্থবছরের মাত্র ১১টি পর্ষদ সভায় ৩ হাজার ৪৯৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ঋণ দেয়া হয়। এভাবে অনিয়ম করে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার মতো ভুয়া ঋণ সৃষ্টি করে তা হাতিয়ে নেয়া হয়। ২০১২ সালে সোনালী ব্যাংক থেকে হলমার্ক নামক একটা প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৪ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয় যা বর্তমানে কুঋণে পরিণত হয়েছে। ২০১১ ও ২০১২ সালে টেরিটাওয়েল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিসমিল্লাহ গ্রুপ দেশের পাঁচটি ব্যাংক থেকে জালিয়াতি করে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। (জনতা ৩৯২ কোটি, প্রাইম ৩০৬ কোটি, যমুনা ১৬ কোটি, শাহজালাল ১৪৮ কোটি, প্রিমিয়ার ৬২ কোটি টাকা)।

ফারমার্স ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক ও জনতা ব্যাংক
আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ম খা আলমগীর, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিদ্দীকী নাজমুলের মালিকানাধীন বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ফারমার্স ব্যাংকের ছয়টি শাখায় প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ঋণ অনিয়ম পাওয়া যায়। বর্তমানে জনগণের সংরক্ষিত আমানত ফেরত দিতে অক্ষম হয়ে পড়েছে ব্যাংকটি। ৭৪১ কোটি টাকার ঋণ বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম দেখা যায় এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকে। জনতা ব্যাংক ২০১০-২০১৫ সালের মধ্যে আইন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ প্রদান নির্দেশিকা লঙ্ঘন করে অ্যাননটেক্স নামে একটি টেক্সটাইল গ্রুপকে ৫ হাজার ৪০৪ কোটি টাকার ফান্ডেড (নগদ অর্থ) নন-ফান্ডেড (ঋণ) প্রদান করে। যা বর্তমানে পুরোটাই ফান্ডেডে পরিণত হয়েছে। অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির হোতা ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবুল বারাকাত।

শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি ও ডেসটিনির অর্থ আত্মসাত
গত ১৯৯৬-২০০১ সালে সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি হয়েছে শেয়ারবাজারে। সেই কেলেঙ্কারির মামলা এখনো বিচারাধীন। ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতা নেয়ার পরের বছর দেশে দ্বিতীয়বারের মতো শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি ঘটে। এ ঘটনার তদন্ত কমিটির প্রধান খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের হিসাবে ওই কেলেঙ্কারিতে অন্তত ১৫ হাজার কোটি টাকা খুইয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। ২০১২ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন বহুস্তর বিশিষ্ট বিপণন কোম্পানি ডেসটিনির অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় আত্মসাতের পরিমাণ ৪ হাজার ১১৯ কোটি টাকার কথা বলেন।

ওরিয়েন্টাল ব্যাংক (বর্তমানে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক)
বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০৫ সালে ওরিয়েন্টাল ব্যাংক কেলেঙ্কারি ছিল সবচেয়ে আলোচিত। সাবেক ওরিয়েন্টাল ও বর্তমানে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকে ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটে ২০০৬ সালে। ব্যাংকটির তৎকালীন উদ্যোক্তারা অনিয়মের মাধ্যমে হাতিয়ে নেন প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। এ কারণে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়া হয়। এ কেলেঙ্কারির পর ব্যাংকটি পুনর্গঠন করতে হয়। বিক্রি করা হয় বিদেশি একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের কাছে।

আরো কিছু লুটের খতিয়ান
২০০২ সালে ওম প্রকাশ আগরওয়াল নামের এক ব্যবসায়ী জালিয়াতির মাধ্যমে পাঁচটি ব্যাংক থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই পাঁচ ব্যাংকের এমডিকে অপসারণ করেছিল। জাহাজ রপ্তানির চুক্তিপত্র দেখিয়ে দেশের ১৪টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ১৬শ কোটি টাকার ঋণ নেয় আনন্দ শিপইয়ার্ড। ট্রেডিং হাউস, টিআর ট্রাভেলস বা ঢাকা ট্রেডিং হাউস লিমিটেড এই তিন প্রতিষ্ঠানেরই কর্ণধার টিপু সুলতান। ভোগ্যপণ্য ব্যবসার নামেই সরকারি-বেসরকারি প্রায় ১০টি ব্যাংক থেকে ৬০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নেন টিপু সুলতান। যদিও তা বিনিয়োগ করেন পরিবহন ব্যবসা টিআর ট্রাভেলসে। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা। এতে বিপাকে পড়েছে অর্থায়নকারী ব্যাংকগুলো। এ ব্যবসায়ীর কাছে আটকে গেছে তাদের বড় অঙ্কের এ ঋণ।
জনতা ব্যাংকের রমনা করপোরেট শাখা থেকে সুতা রপ্তানির ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে রানকা সোহেল লিমিটেডের ১১০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনা বেরিয়ে আসে। ২০১৩ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক পরিদর্শনে অনিয়ম উদঘাটন হয়। বর্তমানে রানকা সোহেল কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলস্, রানকা ডেনিম টেক্সটাইল মিলসহ সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ৩৫২ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে।

চট্টগ্রাম অঞ্চলের ২০টি ব্যাংকের শাখা থেকে এইচআর গ্রুপ অভিনব কৌশলে ৯৩৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করে। ২০১৪ সালে পরিচালিত বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে এসব তথ্য উঠে আসে।
রূপালী ব্যাংক থেকে বেনিটেক্স লিমিটেড, মাদার টেক্সটাইল মিলস ও মাদারীপুর স্পিনিং মিলস নামে তিনটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে গেছে প্রায় হাজার কোটি টাকা। এর ৮০১ কোটি টাকা আদায়ের সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আবার অগ্রণী ব্যাংক থেকে বহুতল ভবন নির্মাণে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে ৩শ কোটি টাকা ঋণ নেয় মুন গ্রুপ।

ব্যাংকিং খাতে পরিবারতন্ত্র ও অনিয়ম
দেশের ব্যাংকিং খাতের উদ্যোক্তারা এখন পুজিঁ ছাড়াই ব্যবসা করছেন।কোন কোন উদ্যোক্তারা এক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আরেক ব্যাংকের মালিক হয়েছেন।কেউ কেউ তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থের চেয়ে জ্যামিতিক হারে কয়েক গুন বেশি ঋণ নিয়েছেন।যাদের মালিক বলা হচ্ছে, পুরো ব্যাংকিং খাতে তাদের একটি টাকাও নেই। বরং পরিচালক পরিচয়ে আমানতকারীদের জমানো টাকা থেকে প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা সরিয়ে ফেলেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে গত সেপ্টেম্বর ২০১৭ পর্যন্ত ব্যাংক খাতে পরিচালকদের বিনিয়োগকৃত অর্থের পরিমান ৪৬ হাজার কোটি টাকা। একই সময় পরিচালকরা ব্যাংক থেকে প্রায় ১ লক্ষ ৪৫ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে তুলে নিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ঘোষণা দিয়ে নেওয়া ঋণের বাইরে পরিচালকরা আত্মীয়,বন্ধু-বান্ধব বা অন্য কারো নামে ও ঋণ নিয়েছেন প্রায় দেড় লক্ষ কোটি টাকা। এইভাবে পরিচালকদের অনেকেই এক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আরেক ব্যাংকের মালিক হয়েছেন।দেখা যাচ্ছে এক একজন ছয় থেকে সাতটি ব্যাংকের মালিক বনেছেন। এ থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায়,ওই ব্যক্তি এক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আরেক ব্যাংকের মালিক হয়েছেন।পরিচালকরা মিলেমিশে ব্যাংকের সব ঋণ নেয়ার চেষ্টা করেন তখন বিভিন্ন খাতের ভালো শিল্প উদ্যোক্তারা চাহিদা অনুযায়ী ঋণ পান না।আবার পেলেও সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হন।বিশেষ করে যারা সত্যিকার অর্থে যারা ঋণ নিয়ে ব্যবসা করতে চান তারা বিপাকে পরেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর সেপ্টেম্বর মাসের শেষদিন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের ঋণ দিয়েছে ৭ লক্ষ ৫২ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক পরিচালকরা প্রায় ১ লক্ষ ৪৫ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে তুলে নিয়েছেন।
তাছাড়া বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতে পরিবারতন্ত্রকে গুরুত্ব দিয়েআইনের সংশোধন হতে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ সংক্রান্ত একটি বিল সংসদীয় কমিটি চূড়ান্ত করে দিয়েছে।প্রস্তাবিত এ আইনে বলা হচ্ছে, যে কোন বেসরকারি ব্যাংকে একই পরিবার থেকে চারজন সদস্য পরিচালনা পর্ষদে থাকতে পারবেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, আইনে এ ধরনের পরিবর্তন তাদের ভাষায় ব্যাংকিং খাতে লুটপাট এবং চরম অব্যবস্থাপনার সৃষ্টি করতে পারে।ব্যাংকিং আইন সম্পর্কিত বিলটি অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি যাচাই-বাছাই করেছে। এখন সংসদে উত্থাপনের হলে চলতি অধিবেশনেই এটি পাশ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন স্বাধীনতার আগে ২২ পরিবার নামে পরিচিত ছিল কতিপয় ধনী যাদের কাছে দেশের শতকরা ৮০ ভাগ সম্পদ কুক্ষিগত ছিল এবং তারা প্রত্যেকে ব্যাংকের মালিক ছিলেন। বঙ্গবন্ধু এবং বাঙালিরা সে ২২ পরিবারের বিরোধিতা করেছিল। এখন কি আবার ২২ পরিবারতন্ত্রে ফিরে গেলে ভালো হবে?”
বাংলাদেশে বেসরকারী ব্যাংকগুলোর যারা উদ্যোক্তা তাদের বেশিরভাগই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত।গত নয় বছরে আওয়ামী লীগের শাসনামলে দলটির নেতা কিংবা তাদের রাজনৈতিক মিত্ররা বেশ কয়েকটি ব্যাংকের অনুমোদন পেয়েছেন।

‘পুঁজি পুনঃকরণ’ (জবপধঢ়রঃধষরুধঃরড়হ) নামে লোপাট
গেল অর্থবছরের জুনে সরকার ‘পুঁজি পুনঃকরণ’ (জবপধঢ়রঃধষরুধঃরড়হ) ঘোষণা করে। তার আগে ২০০৯ থেকে ১৪ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা ব্যাংকগুলোকে দেয়া হয়েছে। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, পুঁজি পুনঃকরণের পুরো অর্থ ময়লার নালায় প্রবাহিত হয়েছে। নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, প্রায় পুরো অর্থ রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী ও দুর্নীতিবাজ লোকদের পকেটস্থ হয়েছে। এখন আবার তারা চাইছে পুনঃপুঁজিকরণ অর্থ পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকার মতো; যা এ বছরের বাজেট বরাদ্দের চেয়ে দ্বিগুণ। তাদের এ দাবি কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের ব্যবহার উচ্ছন্নে যাওয়া বখাটে ছোকরার মতো, যে প্রত্যেক সময় বাবার টাকা আকাশে উড়িয়ে আবার বাবার কাছে হাত পাতে। পার্থক্য এটুকুই যে, বখাটে ছেলেটিকে বাবা তার পকেট থেকে টাকা দেন আর বখাটে ব্যাংকগুলোকে সরকার অর্থ দেয় জনগণের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে।এই করের টাকার বিনিময়ে জনগণ সরকারের কাছ থেকে ভালো সেবা পাওয়ার আশা করে। রাস্তা-ঘাট, বিদ্যুৎ, পানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এই ধরনের সেবা সরকারের দেওয়ার কথা সেগুলোই জনগণ আশা করে কষ্টার্জিত অর্থের বিনিময়ে। কিন্তু এই করের টাকা দিয়ে উল্টো দুর্নীতিবাজদেরকেই সাহায্য করছে সরকার। বছরের পর বছর যদি মূলধন দিয়ে সরকারি ব্যাংকগুলোকে জিইয়ে রাখার এই প্রচেষ্টা চলে তাহলে এই ধরণের ব্যাংক থাকার কী দরকার? এই ধরণের বোঝা টেনে নেওয়ার দরকার নেই।

দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল শ্রেয়। এতগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থাকার প্রয়োজন আছে কি নেই, তা এখন মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন। প্রয়োজন থেকে থাকলেও ও গুলো শুধু আমানত সংগ্রহে কাজে লাগানো যায় কিনা, সেটাও ভাবার বিষয়। একমাত্র ব্যাপক সংস্কারসাপেক্ষে রুগ্ন কোনো ব্যাংকের জন্য সীমিত মাত্রায় পুনঃপুঁজিকরণ হতে পারে। মনে রাখতে হবে যে শর্তহীনভাবে পুনঃপুঁজিকরণ প্রক্রিয়া ব্যাংক রুগ্ন হওয়ার অন্যতম উৎসাহদাতা। সুতরাং শেয়ার মার্কেটের ধসের মতো ব্যাংকিং খাতে যাতে সুনামি না আসতে পারে, তার জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নেয়া প্রয়োজন ।মোটকথা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর, এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বৈপ্লবিক সংস্কার না ঘটা, সুশাসন এবং চরম জবাবদিহীতা না আনা পর্যন্ত এই আর্থিক রক্তক্ষরণ বন্ধ হবে বলে মনে হয় না।

সর্বোপরি গোড়ায় গলদ রেখে কোন কিছু সম্পূর্নভাবে সমাধান করার প্রয়াস সাময়িকভাবে সফল হলেও দীর্ঘমেয়াদে চরম ক্ষতির সম্মুখীন করে। আমাদের গোড়ায় গলদ হল পুজিঁবাদী অর্থব্যবস্থা,এই চরম ব্যর্থ ও শয়তানী অর্থব্যবস্থার মধ্যে থেকে সম্পূর্নভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়।আমাদের দেশের বর্তমান আর্থিক সংকট দেখে প্রতীয়মান হচ্ছে যে পুঁজিবাদীরা পূর্বে পরোক্ষভাবে দেশ নিয়ন্ত্রন করার চেষ্টা করত এখন প্রত্যক্ষভাবে নিয়ন্ত্রন করার অপচেষ্টা করছে । এটাই পুঁজিবাদের চুড়ান্ত লক্ষ্য।
পুজিঁবাদীদের এই অসম যুদ্ধের লাগাম যদি টেনে না ধরা যায় আমাদের দেশের অর্থনীতির অবস্থা হয়ত সাম্প্রতিক ইউরোপের দেশ গ্রিসের মত হবে কারণ এই গ্রিসকে ২০১২ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে দেউলিয়া ঘোষনা করে আর্ন্তজাতিক মহল। শুধু গ্রিস নয় সাম্প্রতিক জিম্বাবুয়ের চরম মূল্যস্ফিতি,আর্জেনটিনার চরম আর্থিক সংকট, ১৮৪০ এবং ১৯৩০ সালে আমেরিকার ব্যাংকগুলো অর্থ শূন্য হওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয়ভাবে দেউলিয়াত্বের দিকে যাওয়া,১৯৯৪ সালে মেক্সিকোসহ ল্যাটিন আমেরিকার আরো কিছু দেশের আর্থিক দেউলিয়াত্ব,এবং ১৯৯৮ সালে রাশিয়ার আর্থিক দেউলিয়াত্ব হওয়া যে সময় তাদের শেয়ারবাজার সম্পূর্নভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং ব্যাংকগুলো অর্থ শূন্য হয় ।এইভাবে পুজিঁবাদের অপর্কম ও ব্যর্থতার শত শত উদাহরণ দেয়া যাবে। পুঁজিবাদীদের এই ভয়াল থাবা থেকে আমাদেরকে উদ্দার করতে পারে ইসলামের অর্থব্যবস্থা যা ইসলাম এই পৃথিবীকে বার বার বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন ।পুজিঁবাদের এই ভারসাম্যহীন ও অকল্যানমূলক অর্থব্যবস্থার বিপরীতে ইসলামের অর্থব্যবস্থা হল ভারসাম্যপূর্ণ ও কল্যানমূলক অর্থব্যবস্থা । এই সত্য সতঃসিদ্ধ প্রমানিত সত্য।